

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র এক মাস বাকি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া একটি বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য গণভোট শুধু ক্ষমতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের মাধ্যমে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক উপলক্ষ। এ দ্বৈত আয়োজন দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
প্রথমত, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়া জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার শক্তিশালী প্রকাশ। সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে আর গণভোটের মাধ্যমে কোনো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বা সাংবিধানিক বিষয়ে সরাসরি মতামত দেবে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ও প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের এ সমন্বয় নাগরিক অংশগ্রহণকে আরও অর্থবহ ও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। দ্বিতীয়ত, এ যুগপৎ নির্বাচন জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধের বড় পরীক্ষা। ভোটাররা শুধু দল বা প্রার্থীর প্রশ্নে নয়, বরং একটি মৌলিক রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও মত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে ভোটারদের চিন্তা, বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যায়। তৃতীয়ত, নির্বাচন ব্যবস্থাপনার দিক থেকে এটি নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও সক্ষমতা পরীক্ষার ক্ষেত্র। একইদিন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট আয়োজন মানে লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা, ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা, ব্যালট বা ভোটিং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ফল ঘোষণার ক্ষেত্রে বাড়তি দায়িত্ব। কমিশনের নিরপেক্ষতা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বই এ আয়োজনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে। নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে প্রশাসন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় সম্ভাব্য ‘বাধাদানকারীদের’ তালিকা প্রণয়ন, নজরদারি এবং প্রয়োজন হলে গ্রেপ্তারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সহিংসতা প্রতিরোধ করা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বিশেষ করে একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অমূলক নয়। তবে এখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রশ্ন হলো, ‘সম্ভাব্য বাধা সৃষ্টি করতে পারে’—এ ধারণার ভিত্তি কী এবং তা কীভাবে নির্ধারিত হবে। পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা এই, ব্যাপক ধরপাকড় ও অভিযানের মাধ্যমে নিরীহ মানুষ হয়রানি হয়। প্রথম দফার ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নিয়ে যে সমালোচনা হয়, তা মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দফার অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ প্রকৃত অপরাধী ও ষড়যন্ত্রকারীদের শনাক্ত করা এবং নির্দোষ নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় বৈঠকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ওপর যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক। এখনো বিপুলসংখ্যক লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার না হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি নির্বাচনকে সহিংস করে তুলতে পারে—এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সহনশীলতা, মুক্ত প্রচারণা ও ভয়ের পরিবেশ দূর করা।
সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একইদিন অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এক ঐতিহাসিক সুযোগ। এটি যেমন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি ব্যর্থ হলে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই এই দিনে সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।
মন্তব্য করুন