

আজ ১৪ জানুয়ারি। এই দিনে ঐতিহাসিক পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের শুরু হয়। এই যুদ্ধ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং রক্তক্ষয়ী ঘটনা। ১৭৬১ সালের ১৪ জানুয়ারি দিল্লির উত্তরে পানিপথের প্রান্তরে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে একপক্ষে ছিল মারাঠা সাম্রাজ্য এবং অন্যপক্ষে ছিল আফগানিস্তানের শাসক আহমদ শাহ আবদালির (দুররানি) নেতৃত্বে একটি সম্মিলিত বাহিনী।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের সুযোগে মারাঠারা ভারতে তাদের আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। তারা উত্তর ভারতের বিশাল এলাকা দখল করে নেয়। সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে থাকে দিল্লির রাজনীতিতে। অন্যদিকে, আফগান শাসক আহমদ শাহ আবদালি ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় রাখতে ছিলেন তৎপর। মারাঠাদের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা আবদালির স্বার্থে আঘাত করলে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। আবদালির সঙ্গে স্থানীয় রোহিলা আফগান এবং অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা যোগ দেন, যা আফগান বাহিনীকে শক্তিশালী করে তোলে।
সদাশিব রাও ভাউর নেতৃত্বে মারাঠারা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। তবে যুদ্ধের আগেই মারাঠারা প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ থাকায় তাদের রসদ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে সেনারা ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যুদ্ধের দিন অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করলেও মারাঠারা আফগানদের উন্নততর সামরিক কৌশল এবং আধুনিক ভারী কামানের সামনে টিকতে পারেনি। আবদালির সুশৃঙ্খল অশ্বারোহী বাহিনী এবং রিজার্ভ ফোর্সের সঠিক ব্যবহার যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মারাঠা সেনাপতি সদাশিব রাও এবং পেশোয়ারপুত্র বিশ্বাস রাও যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন। এ যুদ্ধে মারাঠাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। তাদের হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই যুদ্ধের প্রধান ফল ছিল, মারাঠারা ভারত শাসন করবে না, এটি নিশ্চিত হওয়া।
যুদ্ধ কয়েক দিন স্থায়ী হয়। প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার সৈন্য এতে অংশগ্রহণ করে। উভয়পক্ষের লাভ এবং ক্ষতির পর আহমদ শাহ দুররানি পরিচালিত আফগান বাহিনী বিজয় লাভ করে। উভয়পক্ষের ক্ষতির পরিমাণ নিয়েও ঐতিহাসিকদের মতামত ব্যাপক বিতর্কিত। তবে এটি বিশ্বাস করা হয় যে, ৬০ থেকে ৭০ হাজারের কাছাকাছি সেনা যুদ্ধে নিহত হয়। একইভাবে আহত ও বন্দির সংখ্যা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী, যুদ্ধের পর প্রায় ৪০ হাজার মারাঠা কয়েদিকে হত্যা করা হয়। গ্রান্ট ডাফ তার ইতিহাসে এ গণহত্যা থেকে বেঁচে ফেরা এক মারাঠা সৈনিকের একটি সাক্ষাৎকার এ সংখ্যাকে সমর্থন করেছেন। সেজওয়ালকর যার ‘১৭৬১, পানিপথ প্রকরণ গ্রন্থ’; যেটি এ যুদ্ধের গ্রহণযোগ্য উৎস হিসেবে গণ্য হয়, তাতে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময়ে এবং পরে এক লাখেরও বেশি মারাঠা (সৈন্য ও অযোদ্ধা) ধ্বংস হয়ে যায়।’
তবে এ যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল আরও গভীর। মারাঠা শক্তির পতনে ভারতে একটি রাজনৈতিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়। উত্তর ভারতে কোনো শক্তিশালী দেশীয় শক্তি না থাকায় পরোক্ষভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অগ্রযাত্রার পথ সুগম হয়। যদি এ যুদ্ধে মারাঠারা জয়ী হতো, তবে ভারতের ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো বলে মনে করেন বহু ইতিহাসবিদ।
মন্তব্য করুন