

প্রচলিত ধারায়, বাংলাদেশে ভোটের মৌসুম মানেই জোটের তোড়জোড়, টানাপোড়েন, ভাঙা-গড়া, মান-অভিমান। এ যেন বিবাহ-শাদির ব্যাপার। অথচ এবার অন্যরকম প্রত্যাশা ছিল। সেই আশায় গুড়েবালি। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নতুন দলও গড্ডলিকা প্রবাহে। ভিন্ন অবস্থানের চেয়ে ভিড়ের বাসে ওঠার মতো জোটের বৃত্তে প্রাপ্তির কসরতে একবারে গলদঘর্ম। আর সবই চলছে সনাতনী তরিকায়। এ ক্ষেত্রে নতুন বন্দোবস্তের ছিটেফোঁটাও নেই। অথচ জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এবার ভিন্ন কিছু প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। জুলাইয়ের পর যে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সুযোগ ও সম্ভাবনা ছিল এবং যে স্বচ্ছ অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তাও জোট গঠনে দলগুলোর মননে থাকার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। বরং, জোটের সীমানায় আসন লাভের জন্য এক প্রকার যুদ্ধ চলছে। এখানে নতুন বন্দোবস্তের প্রত্যাশা পুরোই উপেক্ষিত।
এদিকে সব মিলিয়ে দেশের সামনে দৈত্যসম সংকট দাঁড়িয়ে আছে। চুপ করে আছে বিতারিত রাজনীতির রাক্ষস। এসব প্রসঙ্গ সাইডলাইনে রেখে আদর্শিক অঙ্গীকার প্রয়াস ছাড়াই আসন সমঝোতাই জোট গঠনের চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। এ জোটের কাভারেজে ভোটে জিতে কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে অবদান রাখবে, তা পরিষ্কার নয়। তবে এটি খুবই পরিষ্কার, ভোটের রেসে জেতার জন্য জোট গঠন প্রশ্নে নীতিনৈতিকতার কোনো বালাই নেই। বলে রাখা ভালো, বিএনপি ও জামায়াতের কোনো শরিকেরই জাতীয় পর্যায়ে ভোটব্যাংক নেই। কিন্তু আছে অহম আর প্রত্যাশার পাহাড়। ফলে জোট ভারী করার জন্য যাদের নেওয়া হয়েছিল, তাদের ভারেই প্রধান দুই দল অনেকটা ভারাক্রান্ত। আর তা নীতি-আদর্শ-কৌশল প্রশ্নে নয়, হালুয়া-রুটি ভাগ করার মতো আসন সমঝোতা নিয়ে সংকট।
এদিকে এটি স্পষ্ট, আগামী নির্বাচনে মূল লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াত জোটের মধ্যে; যা একেবারেই পুরোনো ধারা। অথচ দেশের মানুষ নতুন রাজনীতি চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই নতুনত্ব শুধু অবস্থানগত ভিন্নতা বা বাগ্যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, যা জনমনে নতুন কোনো আশা জাগায় বলে মনে হয় না। নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনীতি দুই জোটের একটির নেতৃত্বে আছে বিএনপি, অন্যটির শিরোমণি জামায়াত। এ দুই দলই অতীতে একই বৃন্তে দুটি ফুলের মতোই বিবেচিত হতো। এখন বৃন্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দুই দিগন্তে অবস্থান নিয়েছে। বিএনপির সঙ্গে আছে গণঅধিকার পরিষদ, গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলোসহ কয়েকটি খুবই খুচরা দল। জামায়াতের বলয়ে আছে ইসলামী আন্দোলন এবং এনসিপিসহ ১১টি দল। এরই মধ্যে বিএনপি ও জামায়াত তাদের জোটে থাকা দলগুলোর সঙ্গে নানান গোঁজামিল দিয়ে ‘আসন সমঝোতা’ করেছে। কিন্তু এ সমঝোতায় স্বস্তি নেই। বরং এক ধরনের বিভক্তি, সংশয়, অবিশ্বাস ক্রমান্বয়ে চাউর হচ্ছে। বিএনপি জোটে বড় হয়ে উঠেছে, জোটের প্রার্থীকে ছেড়ে দেওয়া আসনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী। তারা শক্ত অবস্থানে আছেন, তাদের জনভিত্তি আছে। আছে জোরালো কর্মী বাহিনী।
এদিকে জামায়াতের জোটে ইসলামী আন্দোলনের দ্বন্দ্ব এখন তুঙ্গে। সঙ্গে গলার কাঁটা হয়ে আছে এনসিপি। জামায়াতের জোটে সংকট ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে। একটি আসন নিয়ে। যেন সেই গান, ‘একটি গন্ধমের লাগিয়া..’। কখনো সংসদে না যাওয়া এবং ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সৌভাগ্যের সীমায় বিরাজমান এই দলটির মূল কেন্দ্র বরিশাল সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়ন। শহর থেকে নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন এই মাদকের অভয়ারণ্য ইউনিয়নটি বরিশাল সদর, তথা বরিশাল-৫ আসনের আওতাধীন। এ আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তিনি পীরের আপন ভাই। আবার সেই বচন, ‘আমরা-আমরাই তো’। এই একই আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। তিনি বরিশাল জেলারও আমির। একই জোটে থাকা দুই দলের কেউই আসনটি ছাড়তে নারাজ। যেন ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদেনী’। ফলে, দল দুটির মধ্যে টানাপোড়েন তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে যেখানে চরমোনাই পীরের মূল কেন্দ্র, সেখানে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়াকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ইসলামী আন্দোলন। এ প্রসঙ্গে দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির ও বরিশাল-৫ আসনে দলটির প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের বক্তব্য, ‘আমরা তো জামায়াত আমির ডা. শফিক সাহেবের আসনে প্রার্থী দেই নাই। সেখানে আমাদের এখানে তাদের প্রার্থী দেওয়াটা অসুন্দর হয়েছে। এই এলাকায় আমাদের ভিত্তি। এখানে জোটের অন্য কেউ নির্বাচন করবে, এটা সম্ভব? এটা কি হওয়া উচিত?’ এর জবাবে সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীমের দুই আসনে নির্বাচন করার ধনুক ভাঙা পণ প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত বলছে, ‘দুই আসনে তো জামায়াতে ইসলামীর আমির সাহেবও নির্বাচন করছেন না।’
প্রসঙ্গত, বরিশাল সদর আসনে একাধিকবার নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা আছে পীরের দলটির। বিশেষ করে গত মেয়র নির্বাচনে সরকারের সব শক্তি প্রয়োগ করার পরও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই খোকন সেরনিয়াবাতকে বিজয়ী করতে গলদঘর্ম হতে হয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে। আর এ আসনটি ঘিরেই মূলত ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব দৃশ্যমান। এমনকি জোটের কেন্দ্রে চিড় ধরিয়েছে বলে মনে বলছেন কেউ কেউ। এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে বড় সংকট সৃষ্টি হয়েছে বরিশালেরই পাশের জেলা পটুয়াখালীতে। পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী দেয়নি। এখানে জোটের পক্ষ থেকে শরিক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ‘শীর্ষ নেতা’ হিসেবে জোটের মনোনয়ন পেলেও এলাকায় হালে পানি পাচ্ছেন না নুরুল হক নুর। স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকরা তার বিরোধী। নুরের জবানিতেই অভিযোগ, ‘এলাকায় বিএনপির নেতাকর্মীর ৯০ ভাগই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন।’ উল্লেখ্য, আসনটিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাসান মামুন। সম্প্রতি তাকে দল থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। কিন্তু এই বহিষ্কারাদেশ তিনি হাঁসের পালকে পানির মতো বিবেচনা করছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রকাশ্যেই বলছেন, ‘বিএনপিকে বাঁচাতেই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছি।’ যেন বিএনপিকে বাঁচানোর একক ইজারা তার!
প্রসঙ্গত, বিএনপি এখন পর্যন্ত শরিকদের জন্য আসন ছেড়েছে এক ডজন। একসময় ডার্টি ডজন নামে একটি ইংরেজি মুভি খুবই জনপ্রিয় ছিল। সেই মুভিটি ছিল বেশ আলোচিত। একইভাবে শরিকদের জন্য বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনের জোটের প্রার্থীরাও বেশ আলোচনায় আছেন। এ আলোচনার বিষয় হচ্ছে, কয়জন পাস করবেন? কারণ, আলোচিত আসনগুলোর সবটিতেই বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তারাই মূলত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর স্থানীয় বিএনপির সমর্থন নিয়ে নাজেল হওয়ার মতো উড়ে এসে জুড়ে বসা প্রার্থীরা এলাকায় বহিরাগত হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছেন। তারা জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে এবং টিভি টক শোতে ‘বিশাল’ ব্যক্তিত্ব অথবা ধনেশ পাখি হলেও নির্বাচনী এলাকায় অনেকটা দলছুট চিত্রা হরিণ। তটস্থ অবস্থায় বিচরণ করেন। এলাকায় তাদের কোনো প্রভাব নেই। কিন্তু উত্তাপ আছে কেন্দ্রে, যা জোটের শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। আর এ কারণেই জোট শরিকদের সন্দেহ, বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরানো না হলে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশে পাওয়া যাবে না। ভোটে পাস কপালে জোটার বিষয়টি তো অনেক দূরের প্রসঙ্গ। তাদের জন্য এখন মাঠে শক্তভাবে দাঁড়ানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ, যেসব খুচরা দলগুলো বিএনপি-জামায়াত জোটের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ইসলামী আন্দোলন ছাড়া আর কারও জনভিত্তি নেই। এদিকে কেউ কেউ আবার মনে করেন, বিদ্রোহী প্রর্থীদের বহিষ্কারাদেশ এক ধরনের কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিজয়ী হলে খুশিমনে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে ঘরের ছেলেকে কোলে তুলে ঘরে নেওয়া হবে। আর বিজয়ী না হলেও ঘরের ছেলেকে বেশি দিন দূরে রাখার কোনো কারণ নেই! রাজনীতিতে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, দল থেকে বহিষ্কার হলেও পরে বহিষ্কৃতদের আবার দলে ফেরত নেওয়া হয়। বিশেষ করে নির্বাচনে জিতে গেলে দলে ফিরতে মোটেই সময় লাগে না। তখন হয়তো ফুলের বাজার চড়ে যেতে পারে। এদিকে জামায়াতের ১১ দলের জোটে পর্যন্ত আসন সমঝোতাই শেষ হয়নি। রসিকতা করে বলা হয়, নির্বাচনের পর এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই সমঝোতা হবে! এ বাস্তবতায় জামায়াতের জোটে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। এর মূল কেন্দ্রে আছে ইসলামী আন্দোলন। এমনকি জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারও মতে, জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটের আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা না কাটলে জোট ভাঙার দিকেও যেতে পারে। আবার প্রশ্ন হচ্ছে, ভেঙে যাবে কোথায়? অনেকেই তো রাজনীতিতে আগাছা! না আছে কর্মী, না আছে ভোটব্যাংক।
সব মিলিয়ে দুটি রাজনৈতিক জোট ভেতর থেকে যে সংশয় আর অবিশ্বাসের মুখোমুখি তার সমাধান কীভাবে হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে নির্বাচনের আগে জোট দুটির ভবিষ্যৎ—এমনটাই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। আর জোটে আসন সমঝোতা হোক বা ‘মুখরা নারী বশীকরণ’ হোক, অথবা অন্য যাই হোক না কেন; তা যে জনপ্রত্যাশার সমান্তরালে যাবে না—তা হলফ করে বলা যায়। তাহলে, রাজনীতি তো যেই লাউ সেই কদুই থেকে গেল! দেশ রূপান্তর হবে কীভাবে? আর নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর রাজনীতি কোন দশায় পড়বে? এই আশঙ্কা নিয়েই নির্বাচনের পুলসুরাত পার হওয়ার পর আমাদের জন্য কোন পরিস্থিতি ওত পেতে আছে? মহা আশঙ্কার এ প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
মন্তব্য করুন