

পাহাড়সমান চাপ ও জনমনের প্রত্যাশার ভার নিয়ে তারেক রহমানের তৃতীয় অধ্যায় শুরু হলো। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন থেকে দেশে ফিরে মাত্র ৪৯ দিনের মধ্যে দলের কান্ডারি হিসেবে জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, যখন মা বেগম খালেদা জিয়া তার পাশে নেই। শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী এ নির্বাচন নানা দিক থেকেই তার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। নানা ধরনের শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে বিএনপিকে জয়ী করানোই হবে তারেক রহমানের তৃতীয় অধ্যায়ের টার্নিং পয়েন্ট। এ অধ্যায়ে অবশ্য তার ওপর দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। শুক্রবার রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে এ পদে আসীন করার সিদ্ধান্ত হয়। খালেদা জিয়া স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে আপসহীনভাবে নেতৃত্ব দিয়ে নির্বাচনে তার দলকে বিজয়ী করেন। সুদীর্ঘ ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনে নির্জন কারাবাস এবং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকলেও বেগম খালেদা জিয়া মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলের চেয়ারপারসন ছিলেন। আসন্ন নির্বাচনেও তার তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল। খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি দলকে অতিক্রম করে গিয়েছিল। এ ভাবমূর্তির অবর্তমানে তারেক রহমানকেই এবার নির্বাচনের কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে।
তারেক রহমানের রাজনীতির প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে। সে সময় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেশব্যাপী গণসংযোগের পাশাপাশি তারেক রহমান তার নিজস্ব পরিকল্পনায় নির্বাচন কার্যক্রমে বিরাট ভূমিকা পালন করেন। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত তিনি একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির কয়েকজন নেতা, সাবেক সচিব, সিনিয়র সাংবাদিকদের নিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির পাশাপাশি তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখেন। নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ভূমিধস জয় নিয়ে সরকার গঠন করে। ২০০২ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তার রাজনীতির প্রথম অধ্যায় শুরু হয়। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পেয়েই তিনি দেশব্যাপী দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে ব্যাপক গণসংযোগ শুরু করেন। দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়ে তাদের মতামত গ্রহণের পাশাপাশি নিজেও বক্তব্য দেন। অসংখ্য তৃণমূল সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি বিএনপির তরুণ অংশের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত ১/১১-এর সরকারের সময় ৭ মার্চ তারেক রহমান গ্রেপ্তার হন। তার ওপর সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের অমানুষিক নির্যাতনের ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। দীর্ঘ চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি তিনি নির্বাসিত জীবন থেকেই দলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। এখান থেকেই শুরু হয় তারেক রহমানের রাজনীতির দ্বিতীয় অধ্যায়। ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমান দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তার ধারণকৃত একটি বক্তব্য ওই কাউন্সিলে প্রচার করা হয়। কাউন্সিলে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে তিনি সেনা সমর্থিত সরকারের হাতে তার গ্রেপ্তার হওয়া এবং বন্দি অবস্থায় চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
খালেদা জিয়া কারাবাসে থাকাকালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান লন্ডনে নির্বাসিত থেকেই দল পরিচালনা শুরু করেন। তার বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের ওপর সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে তিনি বিভিন্ন উপায়ে তার বক্তব্য ও নির্দেশনা দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে থাকেন। দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন। সরকার থেকে বিভিন্ন সময় বিএনপি ভাঙার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার সরকার এ ব্যাপারে জোর তৎপরতা চালায়। তবে দু-একজনকে দলছুট করানো ছাড়া সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। দলের ওপর তারেক রহমানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তার নির্দেশনায় বিএনপি পরিচালিত হতে থাকে। শেখ হাসিনার পতন ঘটানো শিক্ষার্থী-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও বিএনপির অন্যতম প্রধান ভূমিকা ছিল। খালেদা জিয়ার সংকটাপন্ন অবস্থা এবং জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে তারেক রহমান গত ২৫ ডিসেম্বর নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তার ফিরে আসার পাঁচ দিন পর খালেদা জিয়া অনন্তলোকে অনন্তযাত্রা করেন।
তারেক রহমানই এখন বিএনপির চেয়ারম্যান। আর এর মধ্য দিয়েই তারেক রহমানের রাজনীতির তৃতীয় অধ্যায় শুরু হলো। আরেক দিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলেরও তৃতীয় অধ্যায়ের সূত্রপাত। বিএনপির প্রথম অধ্যায় প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হয়, রাষ্ট্রপতি পদে থেকে তিনি এই দল গঠন করেন। তার হত্যাকাণ্ডের পর বেগম খালেদা জিয়ার ওপর দলের দায়িত্ব অর্পিত হয়। তিনি সুদীর্ঘ চার দশক বিএনপির দ্বিতীয় অধ্যায়ের রাজনীতি টেনে নিয়ে গেছেন। দেশে বিদ্যমান প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তারেক রহমানকে অগ্রসর হতে হচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর তিনি দেশে ফিরে সরাসরি নেতাকর্মীদের মুখোমুখি হচ্ছেন। দলের রাজনীতির বাইরেও নানা ধরনের রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক তৎপরতার দিকে তাকে নজর রাখতে হচ্ছে। নির্বাচনের মাঠে এবার বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী। এ দলটি একসময় বিএনপির জোট সঙ্গী ছিল এবং ২০০১ সালে মন্ত্রিসভায়ও ভাগ বসিয়েছিল। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ডানপন্থি শক্তির বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে এবং এদের নানা ধরনের তৎপরতা বেড়েছে। এই শক্তি বিএনপির জন্য একটি বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দলের মধ্যপন্থার নীতি বজায় রেখে অগ্রসর হওয়া তারেক রহমানের সামনে আরেক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তিনি কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন, সেদিকে এখন সবার দৃষ্টি থাকবে।
এবার ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে চার কোটির বেশি নতুন প্রজন্মের ভোটার। তারেক রহমানের জন্য এই তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারা আরেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। ধারণা করা হচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে তরুণদের ভোট ফল নির্ধারণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। এরই মধ্যে দলের নির্বাচনী কমিটি গঠন করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্ব শেষ হলে শুরু হবে সব দলের নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার ও গণসংযোগ। বেগম খালেদা জিয়ার মতো সিলেট থেকেই তারেক রহমান নির্বাচনী গণসংযোগ শুরু করবেন, দল থেকে এমন ঘোষণায় দেওয়া হয়েছে। মনোনয়ন ঘোষিত কয়েকটি আসনে বঞ্চিত অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। এদের কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তাও দেখার বিষয়।
২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে তারেক রহমান গণসংবর্ধনা সমাবেশে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি সেদিন বলেছিলেন, পাহাড় থেকে সমতলের নারী-পুরুষ-শিশুসহ সব শ্রেণি-পেশার এবং সব ধর্মের মানুষ যাতে নিরাপদ থাকে, সেই চেষ্টা তার ও তার দলের থাকবে। তিনি সমাবেশে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। তারেক রহমান তার ঘোষিত নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার পরিকল্পনা এবং ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’-এর ভিত্তিতে নির্বাচনে দলকে জয়ী করতে পারেন কি না—সেই চ্যালেঞ্জ এখন একেবারেই সামনে থাকবে। তার দেশে ফেরার পরদিন একজন লেখক বন্ধুর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। আলাপচারিতায় লেখক বলেছিলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা সব ধরনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এক ধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে। এই স্বস্তি শান্তিতে পরিণত করার ক্ষেত্রে তিনি আগামীতে কী পদক্ষেপ নেন তাই এখন দেখার বিষয় এমনটাই বললেন লেখক বন্ধু।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন