

একদিকে, মা হারানোর সমব্যথা-সমানুভূতিতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিএনপির কান্ডারি তারেক রহমানকে। করা হচ্ছে শোক সইবার ক্ষমতা দেওয়ার দোয়া। শোকবইয়ে আবেগঘন মন্তব্য। আগামী দিনের রাজনীতিতে তাকে ঐক্যের প্রতীক করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ঘোষণা। অন্যদিকে, বেরিয়ে গিয়ে মঞ্চে-বক্তব্যে নানা টুইস্ট। খোঁচা-খিঁচুনি দিয়ে নানা বয়ান। গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে ডানে-বামে সমানে বিভাজন রেখা টানা। এক আচানক সামাজিকতার এ চর্চার মাঝে এগিয়ে চলছে নির্বাচনের গাড়ি। নানা কু-তথ্য হাজির করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে শত্রুতা।
তারেক রহমান ও বিএনপিকে তা সইতে হচ্ছে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনৈতিক পার্টনার জামায়াতে ইসলামীর ঢেলে দেওয়া এ বিষ হজম করতে হচ্ছে। টানা আন্দোলনের মাঠে বিএনপির পাখার তলে থেকে উম নেওয়া দলটির নেতারা সিরিজ শব্দবোমা ছুড়ছেন। আবার নির্বাচনের আগে-পরে একসঙ্গে দেশ চালানোর আকাঙ্ক্ষার কথাও বাদ যাচ্ছে না। তারেক রহমান ও বিএনপিকে কোণঠাসা করার সব দাওয়াই ছাড়া হচ্ছে। সমান্তরালে তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা। তার মা সদ্য প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সম্মানের অতি আদিখ্যেতা দেখাতে গিয়ে কত যে বন্দনা! এমন আজব-আচানক সন্ধিক্ষণ পার হওয়া বিএনপির জন্য নির্বাচনের আগে বাড়তি পরীক্ষা। কোলাকুলিতে বুক পাততে হচ্ছে। গলাগলিতে জড়াজড়ি করতে হচ্ছে। আবার গালাগালিও হজম করতে হচ্ছে।
তারেক রহমান ফেরার পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন কারও কারও অসহ্য লাগছে, তা আর লুকানো-চাপানোর বিষয় নয়। অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তারা এমনটি চাইছিলেন না। অনলাইন-অফলাইনে তার বিরুদ্ধে চিকন-চিকন খোঁচায় তা স্পষ্ট। ভোটের হাওয়া বিএনপিমুখী হয়ে যাওয়া স্পষ্ট। কোথাও কোথাও জামায়াতে ইসলামীর ম্যাজিকেল উত্থানও স্পষ্ট। এ দুই স্পষ্টতা আগামীর রাজনীতিকে একটা বাঁকে অবশ্যই নেবে। কিন্তু তর্জন-গর্জন, হাইপ-হাইটে বাধছে গোলমাল। বাম নেতাদের সমবেদনা ও সাক্ষাতের সময় তারেক রহমান বলেছেন, একাত্তরকে অস্বীকার করলে তো দেশ থাকে না। দেরি না করেই এর কাউন্টার। বাজারে ফটোকার্ড—চব্বিশ না হলে তারেক রহমান তার মায়ের মরা মুখ দেখতে পারতেন না। জামায়াতের ব্যানারে প্রতিপক্ষের এমন তেতে ওঠার ফের নিয়ে এন্তার বিশ্লেষণ চলছে। কারও কারও মতে, প্রশাসনে জামায়াতের একনিষ্ঠদের কাজ দলটিকে সাহসী করে তুলেছে। তার ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগন্নাথ। ডাকসু থেকে জকসু। মাঝে চাকসু-রাকসুসহ ছাত্র সংসদগুলোতে শিবিরের জয়-জয়কার তাদের এ সাহসের পালে বাতাস জুগিয়ে চলছে। এ নিয়ে রাস্তাঘাটে, গণপরিবহনে, চা দোকানে, প্রিন্ট মিডিয়া আর টিভি টক শোতে চলছে বিস্তর গবেষণা। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কেন শিবির? ছাত্রদল নয় কেন? বিশেষ করে তারেক রহমানের ফেরা এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে আবেগের মতো দুটি পুঁজি বিএনপি জকসু নির্বাচনে ক্যাশ করতে পারল না কেন?
এসব প্রশ্নের পারদের মাঝেই নির্বাচনী উত্তেজনা। বিভিন্ন এলাকায় টার্গেট কিলিং, প্রার্থীদের হুমকি, এমনকি প্রার্থী ও সমর্থকদের গুলি করে হত্যা, কাপনের কাপড় পাঠানোর ঘটনাও। রাত-বিরাতে চলাচলে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী, গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা। জুলাই যোদ্ধাদের ওপর একের পর এক হুমকি কাঁপন ধরাচ্ছে। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে এত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব? টার্গেট কিলিং বা পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলা কি রোধ করা যায়? নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই গুলি করে অন্তত চারটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে নির্বাচনী জনসংযোগে হামলা, গুলি হয়েছে। চোরাগোপ্তা হামলা, গুলি, হত্যা, বিস্ফোরণ, মব সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার—একের পর এক ঘটনা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল করে তুলেছে। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারঘেঁষা তেজতুরী বাজারে বুধবার রাতে গুলি করে হত্যা করা হয় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরে এনসিপির এক কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি করে তার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি এ যাত্রায় অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। এর আগে শরীয়তপুরের জাজিরায় একটি ঘরে বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে দুই যুবক। এসব ককটেল নির্বাচনী প্রচারে হামলা বা নাশকতার জন্য তৈরি হচ্ছিল কি না, সে সন্দেহও রয়েছে। এর আগে গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের একটি বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছে। উড়ে গেছে একতলা ভবনের দুটি রুমের দেয়াল। ঘটনাস্থল থেকে ককটেল, রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করেছে পুলিশ। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, মাদ্রাসা পরিচালনার নামে ভাড়া করা ওই বাড়িতে তৈরি করা বেশ কিছু বোমা এর আগে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়েছে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা হামলা না হলেও মব সন্ত্রাসের ঘটনা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধের অভাব তৈরি করেছে। যেমন গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে মোটরসাইকেলের সঙ্গে গাড়ির ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ‘মব’ তৈরি করে আইনজীবী নাঈম কিবরিয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একইদিন শরীয়তপুরের ডামুড্যায় ব্যবসায়ী খোকন চন্দ্র দাসকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে লক্ষ্মীপুরে দরজায় তালা লাগিয়ে ও পেট্রোল ঢেলে স্থানীয় এক বিএনপি নেতার ঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে আগুনে পুড়ে ওই নেতার সাত বছর বয়সী এক মেয়ের মৃত্যু হয়। দগ্ধ হন বিএনপি নেতাসহ তার আরও দুই মেয়ে। গত সোমবার রাতে চট্টগ্রামের রাউজানে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একইদিন সন্ধ্যায় যশোরের মনিরামপুরে এক বরফ কল ব্যবসায়ীকে গুলি করে এবং রাত ৯টায় নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় আরেক ব্যবসায়ীকে বাড়ির ফটকে গুলি হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনার আগে নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরদিনই দিনের বেলায় রাজধানীতে গুলি করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে।
এ ঘটনার আবেগ সামনে রেখে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পাশাপাশি ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা হয়েছে। এসব ঘটনা একদিকে ভয়ের তীব্রতা বাড়াচ্ছে, আরেকদিকে নির্বাচনের নিশ্চয়তাও প্রশ্নে ফেলছে। বিশেষ করে হত্যা ও গুলির ঘটনায় প্রশ্ন আসছে এসব অস্ত্র ও গুলির উৎস নিয়ে। হাদির মাথায় গুলির ঘটনার পরও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় গুলি করে হত্যার অন্তত আটটি ঘটনা ঘটেছে। এগুলো কার অস্ত্র, কোথাকার অস্ত্র? ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রই কি-না? ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এক হাজারেরও বেশি এখনো উদ্ধার হয়নি। তখন পুলিশের ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র ও ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ লুট হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অনেক দুর্ধর্ষ বন্দি পালিয়ে যায়। তাদের মধ্যে এখনো অধরা ৭১০ জন। এ তালিকায় হত্যা মামলার দণ্ড পাওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি রয়েছে। ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়। এ অভিযানে হাজার-হাজার গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হলেও চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। তা ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। এর আগে গাজীপুরে ছাত্র-জনতার ওপর সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনার পর গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হয়। তবে সেই অভিযানেও পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের হার ছিল খুবই কম।
চলমান গালিগালাজ সামনের দিনগুলোতে গোলাগুলিতে ঠেকবে না, সেই নিশ্চয়তা নেই। হামলা, সংঘাত ও সহিংসতা ছাড়াও আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ কী ধরনের তৎপরতা চালাতে পারে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াসহ সাইবার স্পেসে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা একের পর নাশকতার উসকানি ও পরিকল্পনার ঘোষণা দিচ্ছেন। গুপ্তহত্যার হুমকিও পাচ্ছেন অনেকে। রক্তক্ষয়ী এক অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর নির্বাচন হচ্ছে। এবারের পরিস্থিতি অন্য সময়ের মতো নয়।
ঢাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উদ্বেগের মাঝে কিছু তথ্যও রয়েছে। তার মতে, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে। তথ্য হিসেবে এটি অগ্রাহ্য করার মতো নয়। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা দৃশ্যমান। কিন্তু ফল কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হলেও অপরাধীদের মধ্যে কম্পন আসেনি। বরং প্রতিদিনই খুনাখুনি, গুলি বা বোমার শব্দে তারা কম্পনে ফেলছে মানুষকে। অবৈধ অস্ত্র ও লুট হওয়া অস্ত্র কোথায়, কার হাতে অপব্যবহার হচ্ছে, তা ভেবে জনআতঙ্ক আরও বাড়ছে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
মন্তব্য করুন