

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সংকটপূর্ণ ও সংবেদনশীল পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেশীয় কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, ডলারের তুলনায় টাকার অব্যাহত অবমূল্যায়ন, আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর লাগাতার চাপ সামগ্রিক অনিশ্চয়তা আরও তীব্র করে তুলেছে। ডলারের মূল্য দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যার সরাসরি প্রতিফলন ঘটছে উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকট, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বারের পক্ষ থেকে চীনের কাছে একটি দুর্বল ব্যাংক অধিগ্রহণ এবং দেশে পূর্ণাঙ্গ একটি চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। উদ্যোগটি এখন আর শুধু একটি সাধারণ বাণিজ্যিক বা বিনিয়োগ প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না; বরং এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেন কাঠামো, মুদ্রানীতি এবং আর্থিক খাত সংস্কারের সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা হিসেবেও আলোচনায় এসেছে। ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি এবং ব্যাংক খাতে বিদেশি মূলধন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা যুক্ত করার প্রশ্নে এ প্রস্তাব নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করছে। ফলে চীনা ব্যাংক স্থাপনের বিষয়টি এখন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কৌশলে একটি সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ এবং চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক গত এক দশকে নাটকীয়ভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব বলছে যে, দেশের মোট আমদানির প্রায় ২৬ শতাংশই আসে চীন থেকে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয়েছে ১৬.৬৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, যেখানে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ০.৭ বিলিয়ন ডলার। এ বাণিজ্য ঘাটতি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ বাড়ায় না, বরং মুদ্রা রূপান্তরের কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ও তৈরি করে। ব্যবসায়ীদের প্রথমে টাকা থেকে ডলার এবং পরে ডলার থেকে ইউয়ানে রূপান্তর করতে হয়। প্রতিটি স্তরে ব্যাংক চার্জ যোগ হওয়ায় এ খরচ গড়ে ১.২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। বছরে আড়াই লাখ কোটি টাকার চীন আমদানির ওপর এই অতিরিক্ত ব্যয় ৩ হাজার থেকে ৭ হাজার কোটি টাকার সমান। এ ব্যয় সরাসরি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে এবং সাধারণ ভোক্তার জীবনে চাপ সৃষ্টি করে।
চীনা ব্যাংক থাকলে সরাসরি ইউয়ানে লেনদেনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে এই বহুধাপীয় রূপান্তরের জটিলতা কমবে, খরচ কমবে এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে। বাংলাদেশের রিজার্ভ ২০২২ সালে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা ২০২৪ সালে নেমে এসেছে প্রায় ২৭ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলারে। রিজার্ভ সংকটের এ সময় ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউয়ানভিত্তিক আংশিক লেনদেন অর্থনীতিকে স্বস্তি দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, গত পাঁচ বছরে ডলারের মূল্য ৪৫ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে ইউয়ানের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। এ পার্থক্যই স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। খেলাপি ঋণের সরকারি হিসাব প্রায় ১.৩ লাখ কোটি টাকা হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রকৃত অঙ্কটি ৩ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি বলে উল্লেখ করে। দুর্বল ব্যাংকের সংখ্যা ২০টির মতো এবং এগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত মূলধন। সরকার এ অর্থ জোগান দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বিদেশি মূলধনের অংশগ্রহণ এ কারণে একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীন যদি কোনো দুর্বল ব্যাংক অধিগ্রহণ করে, তবে নতুন মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী তদারকি কাঠামো খাতটিকে কিছুটা হলেও স্থিতিশীল করতে পারে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় প্রকল্পেও চীনের অর্থায়ন বা কারিগরি সহযোগিতা রয়েছে। এসব প্রকল্পের অর্থপ্রবাহে ডলারের অভাব ও লেনদেন জটিলতা প্রায়ই সমস্যা তৈরি করে। দেশে চীনা ব্যাংক থাকলে প্রকল্প লেনদেন আরও দ্রুত ও সুবিধাজনকভাবে সম্পন্ন হতে পারে। একই সঙ্গে পোশাক খাত, ইলেকট্রনিকস, মেশিনারি এবং নির্মাণ শিল্পসহ চীননির্ভর ব্যবসাগুলোও সরাসরি উপকৃত হবে। এলসি খোলা সহজ হবে, খরচ কমবে এবং সময় বাঁচবে।
তবে প্রস্তাবটি ঝুঁকিমুক্ত নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায় যে, বিদেশি ব্যাংক বা বিনিয়োগ কখনো কখনো সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থিক সার্বভৌমত্বের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিভিন্ন দেশে চীনের অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদি ঋণচাপে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাই চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছ শর্ত, কঠোর তদারকি এবং জাতীয় স্বার্থরক্ষার নিশ্চয়তা ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
ইউয়ান লেনদেনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। বাংলাদেশের রপ্তানি কম হওয়ায় ইউয়ান রিজার্ভ স্বল্প। তবে চীনের প্রকল্প, ঋণ এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ইউয়ান দেশে প্রবেশ করে। এ সীমিত ইউয়ানও আংশিক লেনদেনে ব্যবহার করা গেলে ডলারের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। বিশ্বের বহু দেশ এখন ইউয়ানসহ বহুমুদ্রার প্রতি আগ্রহী। বাংলাদেশও এ বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোলে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় রাখতে পারবে।
বিদেশি ব্যাংকের উপস্থিতি সাধারণত দেশীয় ব্যাংকগুলোর ওপর প্রতিযোগিতার চাপ সৃষ্টি করে, ফলে গ্রাহকসেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংক বহু বছর ধরে পরিচালিত হচ্ছে। তাই চীনা ব্যাংকের আগমন নতুন কোনো বাস্তবতা নয়। বরং আর্থিক খাতে বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে।
ভবিষ্যতের দৃষ্টিতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতা শিল্প, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও বাণিজ্যে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট। বাণিজ্যের এ সম্প্রসারণ টেকসইভাবে পরিচালনা করতে বৈদেশিক লেনদেনের কাঠামো আধুনিকীকরণ অপরিহার্য। ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ কাঠামোর সবচেয়ে বড় বাধা। ইউয়ানভিত্তিক বহুমুদ্রা লেনদেন সেই বাধা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের সব সমস্যার পূর্ণ সমাধান না হলেও এটি ডলারের চাপ কমানো, দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, আমদানি ব্যয় হ্রাস এবং বাণিজ্য প্রবাহ সহজ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। তবে ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, কঠোর তদারকি, স্বচ্ছ শর্ত এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার। একটি দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা শুধু সুযোগ গ্রহণের ওপর নয়, সেই সুযোগ কতটা পরিকল্পিতভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে। এ কারণে চীনা ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাবকে শুধু সুবিধা কিংবা ঝুঁকি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা, আর্থিক সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক স্বার্থ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণই সবচেয়ে জরুরি। উদ্যোগটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে আর ভুল বা অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত দেশের আর্থিক কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করার আশঙ্কা তৈরি করবে।
লেখক: ব্যাংকার এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
মন্তব্য করুন