হেনা শিকদার
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নদীকেন্দ্রিক পর্যটন

নদীকেন্দ্রিক পর্যটন

বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ, যাকে বলা হয় ‘নদীমাতৃক দেশ’। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা প্রায় সাতশ নদনদী এ দেশের ধমনি। টেমস নদীর পাড় ধরে যদি লন্ডন শহরের পর্যটন বিকশিত হতে পারে, কিংবা নীল নদকে কেন্দ্র করে মিশরের অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে, তবে পদ্ম-মেঘনা-যমুনার এ দেশে কেন নদীকেন্দ্রিক পর্যটন একটি লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে উঠল না? কেন পর্যটকরা ব্যাংকক বা ভেনিসের জলপথের টানে ছোটেন? আমাদের বরিশালের ব্যাকওয়াটার কিংবা ঢাকার চারপাশের নদীগুলো তাদের টানতে পারছে না?

‎এ ব্যর্থতার পেছনে কারণগুলো বেশ গভীর এবং বহুমুখী। এটি কেবল অর্থের অভাব নয়, বরং পরিকল্পনা, দূরদর্শিতা এবং রক্ষণাবেক্ষণের চরম অভাব।

‎নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের প্রধান শর্ত হলো স্বচ্ছ জল এবং নির্মল বাতাস। কিন্তু আমাদের বাস্তব চিত্র ঠিক তার উল্টো। ঢাকার চারপাশের নদীগুলো—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু—আজ কার্যত নর্দমায় পরিণত হয়েছে। ‎একজন পর্যটক যখন নৌকায় চড়বেন, তিনি নিশ্চয়ই বাতাসের বদলে আবর্জনা পচা গন্ধ নিতে চাইবেন না। বুড়িগঙ্গার কালো পানি এবং উৎকট গন্ধ পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করার জন্য যথেষ্ট। তার ওপর নদীর পাড় এবং তলদেশ পলিথিন ও প্লাস্টিকে সয়লাব। এ দৃশ্য কোনোভাবেই পর্যটকবান্ধব নয়।

‎বিদেশে ‘রিভার ক্রুজ’ বলতে যা বোঝায়, আমাদের দেশে তা হাতেগোনা কয়েকটি বিলাসবহুল জাহাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সাধারণ বা মধ্যবিত্ত পর্যটকদের জন্য আমাদের দেশে নৌপথ মানেই যেন দুর্ঘটনার আতঙ্ক। ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, ট্রলারের বেপরোয়া গতি এবং পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেটের অভাব পর্যটকদের মনে ভীতি সঞ্চার করে। তা ছাড়া নদীভ্রমণে নামার জন্য যে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ঘাট বা জেটি প্রয়োজন, তা নেই বললেই চলে। কাদা মাড়িয়ে, নড়বড়ে তক্তা পার হয়ে নৌকায় ওঠার অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়।

‎নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের জন্য সারা বছর নদীতে পানি থাকা জরুরি। কিন্তু অপরিকল্পিত বাঁধ, উজান থেকে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং দেশের ভেতর নদী দখলের মহোৎসবে অনেক নদীই আজ মৃত।

‎শীতকালে অনেক প্রধান নদী শুকিয়ে সরু খালে পরিণত হয়। ফলে বড় কোনো পর্যটকবাহী জাহাজ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

‎নদীর দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা, যা নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পুরোপুরি গিলে খেয়েছে। পর্যটকরা নদীর বুকে ভেসে কংক্রিটের বস্তি দেখতে আসেন না, তারা দেখতে চান সবুজ প্রকৃতি।

‎শুধু নৌকায় বসে নদী দেখাই পর্যটন নয়। আধুনিক পর্যটনে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে নানা কার্যক্রম। দেশে নদীতে কায়াকিং, ওয়াটার স্কিং, ফ্লোটিং মার্কেট বা ভাসমান রেস্তোরাঁর সংস্কৃতি এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি (কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ ছাড়া)। নদীর পাড়ে বসে সময় কাটানোর জন্য নেই কোনো সুপরিকল্পিত প্রমোদ উদ্যান বা ‘রিভার ফ্রন্ট ওয়াকওয়ে’। যা আছে, তাও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ।

‎সুন্দরবনের ভেতরে লঞ্চ ভ্রমণ বা বরিশালের পেয়ারা বাগান—এগুলো বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র হতে পারত। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বা এমনকি দেশের মানুষের কাছেও এর সঠিক ব্র্যান্ডিং হয়নি। বিদেশের পর্যটকরা জানেনই না যে বাংলাদেশে এত বিশাল জলরাশি এবং বৈচিত্র্যময় নৌপথ রয়েছে।

নদীকেন্দ্রিক পর্যটনকে বাঁচাতে হলে আমাদের নদীকে বাঁচাতে হবে সবার আগে। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করা এবং নদীর পানি শোধন করে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি বোট না নামিয়ে, পুরো এলাকাভিত্তিক (যেমন—চাঁদপুর মোহনা, কাপ্তাই লেক বা হাওর অঞ্চল) সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেবল সরকারি উদ্যোগে হবে না, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আধুনিক ক্রুজ শিপ, হাউসবোট এবং ওয়াটার স্পোর্টস চালু করতে উৎসাহিত করতে হবে।

নদীগুলো আমাদের অর্থনীতির ‘ব্লু গোল্ড’ বা নীল সোনা হতে পারত। কিন্তু অবহেলায় আমরা তা হারাতে বসেছি। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন কেবল বিনোদন নয়, এটি নদীকে বাঁচিয়ে রাখার একটি হাতিয়ারও। কারণ, যখন নদী থেকে আয় আসবে, তখন নদীকে পরিষ্কার রাখার গরজও তৈরি হবে। তাই আর দেরি না করে নদী ও পর্যটনকে একসূত্রে গেঁথে আমাদের এখনই কাজ শুরু করতে হবে। নতুবা ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’ কথাটি কেবল বইয়ের পাতাতেই শোভা পাবে।

হেনা শিকদার, ‎দর্শন বিভাগ

‎জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভালুকায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক

আরাও এক আসন থেকে সরে দাঁড়ালেন জামায়াত প্রার্থী

গভীর রাতে বিসিবি সভাপতি বুলবুলের দেশ ছাড়ার গুঞ্জন!

ডাকসু নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য : দুঃখ প্রকাশ সেই জামায়াত নেতার

আর্সেনালকে হারিয়ে প্রিমিয়ার লিগ জমিয়ে তুলল ম্যানইউ

তৌহিদ হোসেন ও ইসহাক দারের ফোনালাপ

ইয়ামালের অসাধারণ গোলে আবারও লা লিগার শীর্ষে বার্সা

ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে, দাবি তার ভাইয়ের

কিশোরদের কানে ধরে ওঠবস বিতর্ক, ব্যাখ্যা দিলেন ডাকসুর সর্বমিত্র

বাগেরহাটের ডিসি-এসপিকে ফোন করে হুমকি

১০

বিএনপির জনসভার ১৮টি মাইক, ৫ কয়েল তার চুরি

১১

দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বিএনপির রাজনীতি : রিজভী

১২

সিরাজগঞ্জে বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের শীতবস্ত্র বিতরণ

১৩

তারেক রহমানই বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে পারবেন :  সালাম

১৪

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঢামেকে শোক বই, উদ্বোধন করলেন ড্যাব সভাপতি 

১৫

শাকিবের গ্রিন কার্ড পাওয়ার ‘গোপন’ খবর ফাঁস করলেন অমিত হাসান

১৬

ইসিকে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছ ভোট গণনা নিশ্চিত করতে হবে : রবিউল

১৭

ঢাবির মাঠে খেলতে আসায় কানে ধরালেন ডাকসুর সর্বমিত্র

১৮

সোমবার গ্যাস থাকবে না যেসব এলাকায়

১৯

তারেক রহমানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই : মঈন খান

২০
X