

দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই একটি ভয়াবহ অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। যোগ্যতা নয়, টাকা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবই নাকি প্রধান শর্ত। লোভনীয় এসব পদ ঘিরে প্রতিষ্ঠানভেদে ৫০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেনের কথাও উঠে এসেছে নানা সময়ে। ফলে শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এক ধরনের ‘বাণিজ্যিক পণ্যে’। এ বাস্তবতায় সরকার নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তা হলো, ম্যানেজিং কমিটির হাত থেকে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগের ক্ষমতা সরিয়ে এনটিআরসিএর হাতে দেওয়া। বিষয়টি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ নীতিমালা-২০২৬’ খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে এবং অনুমোদন পেলেই কার্যক্রম শুরু হবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, এখন নিয়োগ হবে ৫০ নম্বরের বদলে ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে। লিখিত বা বাছাই পরীক্ষায় ৮০, সনদে ১২ এবং মৌখিকে ৮ নম্বর রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ছয়টি পৃথক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রার্থীর প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও একাডেমিক যোগ্যতা যাচাই করা হবে। এতে স্বাভাবিকভাবেই নিয়োগে একটি কাঠামোবদ্ধ ও তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে, যা দুর্নীতির সম্ভাবনা কমাতে সহায়ক।
নতুন নীতিমালার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, ‘লিখিত, মৌখিক ও সনদ’ এই তিন ক্যাটাগরিতে স্কোর করে জাতীয় মেধাতালিকা প্রকাশ হবে এবং সেখান থেকেই শূন্য পদে পদায়ন হবে। অতীতে নিয়োগ বোর্ড বসার আগেই ফল নির্ধারণ, পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর না পেয়েও নিয়োগ পাওয়া, কিংবা রাজনৈতিক-প্রশাসনিক চাপে স্থগিত নিয়োগ ফের কার্যকর হওয়ার মতো অভিযোগ ছিল। এনটিআরসিএর অধীনে নিয়োগ গেলে এসব সুযোগ কমার কথা। বিশেষ করে ‘সব পরীক্ষার ফল ও চূড়ান্ত সুপারিশ এনটিআরসিএ নির্ধারণ করবে, যা আর পরিবর্তনও করা যাবে না’—এ ঘোষণাটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগে একটি বড় ধরনের আস্থার জায়গা তৈরি হবে।
তবে কেবল কাঠামো বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে— এমন আশা করা বোকামি। নিয়োগের নীতিমালা যত শক্তিশালীই হোক, বাস্তব প্রয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে দুর্নীতির নতুন পথও তৈরি হতে পারে। যেমন— লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, খাতা মূল্যায়ন ও মৌখিক পরীক্ষায় মানদণ্ড ইত্যাদি প্রতিটি ধাপে শক্ত নজরদারি দরকার। মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর কম (৮) রাখা হয়েছে, যা ভালো উদ্যোগ; কিন্তু এই অংশেও যেন পক্ষপাত বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া ডিজিটাল, ট্র্যাকযোগ্য ও সময়সীমাবদ্ধ হওয়া জরুরি, যাতে কোনো ধাপে অনৈতিক চাপ বা ‘ম্যানেজমেন্ট’ ঢোকার জায়গা না থাকে।
দেশে ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদ শূন্য থাকার তথ্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। শূন্যপদের কারণে প্রশাসনিক স্থবিরতা, একাডেমিক শৃঙ্খলা দুর্বল হওয়া এবং শিক্ষার মান নেমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আমরা মনে করি, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে এটি হতে পারে বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি যুগান্তকারী সংস্কার। কিন্তু এ উদ্যোগ যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। শিক্ষক নিয়োগে এনটিআরসিএর মাধ্যমে যেমন বাণিজ্য কমেছে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগেও যদি একই সফলতা আসে, তবে তা দেশের শিক্ষা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত ও মেধাভিত্তিক পথে এগিয়ে নেবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে, স্বচ্ছ নিয়োগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায্য শিক্ষাব্যবস্থার এক অপরিহার্য শর্ত।
মন্তব্য করুন