মো. মুনীরুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শহীদ জিয়ার শাসনামল এবং বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গন

শহীদ জিয়ার শাসনামল এবং বাংলাদেশ ক্রীড়াঙ্গন

এ দেশের মানুষ ভীষণরকম আবেগপ্রবণ ও আমুদপ্রিয়। আর তা যদি হয় ক্রীড়াঙ্গন, তবে তো কথাই নেই। ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, আর্চারি, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার; যাই হোক না কেন, জয় পেলেই হলো। খেলার মাঠের সাফল্যের জন্য যেন মুখিয়ে থাকে এ দেশের জনগণ। বাংলাদেশে হকি কখনোই জনপ্রিয় খেলা ছিল না। কিন্তু ঢাকায় অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ হকিতে বাংলাদেশ হকি দলের তুখোড় ক্রীড়া নৈপুণ্যের পর এ দেশে হকির জোয়াড় শুরু হয়েছিল। গ্রামগঞ্জে আমগাছের ডাল দিয়ে হকিস্টিক বানিয়ে মাঠেঘাটে হকি খেলা শুরু হয়ে গেল। রানী হামিদ, নিয়াজ মোর্শেদের সাফল্যের পর অনেক বাবা-মা সন্তানকে পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে দাবার বোর্ড ধরিয়ে দেন। টেবিল টেনিসের হেলেন-লীনু বোনদের দেশসেরা নৈপুণ্য অনেককেই টেবিল টেনিসের দিকে আকৃষ্ট করে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে দেশ পুনর্গঠনের রূপকার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও উঠেছিল পুনর্গঠনের ঢেউ। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহলের চরম দুর্নীতি এবং স্বেচ্ছাচারিতা ছেয়ে ফেলেছিল এ দেশকে। তখনই ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন রাষ্ট্রপতি জিয়া। তিনি যেমন করে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য নিজে নেমে পড়েন, তেমনি করে খেলার মাঠকেও নতুনভাবে সাজিয়ে তোলার জন্য তার তুলনা ছিল না।

১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালে এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সাফল্য অথবা পুনর্গঠন কেমন ছিল, তা দেখে নেওয়া যাক। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আইসিসির সহযোগী সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। যে কোনো দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে এ ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করা একটি বিশেষ কূটনৈতিক সাফল্য। এ সাফল্য লাভের পেছনে থাকে সেই সময়কার সরকার এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নিজ দেশের প্রচার এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা। অলিম্পিক এবং ক্রিকেটের মতো স্বনামধন্য দুটি ক্রীড়াক্ষেত্রে এ ধরনের গ্রহণযোগ্যতা সেই সময়কার ক্রীড়ানুরাগীদের সাংগঠনিক সাফল্যকেই প্রমাণ করে। এবার আসা যাক ফুটবল সাফল্য। ১৯৫৬ সাল থেকে এএফসি এশিয়ান কাপের যাত্রা শুরু। বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে প্রথমবারের মতো এ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেই কুয়েতে অনুষ্ঠিত মূল পর্বে খেলার সুযোগ করে নেয়। যদিও মূল পর্বে তেমন সাফল্য না এলেও প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেই মূল পর্বে আবির্ভূত হওয়া কম সাফল্য নয়। এ সময় ঢাকা সিনিয়র ডিভিশন ফুটবল লিগ দাপটের সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছিল। তাইতো ফুটবল ক্লাব অঙ্গনে শুরু হয়েছিল তুমুল প্রতিযোগিতা এবং ফুটবল খেলার ছিল ভীষণ জনপ্রিয়তা। ১৯৮০ সালকে ধরা হয়ে থাকে বাংলাদেশ ফুটবল অঙ্গনের স্বর্ণযুগ। এ সময় ঢাকা মোহামেডান এবং ঢাকা আবাহনী ছিল ভীষণরকম জনপ্রিয় দুই দলের নাম। তবে বিজেএমসি, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, রহমতগঞ্জ এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদও শক্তিশালী দল গঠন করত এবং ওয়ারী ক্লাব ও আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব ছিল ‘জায়ান্ট কিলার্স’। ১৯৭৮ সালে ঢাকার মাঠে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘এশিয়ার যুব ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ’। ১৯৭৯ ও ১৯৮১ সালে আগাখান ক্লাব টুর্নামেন্টের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অত্যন্ত শক্তিশালী ফুটবল ক্লাব এ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে ঢাকার ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের ভীষণভাবে আনন্দ দেয়।

১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশন, আন্তর্জাতিক দাবা ফেডারেশন (FIDE)-এর সদস্য পদ লাভ করে। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের দাবাড়ুরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধীরে ধীরে সুপরিচিতি লাভ করে এবং পরে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দাবাড়ু হিসেবে নিয়াজ মোর্শেদ গ্র্যান্ডমাস্টার উপাধি লাভ করেন। ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশে টেবিল টেনিস আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঢাকার বাইরে রংপুরে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৭ সালে গ্ল্যামার্স খেলোয়াড় লীনু সিঙ্গেলস, ডাবলস এবং মিশ্র ডাবলসে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৮০ সালে তিনি এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্টে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ হকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদচারণা শুরু করে। এ বছর মালয়েশিয়ায় আমাদের পুরুষ দল বিশ্ব জুনিয়র কাপ টুর্নামেন্টের এশিয়ান জোনে কোয়ালিফাই রাউন্ডে অংশগ্রহণ করে। ১৯৭৮ সালে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে সিনিয়র পুরুষ দল অংশগ্রহণ করে।

বাংলাদেশের জাতীয় খেলা কাবাডি। ১৯৮০ সালে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। খাল, বিল ও অসংখ্য নদীতে ভরপুর আমাদের বাংলাদেশ। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের প্রচেষ্টায় তৈরি হয় এশিয়ান অ্যামেচার সুইমিং ফেডারেশন (এএএসএফ)। বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনায় ১৯৮০ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম এশিয়ান সুইমিং প্রতিযোগিতা। এবার আসা যাক বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) তৈরির প্রাথমিক ধারণা। দেশের সব ক্রীড়া বিভাগের তৃণমূল পর্যায় হতে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শুরুর লক্ষ্যে একটি যুগান্তকারী ধারণার জন্ম হয় ১৯৭৭ সালে। এ ধারণা থেকেই ১৯৭৭ সালে প্রথম বাংলাদেশ স্পোর্টস ইনস্টিটিউট নামে একটি ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুরুর নীতিগত অনুমোদন প্রদান করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ সালে বর্তমান রূপ অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান’ নামে বাংলাদেশের সমগ্র ক্রীড়াঙ্গনের খেলোয়াড় তৈরির সূতিকাগার নামে ব্যাপকভাবে দেশে ও বিদেশে সমাদৃত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ ক্রীড়াক্ষেত্রের এ যুগান্তকারী চিন্তার জনক তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রতি শহীদ জিয়াউর রহমান।

১৯৭৭-৮১ পর্যন্ত এই অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের পদচারণা শুরু হয়। গুটিগুটি পায়ে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এ দেশটি বিশ্ব অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করতে থাকে। এ যেন সদ্য নবজাত শিশু চিৎকার দিয়ে সবাইকে জানান দেয়। ধীরলয়ে কিন্তু সুদীপ্ত পদভারে এগিয়ে আসছে একটি নতুন সার্বভৌম দেশ, নাম তার বাংলাদেশ। এ দেশের নতুন গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব ১৯৭৭ সাল থেকেই দীপ্তহাতে সমগ্র দেশকে পুনর্গঠন এবং পুনরুজ্জীবিত করার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। সমগ্র দেশের ন্যায় দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। এই জাদুর কাঠি যে নেতৃত্ব ধরেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের তৎকালীন নতুন এক রাষ্ট্র, ক্রীড়া উন্নয়নে তার ভূমিকা সত্যিই অনস্বীকার্য।

লেখক: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, এসজিপি, এসইউপি, পিএসসি, পিএইচডি এবং প্রাক্তন মহাপরিচালক, বিকেএসপি

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

শাবিপ্রবিতে ভর্তি শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

একীভূত হচ্ছে সরকারের ৬ প্রতিষ্ঠান

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ইইউবি’র মামলা

বিশ্বকাপে না থাকা বাংলাদেশের প্রতি যে বার্তা দিল স্কটল্যান্ড

দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ, প্রায় ৬১ লাখই গাঁজাখোর

চমক রেখে বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের

একটি দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে : দুলু

ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাশেদ গ্রেপ্তার

১০

ছবি তোলায় আদালত চত্বরে সাংবাদিকের ওপর হামলা বিআরটিএ’র কর্মকর্তার

১১

৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠক

১২

আগামীতে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা আছে : জামায়াত

১৩

ডেমোক্র্যাটের মুসলিম নারী সদস্যের সম্পদ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৪

ভোটের দিন ফজর নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাবেন, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরবেন : কায়কোবাদ

১৫

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি দায়মুক্ত হতে পারে না’

১৬

সন্ত্রাসী হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত

১৭

বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জোরালো হচ্ছে

১৮

সাফে ব্যর্থতার নেপথ্যে কি ইনতিশার!

১৯

নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত হবে এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমির

২০
X