

বহুল আলোচিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ ক্রমেই এগিয়ে আসছে। ভয়-শঙ্কাহীন একটি নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি আসন্ন নির্বাচনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। কেননা, সাম্প্রতিককালে অপরাধীদের কিছু দুর্ধর্ষ তৎপরতা জনমনে শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নির্বাচন তো বটেই, স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্যও উদ্বেগের।
শুক্রবার কালবেলায় প্রকাশিত ‘নির্বাচনের আগে অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছে’ শীর্ষক শিরোনামের প্রতিবেদনে আসন্ন নির্বাচনে উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্রের ঝনঝনানি বৃদ্ধি জনমনে অস্বস্তি বাড়িয়ে তুলেছে।
এ কথা সবারই জানা, গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীতে গুলি করে হত্যা করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে। সে ঘটনার এক মাস না পেরোতেই গত বুধবার রাতে ফের রাজধানীতে গুলি করে হত্যা করা হয় জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে। চাঞ্চল্যকর এ দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গুলি করে হত্যার আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে। নতুন বছর শুরুর পর বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত নয়টি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে সোমবার মাত্র পাঁচ ঘণ্টার ব্যবধানে যশোরের মনিরামপুরে এক ব্যবসায়ীকে, চট্টগ্রামের রাউজানের সিকদারপাড়ায় এক যুবদল নেতাকে এবং নরসিংদীতে আরেক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভয় দেখাতে বা আতঙ্ক ছড়াতে ফাঁকা গুলি নিক্ষেপের মতো ঘটনাও ঘটছে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দুপুরেও গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। অল্পের জন্য তিনি প্রাণে বাঁচলেও তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও বেড়েছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ অনেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুলিশের যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়, তার প্রায় দেড় হাজার অস্ত্র এখনো বেহাত অবস্থায় আছে। এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অনেক দুর্ধর্ষ বন্দি পালিয়ে যায়। তাদের মধ্যে এখনো অধরা ৭১০ জন। সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে অনেক অপরাধী গ্রেপ্তার হলেও তাদের অনেকেই জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়াচ্ছে।
খুব স্বাভাবিকভাবেই উদ্ধার করা যায়নি যেসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং অধরা সন্ত্রাসীদের, তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এসব অস্ত্র-গোলাবারুদ যে অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার প্রমাণ মিলেছে বারবার। এদিকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের ধরতে দেশে চলছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২। অভিযান চললেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক অবস্থায় আছে বলে মনে করছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। স্বভাবতই স্বস্তি ফিরছে না সাধারণ মানুষের মধ্যে। প্রতিদিন খুনাখুনি, গুলি বা বোমার শব্দে আতঙ্কিত হচ্ছে মানুষ।
আমরা মনে করি, আসন্ন নির্বাচনের আগে একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। পাশাপাশি গ্রেপ্তার করতে হবে পালিয়ে যাওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের। শুধু তাই নয়, এরা যেন জামিনে বের হতে না পারে, সেদিকেও হতে হবে কঠোর। আমাদের প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তরিক প্রচেষ্টা নির্বাচনের আগেই ভোটের জন্য একটি কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
মন্তব্য করুন