

সমসাময়িক বাংলাদেশে গুজব যেন সংবাদকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে দ্রুতগতির ও অধিক কার্যকর জনসঞ্চার মাধ্যম হয়ে উঠেছে। গুজবের নিজস্ব একটি কাঠামো আছে; সংবাদের মতোই এরও প্রডাকশন, কনটেন্ট, গ্রহণ, শেয়ারিং ও পুনর্ব্যাখ্যার লাইন থাকে, কিন্তু সংবাদ যেখানে পেশাগত, তথ্যনির্ভর ও যাচাই যোগ্যতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ, সেখানে গুজবমুক্ত। যার কারণে এ মুক্ততা তাকে দ্রুততর করে, অধিক আকর্ষণীয় করে এবং অধিক বিপজ্জনকও করে তোলে।
দেশে তথ্য ও ক্ষমতার পরিবর্তনশীল টানাপোড়েনের মধ্যে গুজবের বিস্তারকে বুঝতে হলে শুধু সামাজিক মিডিয়ার ভূমিকা দিয়ে বিষয়টি ক্ষুদ্রায়িত করা যাবে না; বরং দেখতে হবে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, মিডিয়ার অর্থনৈতিক ও সম্পাদকীয় সংকট, পারিবারিক ও সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব, ইতিহাসে রটনা এবং ডিজিটাল বাজারে নজর আকর্ষণের অর্থনীতি। সবকিছু মিলিতভাবে কীভাবে একটি ‘সামাজিক-প্রযুক্তিগত ইকোসিস্টেম’ তৈরি করেছে, যেখানে গুজব সংবাদ হয়ে ওঠে আর সংবাদ গুজবের ন্যায় সত্য-মিথ্যাহীন তরল এক তথ্যধারায় গলিয়ে যায়।
আমাদের দেশে সংবাদ মানে শুধু ঘটনা বিবরণ নয়, বরং সামাজিক-রাজনৈতিক অর্থের উৎপাদন। আর গুজব যেন তার ছায়া-সংবাদ, যা প্রায়ই একই ঘটনার বিকল্প বয়ান তৈরি করে। এর কারণ শুধুই গুজবের বিভ্রম বা উত্তেজনা নয়; বরং দর্শকের মনস্তাত্ত্বিক নির্বাচনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সংবাদে যেমন তথ্য চায়, তেমনি অর্থ চায় আর সেই অর্থকে নিজের অভিজ্ঞতা, ভয়, আশা, বিরোধ, পক্ষপাত ও অবিশ্বাসের সঙ্গে মেলাতে চায়। গুজব সেই মেলানোকে সহজতর করে। কারণ, সে প্রশ্ন করে না, প্রমাণ চায় না, বরং আগেভাগেই উত্তরের মতো প্যাকেজ হয়ে আসে।
এ প্রেক্ষাপটে প্রথম প্রশ্ন ওঠে, এখন কেন গুজব এত দ্রুত সংক্রমিত হয়? তথ্যবিজ্ঞান ও নেটওয়ার্ক তত্ত্বের মতে, মাধ্যমগত কারণে; সামাজিক মিডিয়ার রিয়েল-টাইম বিস্তার, অ্যালগরিদমিক প্রমোশন ও শেয়ার-ইকোনমির কাঠামোই গুজবকে দ্রুততর করে। তবে সামাজিক মনস্তত্ত্বের মতে, ব্যবস্থাগত অবিশ্বাসের পরিবেশে মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের থিওরি মনে করিয়ে দেয়, সমাজে মানুষ রাষ্ট্রীয় ঘোষণাকে সন্দেহ করে, সেখানে গুজব রাষ্ট্রীয় সংবাদকে ছাপিয়ে যায়। দেশের ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় তথ্যব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে জনসন্দেহ নতুন নয়। ঔপনিবেশিক আমল থেকে সামরিক ও আধাসামরিক শাসন, সেন্সরশিপ এবং দলীয় সংবাদযুদ্ধ; এ দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় সংবাদ ও ক্ষমতার সম্পর্ক এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, তথ্য আর শুধু তথ্য থাকে না; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত। তাই সাধারণ মানুষ বিকল্প বয়ান খোঁজে; প্রথমে এলাকায়, পরে ফেসবুকে, মেসেঞ্জারে, ইউটিউবে, মন্তব্যে। এ বিকল্প বয়ানের প্রাথমিক কাঁচামাল প্রায়ই হয় গুজব। রাষ্ট্র যেখানে বৃহৎ, আনুষ্ঠানিক ও ধীর; গুজব সেখানে ক্ষুদ্র, অনানুষ্ঠানিক, নমনীয় কিন্তু দ্রুত।
গুজবে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার প্রশ্নও আসে। রাষ্ট্র সাধারণত গুজব দমনকে নিরাপত্তা নীতি হিসেবে দেখে, গণতান্ত্রিক সংলাপ হিসেবে নয়। কিন্তু দমন ও নিষেধাজ্ঞা গুজবকে কমায় না; বরং উৎস গোপন করে আরও চোরাগোপ্তা করে তোলে। মানুষ যদি জানে যে কথা বললে শাস্তি হবে, তারা কথা বলা বন্ধ করে না; বরং চুপিচুপি শেয়ার করে। ইতিহাসে দেখা যায়, দমনমূলক পরিবেশে গুজব বেশি জন্মায়।
এদিকে ডিজিটাল মিডিয়া শুধু গুজব বাড়ায়ই না; তথ্য-নিয়ন্ত্রণের বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি করে। কিন্তু এখানে আরেক জটিলতা ‘যাচাই’ নামের পেশা এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্বল। ফ্যাক্টচেকিং বর্তমানে সীমাবদ্ধ ও প্রধানত প্রতিক্রিয়াশীল। ফলে গুজব প্রথমে আঘাত করে, ফ্যাক্টচেক পরে মেরামত করতে চেষ্টা করে। ফলাফল—গুজব এগিয়ে থাকে। সংবাদ সংস্থা গুজবের পেছনে দৌড়াতে বাধ্য হয়। যেখানে সংবাদ আগে তথ্য এনে দিত, এখন সংবাদ কখনো কখনো শুধু গুজবের জবাব দেয়। সংবাদ তার উদ্যোগী ভূমিকা হারালে গুজবের উদ্যোগ বাড়ে। ফলে দেখা যায়, আমাদের দেশে গুজব তথ্যের বিকল্প, অবিশ্বাসের ভাষা, ভয়ের বয়ান, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, জনঅভিজ্ঞতার ছবি ও বাজারের পণ্য।
আরিফুল ইসলাম রাফি, শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন