

বর্তমান নগরসভ্যতার সঙ্গে গ্যাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রান্না থেকে শুরু করে কলকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, এমনকি ছোট দোকান পর্যন্ত—সবখানেই গ্যাসের ব্যবহার অপরিহার্য। দুঃখজনক হলেও সত্য, এক অনিশ্চয়তার নাম হয়ে উঠছে গ্যাস। এ ভোগান্তি শুধু রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রভাব পড়ছে মানুষের সময়, অর্থ, মানসিক স্বাস্থ্যে এবং সামগ্রিক নাগরিক জীবনে।
নগরজীবনে গ্যাস হলো সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী জ্বালানি। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য গ্যাসের বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। সকালবেলা স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ—সবারই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হয়। এ ব্যস্ত জীবনে গ্যাস যদি নিয়মিত না থাকে, তাহলে পুরো দিনের ছকটাই এলোমেলো হয়ে যায়।
বর্তমানে শহরের বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। কোথাও সকালে নেই, কোথাও আবার রাতে হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে রাতে গ্যাস চলে যাওয়াটা নাগরিক জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দিন কাজ শেষে মানুষ যখন রান্নার জন্য গ্যাসের চুলা জ্বালাতে যায়, তখনই দেখা যায় গ্যাস নেই।
অনেক সময় খুব কম চাপের গ্যাস আসে, যা দিয়ে রান্না করা প্রায় অসম্ভব। চুলায় আগুন জ্বলে ঠিকই, কিন্তু হাঁড়ি বসালে আগুন নিভে যায়। এতে রান্নার সময় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি দিনের পর দিন চলতে থাকলে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ তৈরি হয়।
গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবারে ইলেকট্রিক রাইস কুকার বা ইনডাকশন চুলা ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু সবার পক্ষে এসব কেনা সম্ভব নয়। একইভাবে গ্যাস সংকট শিক্ষার্থীদের জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে। সকালে দেরিতে রান্না হলে অনেক শিক্ষার্থী ঠিকমতো খেতে পারে না। খালি পেটে ক্লাসে বসে পড়াশোনা করা কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় বা মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরও করুণ।
কর্মজীবী মানুষদের জন্য সময় সবচেয়ে মূল্যবান। কিন্তু গ্যাস ভোগান্তি তাদের সময়ের হিসাব নষ্ট করে দেয়। সকালে দেরিতে রান্না হলে অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়। আবার রাতে রান্না করতে না পেরে পরদিন অফিসের জন্য খাবার প্রস্তুত করা যায় না।
অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খান, যা স্বাস্থ্য ও অর্থ—দুদিক থেকেই ক্ষতিকর। এভাবে প্রতিদিনের ছোট ছোট সমস্যা একসময় বড় মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতে সৃষ্টি হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ। গ্যাস না থাকায় মানুষকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা অনেক বেশি ব্যয়বহুল। এলপি গ্যাস সিলিন্ডার, বৈদ্যুতিক চুলা—এসবের খরচ সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া রেস্তোরাঁ, হোটেল ও ছোট খাবারের দোকানগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাস না থাকলে তাদের ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়। ফলে কর্মচারীরা কাজ হারায়, মালিকদের লোকসান গুনতে হয়। এই প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো নগর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রশাসনের উচিত গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা আরও পরিকল্পিত ও স্বচ্ছ করা। কোথায় কখন গ্যাস থাকবে না, তা আগে থেকে জানানো হলে মানুষ মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ সংযোগ বন্ধ করে সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। গ্যাস ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, আমদানি ব্যবস্থার উন্নয়ন—এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে যেন গ্যাসের অপচয় না হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গ্যাস ব্যবহারের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ সংকট কমানো সম্ভব।
লুৎফুন্নাহার, দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন