ইলিয়াস হোসেন
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যে কথা কেউ শোনে না

কতটা বদলে গেছেন তারেক রহমান

কতটা বদলে গেছেন তারেক রহমান

দ্রুত বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক দৃশ্যপট। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের জন্ম ও মৃত্যু হয়েছে। গুপ্ত অবস্থা থেকে প্রকাশ্যে নিজ দলীয় রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন অনেকে। ফুল হয়ে বিকশিত হওয়ার আগেই কলিতে ঝরে পড়েছেন কেউ কেউ। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক জট পাকিয়েছে ভোটের জোট। সবই হয়তো রাজনৈতিক হরমোন নিঃসরণের সাময়িক উত্তেজনা। অর্থাৎ, আদর্শের চেয়ে আসন জরুরি। তবে, জনগণের চাওয়া স্থিতিশীল রাজনীতি। বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছে মানুষ। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে এমন সক্ষম নেতাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ।

১৭ বছরের নির্বাসন শেষ করে নির্বাচনের আগে জন্মভূমিতে ফিরেছেন বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রত্যাবর্তনের দিন থেকে এখন পর্যন্ত পরিমিত বক্তব্য, বিনয়ী ও সংযত আচরণের জন্য প্রশংসায় ভাসছেন তিনি। কট্টর সমালোচকও ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রশংসাকারীর তালিকায় নাম ওঠাচ্ছেন। পরিণত, পরিশীলিত, আধুনিক, কেয়ারিং, ভিশনারি নানা বিশেষণে তারেক রহমানকে বিশেষায়িত করছেন। সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক মিত্র, প্রতিপক্ষ, অন্ধভক্ত, দলীয় অনুসারী থেকে বিভীষণ কেউ থেমে নেই স্তুতি চর্চায়। তবে, এখন পর্যন্ত বিষয়টিকে বিষের মতো মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। কিন্তু অতি প্রশংসা মাদকাসক্তির চেয়েও সর্বনাশের বড় অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বর্তমানকে রঙিন করে তুলতে গিয়ে অনেকে নিজের অজান্তে তারেক রহমানের অতীতকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। ‘তিনি আর আগের মতো নেই। তিনি এখন পরিণত রাজনীতিবিদ। ধৈর্যশীল ও বিনয়ী হয়েছেন। উনি অনেক বদলে গেছেন’—এসব কথা এখন প্রতিদিন গণমাধ্যমে লেখা ও বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক আড্ডাতেও অনিবার্য আলোচ্য বিষয় তারেক রহমান। আলোচ্য সূচিতে থাকছে তার আচার-ব্যবহার, ব্যবহৃত সাদা শার্ট, হাঁটা-বসা, হাসিমুখ, বিনয় ইত্যাদি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তারেক রহমান কি আগে দুর্বিনীত ছিলেন? তিনি তো কোনোকালেই গোমড়ামুখো ছিলেন না। পারিবারিক শিক্ষায় ভদ্র, মার্জিত ছেলে হিসেবে বেড়ে উঠেছেন তারেক রহমান। তাহলে রূপান্তরটা ঠিক কোথায়?

দলীয় প্রধানের সন্তান হওয়ার পরও ধাপে ধাপে পরীক্ষা দিয়ে সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তারেক রহমান। মা এবং বিএনপির সিনিয়র নেতাদের সাহচর্যে রাজনৈতিক দীক্ষা নিয়েছেন তিনি। অতীতে সংগঠন এবং নির্বাচনে কঠোর পরিশ্রম করেন ও দক্ষতার পরিচয় দেন। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর সুযোগ থাকলেও মন্ত্রিসভায় যাননি। সারা দেশ ঘুরে তৃণমূলে দলকে শক্তিশালী করেন। নিজ গুণে রাজনীতিতে তারুণ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সেখানেই বিধিবাম। রাজনীতিতে তার নিশ্চিত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে প্রতিপক্ষ। উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য নেওয়া অফিসের বিরুদ্ধে অব্যাহত অপপ্রচারে দুর্নীতির আখড়া হিসেবে পরিচিতি পায় ‘হাওয়া ভবন’। তাকে ঘিরে একটি বলয় রচনা করেন দলের তরুণ তুর্কিরা। তাদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং ক্ষমতা অপব্যবহারের নানা গল্পগাছা ছাপা হয় পত্রিকায়। এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ বা কোনো ব্যাখ্যা সে সময় দাঁড় করাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট তরুণরা। উল্টো তাদের হাতে দলের সিনিয়র নেতাদের অপমানিত ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার কাহিনি পল্লবিত হতে থাকে। তরুণ পারিষদবর্গের অপরিপক্ব প্রগল্ভতায় তারেক রহমানকে নেতিবাচক অর্থে ‘যুবরাজ’ বলে কটাক্ষ করে কতিপয় জ্ঞানপাপী। একপর্যায়ে সেসব ভাসাভাসা অভিযোগকে ভিত্তি ধরে এক-এগারোর সরকার তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে থাকে। গ্রেপ্তার-নির্যাতন-অসুস্থতায় বাধ্য হয়ে নির্বাসনে যেতে হয় তারেক রহমানকে। তিনি চলে গেলেন। কিন্তু বলে যেতে পারেননি কী পরিস্থিতিতে তাকে যেতে হলো। অনুসারীদের অতিভক্তির দায় নিয়ে গেলেন পরবাসে। অপবাদ আর লাঞ্ছনার ইতিহাস পড়ে রইল বাংলাদেশে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে শুধু মামলার ধারা অব্যাহত রাখেনি। আরও একধাপ এগিয়ে আদালতের মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে, হাসিনা রেজিমে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের একতরফা বিষোদগার শুনতে বাধ্য হয় দেশবাসী। যদিও কোটি কোটি টাকা খরচ করেও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি হাসিনা সরকার। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সব মামলায় খালাস পান তিনি।

নির্বাসনকালে শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে থাকেননি তারেক রহমান। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনীতির গতি-প্রকৃতিই পাল্টে দিয়েছেন তিনি। কাছ থেকে সভ্য দেশের উন্নত রাজনীতি, মানবিকতা দেখে হয়েছেন সমৃদ্ধ। আর বাংলাদেশের তৃণমূলের দলীয় নেতাকর্মীদের আস্থা দেখে হয়েছেন মুগ্ধ। দেশি-বিদেশি এজেন্সির মাধ্যমে হাজার চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভাঙতে পারেনি হাসিনা সরকার। বরং আরও শানিত হয়েছে তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। অতীতেও তিনি বাবা-মার মতোই স্বল্পভাষী ছিলেন। গতানুগতিক রাজনীতিবিদের মতো গলা ফুলিয়ে চিৎকার করে বক্তৃতা দেননি। ধীরস্থির এবং শব্দচয়নে বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। মাঝে অনেক বছর সাধারণের কাছে পৌঁছেনি তার কণ্ঠ। কিন্তু হঠাৎ সব বদলে যায়নি। রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে তার প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছে সেই ১৯৮৮ সালে। ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই বেশ কয়েক বছর কেটেছে অনুধাবনে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতা বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। এখন দেখার বিষয়, তাকে ঘিরে অতীতের মতো আবারও বলয় তৈরি হয় কি না! দলীয় প্রধান হিসেবে তার নিরাপত্তা এবং বিশ্বস্ত রাজনৈতিক কর্মচারী থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যক্তিগত স্টাফরা সাধারণ দায়িত্ব ছাপিয়ে গেলে অসাধারণ জটিলতার সৃষ্টি হয়। অতীতে উৎকটভাবে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা হতে পারে আগামীর পাথেয়।

গত শনিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মিলনায়তন ঘুরে সবার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন তিনি। ঠান্ডায় বসা গলা নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আরও ধীরস্থিরভাবে কথা বলেছেন। ধৈর্য ধরে অনেক সময় নিয়ে অনেকের কথা শুনেছেন। বক্তা ও আমন্ত্রিতদের কেউ কেউ অতীতে তাকে ব্যথা দিয়েছেন। তারপরও সবাইকে ডেকেছেন। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দুটোই হচ্ছে। আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থি বিপুল সাংবাদিকের উপস্থিতি দেখে মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন বিএনপিপন্থি কেউ কেউ। নিজেদের ১৭ বছরের বঞ্চিত হিসেবেও তুলে ধরেন অনেকে। কিন্তু সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চান তারেক রহমান। সে কারণেই হয়তো সব মত-পথের সাংবাদিকদের ডেকেছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়েছেন নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর। পরদিন তিনি এক টিভি টক শোতে বলেন, ‘তারেক রহমান রাজনীতিতে যথেষ্ট ম্যাচিউরিটির পরিচয় দেবেন বলে আশা করেন। তবে, তাকে ঘিরে আগের মতো বলয় সৃষ্টি হলে ক্ষতি হবে। নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি আর ব্যক্তিগত স্টাফদের কারণে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নেতারা। রাজনৈতিক কর্মচারীরা অনেক সময় নিজের লাভ বা মতাদর্শের কারণে নেতাকে বিভ্রান্ত করেন। সে ব্যাপারে তাকে সচেষ্ট থাকতে হবে।’ এখানেই তারেক রহমানের ট্র্যাজেডি। অতীতেও পারিষদবর্গের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে ভুগতে হয়েছে। অথচ, নিরাপত্তা ও বিশ্বস্ততার প্রশ্নে তাদের সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেন তিনি। তাদের ঘিরে ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি হয় দলের মধ্যে। ব্যক্তিগত কোটারি করতে গিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সুন্দর সুন্দর অনেক পরিকল্পনা নষ্ট হয় অযোগ্য মানুষের হাতে পড়ে। ব্যক্তিটি হয়তো নেতার খুব বিশ্বস্ত। কিন্তু তার ইমেজ জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হলে নেতাও হোন সমালোচিত। এই সবকিছুর নেতিবাচক ফলাফল ভোগ করতে হয় দল ও নেতাকে। এ অচলায়তন ভাঙতে হলে নির্লোভ ও সৎ মানুষের বিকল্প নেই। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে সবার আগে ভালো মানুষ লাগবে।

আগে দুবেলা নিয়ম করে অসত্য তথ্য দিয়ে তারেক রহমানকে নিষ্ঠুর আক্রমণ করতেন তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবী। তারা এখন নিজেরা হিংসায় জ্বলে যাচ্ছেন। প্রতিকূল পরিবেশে থাকায় অন্যদের জ্বালাতে পারছেন না। কিন্তু প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। রাজনীতিতে বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তাদের নেতারা কারাবন্দি এবং পলাতক। ফলে, সে জায়গা নিয়েছে বর্তমানের প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত। গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক সহযোগী দল এবং দীর্ঘদিন নির্বাচনী জোটে থাকায় বিএনপির ভেতর-বাহির তাদের জানা। জামায়াতের দায়িত্বশীল নেতারা বিএনপির সঙ্গে এক ধরনের সৌজন্যতা বজায় রাখেন। কিন্তু উগ্র সমর্থক এবং গুপ্ত কর্মীরা অনলাইনে প্রতিনিয়ত আক্রমণ করে তারেক রহমানকে। সে কারণেই শিবির নেতাদের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যানের ছবি দেখলে কষ্ট পায় ছাত্রদল। তবে, আবেগী না হয়ে আরও বেগবান হতে হবে তাদের। পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে সততার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে খাঁটি জাতীয়তাবাদীদের।

লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

শাবিপ্রবিতে ভর্তি শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

একীভূত হচ্ছে সরকারের ৬ প্রতিষ্ঠান

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ইইউবি’র মামলা

বিশ্বকাপে না থাকা বাংলাদেশের প্রতি যে বার্তা দিল স্কটল্যান্ড

দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ, প্রায় ৬১ লাখই গাঁজাখোর

চমক রেখে বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের

একটি দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে : দুলু

ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাশেদ গ্রেপ্তার

১০

ছবি তোলায় আদালত চত্বরে সাংবাদিকের ওপর হামলা বিআরটিএ’র কর্মকর্তার

১১

৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠক

১২

আগামীতে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা আছে : জামায়াত

১৩

ডেমোক্র্যাটের মুসলিম নারী সদস্যের সম্পদ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৪

ভোটের দিন ফজর নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাবেন, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরবেন : কায়কোবাদ

১৫

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি দায়মুক্ত হতে পারে না’

১৬

সন্ত্রাসী হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত

১৭

বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জোরালো হচ্ছে

১৮

সাফে ব্যর্থতার নেপথ্যে কি ইনতিশার!

১৯

নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত হবে এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমির

২০
X