

সমকালীন রাজনীতির বিচার-বিবেচনায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব এখন শুধু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জন্যই অপরিহার্য নয় বরং তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রাসঙ্গিকতা দলমত নির্বিশেষে সর্বজনীনভাবেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। খণ্ডিত রাজনীতির অচলায়তন ভেঙে তারেক রহমান তার নেতৃত্বের বিশালত্বকে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পেরেছেন সনাতন ধারার পশ্চাৎপদ সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠে। প্রায় দুই দশক তিনি প্রবাস জীবনযাপন করছেন ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন গংদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ও আরোপিত জুলুম সিদ্ধান্তের কারণে। কতিপয় অরাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী আর দেশি-বিদেশি চক্রান্তের মাধ্যমে কথিত সংস্কারের নামে ১/১১ পয়দার মধ্য দিয়ে বিএনপি ও জিয়া পরিবারকে ধ্বংসের টার্গেট থেকেই সেদিন প্রতিশ্রুতিময় তারুণ্যের প্রতীক তারেক রহমানকে দেশ থেকে জবরদস্তি করে বাইরে পাঠানো হয়। পুরো ঘটনাটি ছিল নীলনকশার ছকে আঁকা শেখ হাসিনার ১৬ বছর অবৈধ ক্ষমতা ভোগের প্রারম্ভিক তৎপরতা।
বিএনপি ও জিয়া পরিবার ধ্বংসের জন্য ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের তৎপরতা পেশাদার খুনির খুনের তৎপরতার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পেশাদার খুনি যেমন কাউকে টার্গেট করে খুন করে এবং খুনের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত হয়, ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের আচরণ ছিল ঠিক তদ্রূপ। পাঠকের মনে থাকার কথা, তারেক রহমানকে যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন তাকে যথেষ্ট অপমান-অপদস্থ এবং সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। মিডিয়াগুলোয় প্রতিদিন তার বিরুদ্ধে নানা কল্পকাহিনি ছড়িয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরির পরিকল্পিত তৎপরতা চালানো হয়। তার ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথকে শুধু কণ্টকিত করতেই চায়নি, ফুলস্টপ করার ঔদ্ধত্যপূর্ণ তৎপরতায় লিপ্ত হয় ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন গং। তারেক রহমানকে শারীরিক ও মানসিকভাবে টর্চারিং করা হয় ঠান্ডা মাথায়। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে একজন সাধারণ নাগরিককেও এভাবে নির্যাতন করা কোনোমতেই মানবিক আচরণের মধ্যে পড়ে না।
একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে তারেক রহমান কি ন্যূনতম সম্মানটুকু পেয়েছেন? এমনকি মানবাধিকারটুকু কি পেয়েছিলেন? সব নিয়মকানুন ও রীতিনীতি উপক্ষো করে একান্তই রাজনৈতিক এবং ব্যক্তি প্রতিহিংসায় চালানো হয়েছিল তার ওপর এসব অমানবিক জুলুম অত্যাচার। তারেক রহমানকে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু করে দেওয়াই ছিল টার্গেট। অন্যদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ওপর যে সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতন চালানো হয়, সে কারণে অল্প বয়সে তাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়।
এখানে আরও একটি অতিশয় নির্মম ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে—ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার হাসিনার হাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিভিন্ন রোগের জেরক্স কপি ছিল। কোন রোগ কত বছর পর জটিল আকার ধারণ করবে, কোন রোগ কত বছর পর মৃত্যুর কারণ হবে, সে বিষয়গুলো গবেষণা করে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। বিএনপি ও জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে কত ভয়ানক ষড়যন্ত্র কল্পনা করা যায়? তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান তার একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান যদি বাংলাদেশে থাকতেন, নিশ্চয়ই তারা নিরাপদে থাকতে পারতেন না।
মনে রাখতে হবে, রাজনীতিতে আবেগের রশি ধরে ভুল সিদ্ধান্তের খিড়কি দিয়ে গুপ্ত মোনাফেক যেন সীমানায় ঢুকতে না পারে। বিএনপি কারও বিপক্ষে নয়। কাউকে শত্রুও মনে করে না। তবে যারা শত্রু মনে করে পেরেশান হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এরপরও অতীতে কারা বিএনপিকে হয়রানি করেছে, অসম্মান ও অপমানিত করেছে—আজ এটা বড় বিবেচ্য বিষয় নয়। রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক মহত্ত্ব ও উদারতা নিয়ে জিয়ার মতোই এগিয়ে যেতে হবে তার প্রকৃত সৈনিক-অনুসারীদের। নিশ্চয় তারেক রহমানের উপলব্ধি বোধ রাজনৈতিক সচেতনতা সহনশীলতা তার নেতৃত্বকে প্রশংসনীয় উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, মানুষকে রিডিং করার জন্য তার ভেতরের বোধকে উপলব্ধি করার জন্য হাজারো যুক্তি-প্রমাণ লাগে না। দুয়েকটি বক্তব্য বিবৃতি থেকে যৎসামান্য আচার-আচরণ থেকেও মানুষের ভেতরের স্বরূপ অনুধাবন করা যায় অতিসহজে। মানুষের ভুলত্রুটি খুব স্বাভাবিক বিষয়; কিন্তু এ ভুলত্রুটির জন্য লজ্জিত হওয়া, অনুশোচনা করা, অনুতপ্ত হওয়া, মনের ভেতরে অন্যায়বোধ অনুভব করাই মানুষের মহত্ত্বের লক্ষণ, উদারতার নমুনা, বিশালত্বের স্বাক্ষর। মানুষকে তাই মহান রব প্রতিদিন ইস্তেগফার করতে বলেছেন। এর অর্থ হচ্ছে, নিজের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা মহান রবের কাছে। আবার কোনো ব্যক্তির কাছে ভুলত্রুটি হলে অবশ্যই তার কাছে এর জন্য ক্ষমা চাইতে হবে। মানুষের এসব গুণ নিঃসন্দেহে অধিকতর মহত্ত্বের চিহ্ন, মহানুভবতার নির্দেশন। আমাদের পারিবারিক-সামাজিক জীবনে এসব মহত্ত্বের উদাহরণ প্রায় উঠে যাওয়ার জোগাড়। তবে এসব মহৎ গুণ যে সমাজে নেই, তা কিন্তু নয়। রাজনীতির ময়দানে মানুষের ভুলত্রুটির জন্য কিংবা কারও সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য সরি বলার কালচার তৈরি হওয়া উচিত। তারেক রহমান কাজটি করেছেন অনুপম সৌজন্যবোধের আলোকে। বাংলাদেশের রাজনীতির কালচারে শিষ্টাচার-সৌজন্যতা, পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদাবোধ তৈরি হওয়া দরকার। এ অনুভব থেকে তারেক রহমান সৌজন্যতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আইনজীবী সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব মরহুম ব্যারিস্টার রফিকুল হক বেশ কয়েক বছর আগে তারেক রহমান সম্পর্কে একটি টিভি চ্যানেলে বলেন ‘তারেক রহমান পুরাতন পলিটিশিয়ান, ট্যালেন্টেড ছেলে। গোড়া থেকেই রাজনীতিতে ইনভলভ। তার পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে।’ ব্যারিস্টার রফিকুল হকের মতো ব্যক্তিত্ব যখন তারেক রহমান সম্পর্কে এরকম মূল্যায়ন করেন, তখন অনুধাবন করতে হবে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতিতে তারেক রহমান এক অনন্য মহিমান্বিত নাম।
এ কথা আজ স্বীকার করতেই হবে, উচ্চাভিলাষী ভোগবাদী জীবনের মোহ তারেক রহমানকে স্পর্শ করতে পারেনি। পশ্চিমা আদলে পোশাকি জীবনের দেউলিয়াপনায় হারিয়ে যাননি। রঙিন সানগ্লাস চোখে পরে কথিত আধুনিক ফ্যাশনের পোশাকে সস্তা পোজ দেওয়ার মতো মূর্খতা তাকে গ্রাস করতে পারেনি। তার অতীতের মতো গত দুই দশক ধরে তার চিন্তা ও মননে বাংলাদেশকে ধারণ করেছেন এবং লালন করেছেন সততা। এটা অনেক বড় দেশপ্রেমের সনদ। নিরঙ্কুশ বাংলাদেশি হয়ে বেঁচে থাকার অভিপ্রায় অভিব্যক্তি। কথিত আন্তর্জাতিক মাপের ছাড়পত্রের মোড়ক শরীরে লাগানোর ভণ্ডামি তারেক রহমানকে কাবু করতে পারেনি। তিনি যতদিন লন্ডনে ছিলেন—ষোলো আনা বাংলাদেশি হয়েই বসবাস করেছেন। তার মেধাবী স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরীক্ষায় সারা বিশ্বে অনন্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার একমাত্র মেধাবী কন্যা জাইমা রহমান সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যারিস্টার এবং তার কথাবার্তা আচার-আচরণ বাংলাদেশের গণমানুষের রাজনীতিকেই প্রতিনিধিত্ব করে। এ সফলতা পরোক্ষভাবে তারেক রহমানের সফলতা। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে সাজানো-গোছানো অপবাদ রটনা অপতৎপরতা অতীতের চেয়ে এখন বেশি সক্রিয়।
বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তারেক রহমান এক অনুসরণীয় আইডল। ধৈর্য, মননশীলতা, অসীম সাহসিকতা ও সীমাহীন আত্মপ্রত্যয়ে তিনি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এক নিরেট ভরকেন্দ্র। গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি স্বকীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশকে এক সফল সার্থক বাংলাদেশে পরিণত করবেন—এ প্রত্যাশা ১৮ কোটি মানুষের।
লেখক: গীতিকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
মন্তব্য করুন