মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে খালেদা জিয়ার নাম

স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে খালেদা জিয়ার নাম

বাংলার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের মূল্যায়ন শুধু তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন, ডিগ্রি বা সনদের নিরিখে করা যায় না। তাদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সময়, সমাজ ও মানুষের মানসিক গঠনে। সাহিত্যাঙ্গনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম সেই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতিনিধি। রাজনীতির পরিসরে সেই প্রথাভাঙা ধারার সঙ্গে তুলনীয় একটি নাম বেগম খালেদা জিয়া। তিনটি ক্ষেত্র ভিন্ন, কিন্তু একটি জায়গায় মিল স্পষ্ট—তারা সবাই প্রথাগত শিক্ষার সীমা ছাড়িয়ে নিজেদের ক্ষেত্রে ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়মিত বিদ্যালয় শিক্ষার শৃঙ্খলায় নিজেকে আবদ্ধ রাখতে পারেননি। শান্তিনিকেতনের মুক্ত শিক্ষাদর্শ তারই ফল। কাজী নজরুল ইসলাম দারিদ্র্য ও সংগ্রামের চাপে শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ করতে পারেননি, কিন্তু সেই সংগ্রামই তাকে বিদ্রোহী চেতনার কবিতে রূপ দিয়েছে। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যায় তার রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি কোনো একাডেমিক প্রস্তুতির ওপর দাঁড়ানো নয়। বরং এটি দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সময়ের কঠিন বাস্তবতার ওপর। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ছিল আত্ম-অনুসন্ধানের ভাষা। ঔপনিবেশিক শাসনের ভেতরে থেকেও তিনি বাঙালিকে আত্মমর্যাদার বোধ শিখিয়েছেন। নজরুল সেই আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছেন বিদ্রোহ ও সাম্যের উচ্চারণ। আর খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এনেছেন প্রতিরোধ ও ক্ষমতার পালাবদলের ধারণা। এ তিনজনের ভূমিকা ভিন্ন হলেও তাদের কাজ একই প্রশ্ন সামনে আনে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মুখে মানুষের অবস্থান কী? খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ছিল একটি সংকটময় সময়ের ফল। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ এমন এক রাজনৈতিক শূন্যতার মুখোমুখি হয়, যেখানে নেতৃত্বের প্রশ্ন ছিল অনিবার্য। একজন গৃহিণী থেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে আসা খালেদা জিয়ার যাত্রা সহজ ছিল না। এটি ছিল ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও ক্ষমতার বাস্তবতার এক জটিল সমীকরণ। এখানেই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের সঙ্গে তার একটি মৌলিক মিল দেখা যায়—তারাও নিজেদের সময়ের সংকট থেকেই উঠে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক আধুনিকতার সংকটে দাঁড়িয়ে মানবতাবাদের কথা বলেছেন। নজরুল সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। খালেদা জিয়া সামরিক শাসন ও কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্রের দাবিকে সামনে এনেছেন। ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক পর্ব শুরু হয়, তাতে তার ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। ১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখানে একটি প্রাসঙ্গিক তুলনা টানা যায়। রবীন্দ্রনাথ ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও ক্ষমতার সমালোচক ছিলেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে নাইটহুড গ্রহণ করেও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। নজরুল ব্রিটিশ রাষ্ট্রের দমননীতি মেনে নেননি, কারাবরণ করেছেন। খালেদা জিয়াও ক্ষমতায় থেকেছেন, আবার ক্ষমতার বাইরে থেকেও দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। ক্ষমতায় থেকেও সংসদীয় গণতন্ত্রে ফেরার সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার বাইরে থেকেও আপসহীন অবস্থান এ দ্বৈত অভিজ্ঞতা তাকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে নিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য যেমন ঐকমত্যের ভাষা তৈরি করেছে, নজরুলের সাহিত্য তেমনি মেরূকরণের ভেতর থেকেও সাম্যের ডাক দিয়েছে। খালেদা জিয়ার রাজনীতি অনেক সময় মেরূকরণ সৃষ্টি করেছে এ অভিযোগ অমূলক নয়। কিন্তু এটিও স্বীকার করতে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি আদতে ঐকমত্যনির্ভর নয়। স্বাধীনতার পর থেকে সামরিক শাসন, একদলীয় ব্যবস্থা, রাজনৈতিক সহিংসতা সব মিলিয়ে এ রাজনীতির চরিত্র ছিল সংঘাতমুখর। এ বাস্তবতায় শক্ত বিরোধী অবস্থান না থাকলে গণতন্ত্র কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দীর্ঘ সময় ধরে সেই বিরোধী পরিসরটি ধরে রেখেছে। এটি গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। রবীন্দ্রনাথ যেমন রাষ্ট্রচিন্তার বাইরে থেকেও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেছেন, নজরুল যেমন ক্ষমতার বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছেন, খালেদা জিয়াও তেমনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থেকেছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি দিক হলো প্রতীকী গুরুত্ব। দীর্ঘ কারাবাস, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক মামলার ভার তাকে শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নয়, বরং একটি প্রতীকী চরিত্রে রূপ দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল তাদের জীবদ্দশাতেই প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। খালেদা জিয়াও ধীরে ধীরে সেই প্রতীকী অবস্থানে পৌঁছেছেন সমর্থকদের কাছে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের প্রতীক, সমালোচকদের কাছে বিতর্কের কেন্দ্র। শিক্ষার প্রশ্নে এ তিনজনকে একসূত্রে বাঁধা যায়। প্রথাগত একাডেমিক শিক্ষা তাদের সবার ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল বা অসম্পূর্ণ। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই জীবনের ভেতর দিয়ে এক ধরনের গভীর শিক্ষা অর্জন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতি, দর্শন ও মানবসম্পর্ক থেকে শিখেছেন। নজরুল শিখেছেন সংগ্রাম, দারিদ্র্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য থেকে। খালেদা জিয়া শিখেছেন রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা, ক্ষমতার চাপ ও বিরোধিতার মূল্য থেকে। এখানে আরেকটি তুলনা প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল দুজনই তাদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে পরিচিত করেছেন। খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে একটি দৃশ্যমানতা দিয়েছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে দেশের উপস্থিতি এসব তার শাসনামলে গুরুত্ব পেয়েছে। এগুলো হয়তো তার একক কৃতিত্ব নয়, কিন্তু তার নেতৃত্বাধীন সময়ের বাস্তবতা। খালেদা জিয়ার রাজনীতি নিখুঁত ছিল না। তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা আছে, থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তার ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ক্ষেত্রেও ইতিহাস শুধু প্রশংসায় থেমে থাকেনি; তাদের কাজের সমালোচনাও হয়েছে। তবু তারা ইতিহাসে স্থায়ী হয়েছেন তাদের প্রভাবের জন্য। খালেদা জিয়াকে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের সঙ্গে তুলনা করা মানে তাদের ক্ষেত্র এক করে দেখা নয়। তুলনাটি প্রতীকের, প্রভাবের ও প্রথাভাঙার। যেমন রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল বাংলা সাহিত্যকে প্রথাগত সীমা ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন, তেমনি খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রথাগত নেতৃত্বের ধারণার বাইরে এনে দাঁড় করিয়েছেন। বাংলার ইতিহাসে তাই এ তিন নাম ভিন্ন ভিন্ন অধ্যায়ে হলেও একটি জায়গায় মিলিত তারা সবাই তাদের সময়কে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছেন। খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস লেখা যেমন অসম্ভব, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে বাদ দিয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস কল্পনাও করা যায় না। এ বাস্তবতাই তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন। খালেদা জিয়া ছিলেন বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী, যিনি স্বজাতির শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। এ বাংলা মামলুক সুলতান সুলতানা রাজিয়া (১২৩৬-১২৪০, যদিও নামেমাত্র বাংলা দিল্লি সালতানাতের অধীন ছিল, কার্যত বাংলা প্রদেশ তখন স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করত); এরপর ঔপনিবেশিক আমলে ব্রিটেনের রানি তার প্রতিনিধির মাধ্যমে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলার শাসনকার্য পরিচালনা করত। তারা উভয়ই ছিল বহিরাগত শাসক। এ ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ছিলেন প্রথম নারী শাসনকর্তা এ বাংলাদেশে, যিনি ছিলেন বাংলাদেশি বাঙালি। খালেদা জিয়া ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণ অক্ষরে বেঁচে থাকবেন যুগ-যুগান্তরে। তিনি বাংলার ইতিহাসে এক ক্ষণজন্মা মহীয়সী নারী, যিনি মানুষের অন্তরে ভালোবাসার মোড়কে থাকবেন অনন্তকাল।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

শাবিপ্রবিতে ভর্তি শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

একীভূত হচ্ছে সরকারের ৬ প্রতিষ্ঠান

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ইইউবি’র মামলা

বিশ্বকাপে না থাকা বাংলাদেশের প্রতি যে বার্তা দিল স্কটল্যান্ড

দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ, প্রায় ৬১ লাখই গাঁজাখোর

চমক রেখে বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের

একটি দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে : দুলু

ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাশেদ গ্রেপ্তার

১০

ছবি তোলায় আদালত চত্বরে সাংবাদিকের ওপর হামলা বিআরটিএ’র কর্মকর্তার

১১

৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠক

১২

আগামীতে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা আছে : জামায়াত

১৩

ডেমোক্র্যাটের মুসলিম নারী সদস্যের সম্পদ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৪

ভোটের দিন ফজর নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাবেন, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরবেন : কায়কোবাদ

১৫

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি দায়মুক্ত হতে পারে না’

১৬

সন্ত্রাসী হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত

১৭

বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জোরালো হচ্ছে

১৮

সাফে ব্যর্থতার নেপথ্যে কি ইনতিশার!

১৯

নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত হবে এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমির

২০
X