কাজী বনফুল
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাইমারির প্রশ্নপত্র ফাঁস ও করণীয়

প্রাইমারির প্রশ্নপত্র ফাঁস ও করণীয়

একজন শিক্ষার্থীর মূল একাডেমিক বেজমেন্ট নির্মাণ হয় তার শৈশবে প্রাপ্ত শিক্ষা পদ্ধতির ওপর। একজন মানুষ কেমন মানুষ হবে, তা নির্ভর করে তার শৈশবটা সে কোন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। সে ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ভূমিকা যার থাকে সেটা তার স্কুল। আর একজন শিশুর জন্য সে ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন প্রাইমারি স্কুল ও স্কুলের শিক্ষকরা।

একজন মানুষের শৈশবে যে বোধ, যে মানসিক স্থিতি অর্জন হয়, সেটা তার সারা জীবনের পথচলার পাথেয় হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে প্রাইমারি স্কুলের ভূমিকা পরিবারের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অথচ মাঝেমধ্যেই শোনা যায় প্রাইমারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। যে জাতি প্রাইমারির প্রশ্নপত্র ফাঁস করে শিক্ষক হতে চায় এবং হয়, সে জাতির ভবিষ্যৎ কতটা মসিকৃষ্ণ তার জন্য খুব বেশি ভাবতে হয় না, একটু ভালোভাবে বৈশ্বিক চাইল্ড একাডেমির সঙ্গে সমন্বয় করলেই বোঝা যায়। প্রশ্নপত্র ফাঁসের দড়িকে যারা তাদের পুলসিরাতের পথ হিসেবে বেছে নিয়ে শিশুদের শিক্ষক হবেন, শিশুদের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা, স্নেহ, অভিভাবকতুল্য আচরণ যে খুব বেশি মসৃণ হবে না, সেটা বুঝতে খুব বেশি গবেষণা করতে হয় না।

একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃতীয় শ্রেণির ৭৬ ও চতুর্থ শ্রেণির ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঠিকমতো বাংলা পড়তে পারছে না। এর আগেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণি উত্তীর্ণ হলেও তাদের সবার ঠিকমতো পড়ার দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংকের একটি জরিপেও দেখানো হয়েছিল, প্রাথমিকের মাত্র ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে। নিজের মাতৃভাষাই যারা ঠিকমতো পড়তে পারছে না, তাদের অন্য সব বিষয়ে কী করুণ ও বেহাল দশা, সেটা আর বলার অবকাশ রাখে না।

কী ভয়ংকর বিপর্যয়ের দিকে আমরা উচ্চনিনাদে এগিয়ে যাচ্ছি ভাবা যায়? আমরা শুধু বর্তমান সময়ের কথাই ভাবছি কিন্তু আমরা যখন অতীত হব, আমরা যখন এই পৃথিবীর শরীরে অদৃশ্য বালুকণায় বিলীন হব, তখন কারা নেতৃত্ব দেবে সেই সময়কে, তারা এই কিন্তু শিশুরাই। এরাই তখন চিন্তার ভীত স্থাপন করবে উচ্চ কলরবে। অথচ তাদের শিক্ষাব্যবস্থার পদ্ধতি বা মান যদি এমন নিম্ন হয়, তাহলে সেই চিন্তা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য অবশ্যই মঙ্গলজনক হবে না। কবি-সাহিত্যিকরা তাদের কলমের আঁচড়ে নানান সময়ে নানাভাবে বুঝিয়েছেন যে, আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ কিন্তু আমাদের এ শিশুরা ভবিষ্যতে কেমন ভবিষ্যৎ হবে, সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না।

আমার বাবা এখনো তার প্রয়াত শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নূরু মাস্টার স্যারের প্রতি কৃতজ্ঞ ও দায়বদ্ধ। এখনো তার গুরুস্থানীয় এ শিক্ষকের প্রতিটি কথা, চিন্তা ও আদর্শের গল্প আমাদের কাছে বলেন এবং অনুসরণ করতে উৎসাহ জোগান। এর পেছনে যে কারণটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সেটি হচ্ছে, শিক্ষকের তার ছাত্রের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দরদ যেটা আজকাল খুব একটা চোখে পড়ে না। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়।

আমার এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে, আমাদের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত চান মিয়া মাস্টার। তিনি কী সযত্নে আমাদের আদর্শলিপি পড়াতেন। স্কুলে আদর্শলিপি পড়া দিয়ে দিতেন এবং বাবা বাড়িতে বসিয়ে ধরে ধরে সেই আদর্শলিপির পড়া প্রস্তুত করে দিতেন। সেখানকার কিছু বাক্য এখনো হৃদয়ের বোর্ডে অতিউজ্জ্বল হয়ে অঙ্কিত আছে।

অ-তে অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো,

উ-তে উগ্রভাব ভালো নয়,

এ-তে একতা সুখের মূল,

ম-তে মন দিয়া বিদ্যাভাস করো,

ক্ষ-তে ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ।

এই যে এসব অমৃত বাণী, এ বাণীগুলো যদি কারও বোধের মৃত্তিকায় সযত্নে রোপণ করা যায়, তাহলে তার সারা জীবনের পথচলায় বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অথচ আমাদের সেই আদর্শলিপি আজ নেই, আছে শুধু ভারী ভারী কালির পৃষ্ঠার মোটা মোটা বই; যা শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক দাঁড়িপাল্লার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিশুদের মনের যে দাঁড়িপাল্লা, সে দাঁড়িপাল্লায় ওইসব মোটা মোটা বইকে বহন করার মতো শক্তি বা সামর্থ্য একদমই নেই। শিশুদের নিজেদের মতো শক্তিশালী মনে করে তারা শিশুদের মাথায় তুলে দিচ্ছে তাদের সমতুল্য বই। শিশুদের তারা আর শিশু ভাবছে না, ভাবছে তাদের মতোই বার্ধক্যে জর্জরিত মানুষ। ফলে বইয়ের কালির সমুদ্রে শিশুরা হাবুডুবু খেতে খেতে তলিয়ে যাচ্ছে গভীর তলদেশে। সেখান থেকে তাদের তুলে আনার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন, সে শক্তি আমাদের বাহুতে নেই। কারণ, বার্ধক্যজনিত, মেদবহুল বাহুতে অন্ধকারের নিমজ্জিত কীটের আক্রমণকে প্রতিরোধের ক্ষমতা থাকে না।

তাই আমাদের এ শিশুদের ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করার এখনই সময়। শিশুদের রক্ষার জন্য নির্মাণ করতে হবে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অপপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যে শিক্ষকরা নিয়োগপ্রাপ্ত হন, সে শিক্ষক কখনোই শিশুদের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করে আলোর ঝলকানি দেখাতে পারেন না। কারণ, তিনি নিজেই অন্ধকারে নিমজ্জিত, তার নিজেরই আলো নেই, তিনি কী করে শিশুদের আলোকিত করবেন। যেহেতু আমরা তথ্যপ্রযুক্তির প্রচণ্ড দাবদাহে জ্বলছি, সেহেতু শুধু এমসিকিউ পদ্ধতিতে প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থা চলমান থাকলে সেটা নিয়ে অবশ্যই উদ্বিগ্নতা থাকবে। কারণ, এমসিকিউ প্রশ্ন খুব সহজেই কেউ চাইলেই ছবি তুলে ফাঁস করে দিতে পারে। কিন্তু আমরা যদি শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিটায় একটু পরিবর্তন এনে এমসিকিউর সঙ্গে লিখিত ব্যবস্থারও প্রচলন ঘটাই, তাহলে সম্ভবত এই প্রশ্নপত্র ফাঁস নামক অপকর্ম চাইলেই আর কেউ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে আমরা যেমন দক্ষ ও মানসম্পন্ন শিক্ষক পাব, তেমনি যারা অযোগ্য বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে শিক্ষক হওয়ার চেষ্টায় আছেন, তারাও তাদের এ অপপ্রক্রিয়ায় সফল হতে পারবেন না। সেইসঙ্গে মানসম্মত শিক্ষকের পাশাপাশি তাদের মানসম্মত বেতনের নিশ্চয়তাও জরুরি। কারণ, মানসম্মত বেতন জীবনের নিশ্চয়তা দেয় আর জীবনের নিশ্চয়তা মানে হলো সঠিক শিক্ষাদানের পথ উন্মুক্ত হওয়া। সে ক্ষেত্রে ভালো ছেলেমেয়েরা শিক্ষা পেশায় আসতে চাইবে। যে বেতনে মাসের পরিপূর্ণ বাজারের নিশ্চয়তা নেই, সেই সেক্টরে মেধাবীরা কখনোই আসতে চাইবে না, এটা স্বাভাবিক। আর আমার কাছে উচ্চ মাধ্যমিক, কলেজ, ইউনিভার্সিটির চেয়ে প্রাইমারির শিক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।

শিশুরা যেহেতু আমাদের আগামী সময়ের দিকপাল, সেহেতু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই সুবর্ণ সময়, নচেৎ আমরা ভবিষ্যৎ সময়ে হারিয়ে যাব কৃষ্ণগহ্বরের অদৃশ্য গুহায়।

লেখক: সাংস্কৃতিককর্মী

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপার সিক্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যারা

শাবিপ্রবিতে ভর্তি শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

সরিষা ফুলের হলুদ মোহ দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

একীভূত হচ্ছে সরকারের ৬ প্রতিষ্ঠান

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীরসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে ইইউবি’র মামলা

বিশ্বকাপে না থাকা বাংলাদেশের প্রতি যে বার্তা দিল স্কটল্যান্ড

দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ, প্রায় ৬১ লাখই গাঁজাখোর

চমক রেখে বিশ্বকাপের জন্য দল ঘোষণা ওয়েস্ট ইন্ডিজের

একটি দল নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে : দুলু

ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাশেদ গ্রেপ্তার

১০

ছবি তোলায় আদালত চত্বরে সাংবাদিকের ওপর হামলা বিআরটিএ’র কর্মকর্তার

১১

৫ শীর্ষ ব্যবসায়ীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ঘণ্টাব্যাপী বিশেষ বৈঠক

১২

আগামীতে নারীদের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা আছে : জামায়াত

১৩

ডেমোক্র্যাটের মুসলিম নারী সদস্যের সম্পদ নিয়ে তদন্তের ঘোষণা ট্রাম্পের

১৪

ভোটের দিন ফজর নামাজ পড়ে কেন্দ্রে যাবেন, ফলাফল নিয়ে ঘরে ফিরবেন : কায়কোবাদ

১৫

‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জাতি দায়মুক্ত হতে পারে না’

১৬

সন্ত্রাসী হামলায় ১০ সাংবাদিক আহত

১৭

বিশ্বকাপ বয়কটের দাবি জোরালো হচ্ছে

১৮

সাফে ব্যর্থতার নেপথ্যে কি ইনতিশার!

১৯

নারীদের মর্যাদা নিশ্চিত হবে এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই : জামায়াত আমির

২০
X