

বিনয় মুখোপাধ্যায় বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক। কর্মজীবনে ‘যাযাবর’ ছদ্মনামে তার লেখা ‘দৃষ্টিপাত’ গ্রন্থটি পঞ্চাশের দশকে বাঙালি পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিনয় মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০৮ সালের ১০ জানুয়ারি। তৎকালীন ঢাকার ফেগুনামার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতার নাম ফণীভূষণ মুখোপাধ্যায় ও মা মনোরমা দেবী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। তার বাবাও সাহিত্যচর্চা করতেন। পারিবারিক সাহিত্যের আবহ তার সাহিত্য রচনার প্রেরণা জুগিয়েছে। বিনয় চাঁদপুরের জুবিলি হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, সেন্ট পলস কলেজ থেকে আইএ ও কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি বেশ কয়েকটি গান রচনা করেন। সেগুলো সুরসাধক হিমাংশু দত্তের সুরারোপে রেকর্ড হিসেবে প্রকাশিত হয়। এরূপ গানের রেকর্ডের তালিকা ছয়টি। উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো—শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে ‘নতুন ফাগুনের দিনে’ এবং উমা বসুর কণ্ঠে ‘ঝরানো পাতার পথে’। তবে সুরকার হিমাংশু দত্তের অকালপ্রয়াণে বিনয়ের গীতিকার জীবনের ছেদ পড়ে। ১৯৩৭ সালে তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার উদ্দেশে ব্রিটেন যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গাওয়ার স্ট্রিটের ভারতীয় আবাস জার্মান বোমার আঘাতে ধ্বংস হলে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দৈনিক ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার কাজ নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে ‘শ্রীপথচারী’ ছদ্মনামে রাজনৈতিক কলাম লিখতেন। এরপর ভারত সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মচারী হয়ে দিল্লি যান। দীর্ঘদিন কাজ করার পর প্রেস কাউন্সিলের সচিব পদে উন্নীত হয়ে অবসর নেন। কর্মজীবনে তদানীন্তন নেতৃস্থানীয় বহু ব্যক্তির সান্নিধ্যে এসেছেন তিনি। সাহিত্যরচনা করেছেন ‘যাযাবর’ ছদ্মনামে। কর্মজীবনে তার ওপর দায়িত্ব আসে ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গান্ধীজির বাণী সংগ্রহ করার। সোদপুরে গান্ধীজির কাছে গেলে তিনি বলেন, বাণী দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়—তার মন ভেঙে গেছে। গান্ধীজির কাছ থেকে এমন কথা শুনে তার মনে হয়েছিল যেন এক ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি প্রত্যক্ষ করছেন। যাযাবর নামে ‘দৃষ্টিপাত’ রম্যরচনা লিখে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয় লেখক হয়ে ওঠেন তিনি। কর্মসূত্রে ও অবসর গ্রহণ করার পর সস্ত্রীক ইউরোপ ও আমেরিকায় গিয়েছিলেন। তার স্ত্রী দুর্গাদেবী ছাত্রজীবনে প্যারিসে ছিলেন। তিনি যামিনী রায়ের শৈলীতে অনেক ছবি এঁকেছেন। তার লেখা ‘পুষ্পপট’ বাংলা ভাষায় ফুল সাজানো নিয়ে প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। ‘দৃষ্টিপাত’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পুস্তক হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বিনয় মুখোপাধ্যায় সাহিত্যকর্মের জন্য ১৯৫০ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নরসিংহ দাস পুরস্কার’ এবং ১৯৯৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’ লাভ করেন। খ্যাতনামা এ সাহিত্যিক ২০০২ সালের ২২ অক্টোবর দিল্লিতে প্রয়াত হন।
মন্তব্য করুন