

যুক্তরাষ্ট্র বছর শুরু করেছে জোরেশোরে একটি নতুন নীতির প্রচার দিয়ে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডনরো ডকট্রিন’। এটি আসলে ১৮২৩ সালের সাম্রাজ্যবাদী মনরো ডকট্রিনের নতুন সংস্করণ। এই বিভ্রান্তিকর নতুন শব্দটি ছড়িয়ে পড়ে মূলত ৩ জানুয়ারির ঘটনার পর, যেদিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় বোমা হামলা চালায় এবং সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহরণ করে। এই ডকট্রিন দাবি করছে, পশ্চিম গোলার্ধে (অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশে) যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া প্রভাব থাকবে। কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল ওই অঞ্চল নয়; বরং বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি প্রকল্প, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চালু থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত সাম্রাজ্যবাদী নীতিরই ধারাবাহিকতা।
শুধু গত এক মাসেই যুক্তরাষ্ট্র তিনটি মহাদেশে থাকা তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অভিযান চালিয়েছে, যা পশ্চিম গোলার্ধের সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ১৯ ডিসেম্বর এবং আবার ১০ জানুয়ারি সিরিয়ায় বোমা হামলা চালায়। তারা দাবি করে, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইসলামিক স্টেটের সদস্যরা, যারা ১৩ ডিসেম্বর দুজন মার্কিন সেনা ও তাদের এক দোভাষীকে হত্যা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে যেসব সেনা সেখানে ছিল, তারা ছিল সিরিয়ার তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল দখল করে রাখা ২ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনার অংশ, যারা ২০১৪ সাল থেকে ওই এলাকার তেল উত্তোলন করে বিক্রি করেছে এবং সেই অর্থ নিজেরাই নিয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প আগে থেকেই বারবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন। তার দাবি ছিল, নাইজেরিয়ায় ‘জিহাদি গোষ্ঠীগুলো’ নাকি দশ হাজার খ্রিষ্টানকে হত্যা করছে। এরপর ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের দিনে তিনি আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ নাইজেরিয়ায় বোমা হামলা চালান। এ হামলাকে তিনি বলেছিলেন খ্রিষ্টানদের ‘বাঁচানোর’ জন্য দেওয়া এক ধরনের ‘ক্রিসমাস উপহার’। এ হামলায় অনেক মানুষ নিহত হয়, যাদের ‘জিহাদি’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এরপর ট্রাম্প আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি ‘খ্রিষ্টানদের হত্যা চলতে থাকে’ তাহলে তিনি নাইজেরিয়ায় আবার হামলা চালাবেন।
নিজের এই হস্তক্ষেপমুখী মনোভাব তিনি এবার এশিয়াতেও টেনে এনেছেন। ইরানে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হওয়ায় ২৮ ডিসেম্বর দেশটিতে সরকারবিরোধী বড় ধরনের বিক্ষোভ এবং সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর ট্রাম্প ইরানিদের বলছেন, ‘প্রতিবাদ চালিয়ে যাও’, আর ঘোষণা দিচ্ছেন—‘সাহায্য আসছে’।
কিছু হিসাবে এই সহিংসতায় প্রাণহানির সংখ্যা দুই হাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে একদিকে যেমন পুলিশ ও নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে অনেক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন; অন্যদিকে দাঙ্গাকারীদের হামলায় নিরাপত্তাকর্মীরাও মারা গেছেন। সহিংস লোকজন গাড়ি ও ভবনেও আগুন দিয়েছে।
ইসরায়েলের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, মোসাদের এজেন্টরা ইরানে কাজ করছে। এটা ইঙ্গিত দেয় বিক্ষোভের সঙ্গে তাদের কোনো না কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে। এই সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর এক পোস্টে। তিনি এক্স (X)-এ লিখেছেন, ‘ইরানিরা এবং তাদের পাশে থাকা মোসাদ এজেন্টদের’ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হুমকি আরও বাড়ান। তিনি তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বাতিল করে দেন। পাশাপাশি ঘোষণা দেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে তাদের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। শুধু তাই নয়, বিক্ষোভকারীদের প্রতি ইরানের আচরণকে অজুহাত বানিয়ে তিনি ‘খুব শক্তিশালী’ সামরিক পদক্ষেপের কথাও বলেন।
দক্ষিণ আমেরিকায় ভেনিজুয়েলায় হামলায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখন ওই দেশটিকে ‘চালাবে’। এটি স্পষ্ট করে দেয়, ওয়াশিংটনের বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী নীতিতে তেলের ভূমিকা কতটা কেন্দ্রে।
এখন ট্রাম্পের নজর পড়েছে গ্রিনল্যান্ডের দিকে। ডেনমার্কের অধীনে থাকা আধা-স্বায়ত্তশাসিত এ অঞ্চলটির তেলের সম্ভাবনা বিপুল আর বহুদিন ধরেই এটি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের জায়গা। ট্রাম্প ডেনমার্ককে বলপ্রয়োগের হুমকি দিয়েছেন এবং বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান চালিয়ে দখল করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইন ইসরায়েলের ভূমি দখল এবং গণহত্যার একজন উচ্ছ্বসিত সমর্থক। সোমবার প্রতিনিধি পরিষদে একটি বিল উত্থাপন করেছেন, যেখানে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত (অ্যানেক্সেশন) করার পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছে।
বিশ্বের তেল নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের এই জেদ আসলে দুই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে নিজের প্রভাব ধরে রাখা। একই সঙ্গে নিশ্চিত করা যে জ্বালানি বাণিজ্যে ডলারই একমাত্র প্রধান মুদ্রা হিসেবে থাকবে। দ্বিতীয়ত, তেল রপ্তানি ও তেলে প্রবেশাধিকার এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে চাপে রাখা যায়। এগুলো নতুন কোনো বিষয় নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী নীতিনির্ধারকদের বড় চিন্তা ছিল, কীভাবে বিশ্বের বিভিন্ন সার্বভৌম দেশের সরকার পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদের তেল সম্পদের ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করা যায়। এই নীতির ভিত্তি সেই সময় থেকেই তৈরি হয়ে গেছে।
তেল দখলের যুদ্ধ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সিআইএ সমর্থিত প্রথম অভ্যুত্থান ঘটে সিরিয়ায়, ১৯৪৯ সালের মার্চে। এতে দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট শুকরি আল কুওয়াতলিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর ক্ষমতায় বসানো হয় কর্নেল হুসনি আল জাইমকে, যিনি পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। ক্ষমতায় এসেই আল জাইম দ্রুত ট্যাপলাইন পরিকল্পনায় অনুমোদন দেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে এমন কিছু আলোচনা শুরু করেন, যেখানে ফিলিস্তিনি জনগণকে ইরাকে বিতাড়িত করার পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে। অভ্যুত্থানের পর ট্যাপলাইন তৈরি করা হয় গোলান মালভূমি হয়ে, যা গিয়ে শেষ হয় লেবাননের সিদোন শহরে। এরপর ইসরায়েল যখন গোলান দখল করে নেয় এবং সেখানে দখলদারিত্ব চালু করে, তখন সৌদি আরব, সিরিয়া, লেবানন ও জর্ডান কার্যত মেনে নেয় যে, পাইপলাইনের প্রায় ৫০ কিলোমিটার অংশ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
১৯৬৯ সালের ৩০ জুনে ফিলিস্তিন মুক্তির জনপ্রিয় ফ্রন্ট পিএফএলপি ট্যাপলাইনে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে প্রায় ৬ হাজার থেকে ৯ হাজার টন তেল টাইবেরিয়াস হ্রদে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সৌদি আরব এবং আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলোর বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। তারপরও ট্যাপলাইন ইসরায়েল-দখলকৃত অঞ্চল দিয়ে তেল সরবরাহ চালিয়ে যায় ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। পরে ট্যাংকারে করে তেল পরিবহন সস্তা হয়ে যাওয়ায় এ পাইপলাইন কার্যত গুরুত্ব হারায়।
২০১৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার তেল ক্ষেত্রগুলোর যে দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটিও একই সাম্রাজ্যবাদী ধারার অংশ। বিশেষ করে এক বছর আগে আসাদ সরকারের পতনে তারা যেভাবে সহায়তা করেছে এবং দামেস্কের নতুন আলকায়দা ঘরানার সরকারকে নিজেদের নির্দেশে চালাতে বাধ্য করেছে, তাতে এ ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুগে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত দ্বিতীয় বড় অভ্যুত্থান ঘটে ১৯৫৩ সালের আগস্টে ইরানে। এতে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের সরকারকে উৎখাত করা হয়। মোসাদ্দেক ইরানের তেল জাতীয়করণ করেছিলেন, যা তখন ব্রিটিশ তেল কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো করে লুটে নিচ্ছিল।
এ অভ্যুত্থানের নাম ছিল ‘অপারেশন আজাক্স’। এটি ছিল সিআইএ এবং ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্সের যৌথ পরিকল্পনা। সিআইএ টাকা দিয়ে কিছু লোক ভাড়া করে শাহের পক্ষে বিক্ষোভ করায়। তারা শত শত মানুষকে বাসে করে তেহরানে আনে, যাতে সাজানো সরকারবিরোধী আন্দোলন তৈরি করা যায় এবং মোসাদ্দেক সমর্থকদের মিছিল বাধাগ্রস্ত করা যায়। এ ঘটনার মূল কারণ ছিল তেল।
আল কুওয়াতলি যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রান্স আরবিয়ান পাইপলাইন বা ট্যাপলাইন নির্মাণের অনুমতি দিতে চাননি। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সৌদি তেল সিরিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, যাতে সুয়েজ খাল দিয়ে ব্যয়বহুল পথে তেল পাঠাতে না হয়। কুওয়াতলি বাধা দেওয়ায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্ষোভ তার ওপর নেমে আসে। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় ফেরানো হয় বহু ঘৃণিত শাহকে, যিনি দ্রুত পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোকে ইরানের তেল লুট করার সুযোগ করে দেন।
ইরানে সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ, গোপন ষড়যন্ত্র থেকে প্রকাশ্য হামলার হুমকি এলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দেশটির ওপর ওয়াশিংটনের একই ধরনের আচরণেরই আরেকটি পুনরাবৃত্তি।
সাম্রাজ্যবাদী অজুহাত: ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ বহুদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর হাতে ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৬ সালে ভেনেজুয়েলা সরকার তেলশিল্প জাতীয়করণ করে। ওই সময়ে অনেক তেল উৎপাদনকারী দেশই একই পথে এগিয়েছিল। এরপর ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের আমলে আরও কিছু জাতীয়করণ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাও ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে এবং ২০১৪ সালে বারাক ওবামার আমলে সেই নিষেধাজ্ঞা নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছে যায়। একই বছর ওবামা সিরিয়ার তেলক্ষেত্রও দখলে নেয়। এরপর প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন, তারপর বাইডেন প্রশাসনের সময় আরও নিষেধাজ্ঞা যোগ হয়। ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র এবং নানামুখী চাপ কখনোই থামেনি।
এই দেশগুলোর সরকার উচ্ছেদ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যেসব চেনা সাম্রাজ্যবাদী অজুহাত দাঁড় করায় সেগুলোও একেবারে পরিচিত। কখনো বলা হয় সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ, যেমন সিরিয়ার ক্ষেত্রে, কিংবা আগে লিবিয়ার ক্ষেত্রেও হয়েছিল। কখনো তোলা হয় মাদক পাচারের অভিযোগ, যেমন ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার ক্ষেত্রে। আবার কখনো বলা হয় গণতন্ত্র দমন করছে, যেমন ইরানের প্রসঙ্গে। এর বাইরে আছে আরও হাস্যকর একটি অজুহাত, গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অভিযোগ। ২০০৩ সাল থেকে ইরাকে হামলা, দখল এবং দীর্ঘ যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযোগই ব্যবহার করেছিল।
গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে ট্রাম্প নতুন আরেকটি যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনে এর কোনো নজির নেই। তিনি বলেছেন, এই অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
মাদুরোকে অপহরণ করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কোনো অপরাধ নয়। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্র একাধিক প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করেছে এবং ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। যেমন ১৯৯০ সালে পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা, যিনি একসময় যুক্তরাষ্ট্রেরই ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। আবার ২০০৪ সালে ফ্রান্সের সহযোগিতায় হাইতির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জাঁ বের্ত্রাঁ আরিস্তিদেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। আরিস্তিদে তখন ফ্রান্সের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিলেন, কারণ ফ্রান্স একসময় দেশটি থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লুটে নিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত অভ্যুত্থান: সরকার পরিবর্তন এবং সিআইএ সমর্থিত অভ্যুত্থানের কথা বলতে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তালিকাটা ডজনের পর ডজন লম্বা। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় এর সংখ্যা অনেক বেশি। আর এসব ঘটনার বড় কারণ ছিল তেল এবং খনিজ সম্পদ, যার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের লোভ বরাবরই প্রবল।
লাতিন আমেরিকার বিখ্যাত সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ এদুয়ার্দো গালেয়ানো তার ১৯৭০ সালের বিখ্যাত বই ওপেন ভেইন্স অব লাতিন আমেরিকায় ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত কয়েকটি অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্রাজিলের পারাওপেবা উপত্যকার নিচে থাকা লোহার বিপুল সম্পদ দুজন প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। জানিও কুয়াদ্রোস এবং জোয়াও গুলার্তের পতনের পর ১৯৬৪ সালে মার্শাল কাস্তেলো ব্রাঙ্কো নিজেকে একনায়ক বানিয়ে ওই সম্পদ আমেরিকান হান্না মাইনিং কোম্পানির হাতে তুলে দেন। পেরুতে ১৯৬৮ সালে প্রেসিডেন্ট ফের্নান্দো বেলাউন্দে তেরি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিলেন, সেই চুক্তির ১১ নম্বর পৃষ্ঠা রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যায়। এরপর জেনারেল হুয়ান ভেলাস্কো আলভারাদো বেলাউন্দেকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন এবং কোম্পানিটির তেলকূপ ও শোধনাগার জাতীয়করণ করেন।
গালেয়ানো আরও লিখেছেন, আর্জেন্টিনায় প্রায়ই অভ্যুত্থান দেখা দেয় তেল ছাড় দেওয়ার প্রস্তাবের আগে বা পরে। চিলির ক্ষেত্রেও তামা ছিল গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সালভাদোর আয়েন্দের বাম জোট নির্বাচনে জেতার আগে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে চিলিকে যে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, সেটির পেছনে তামার ভূমিকা কম ছিল না।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৬৪ সালে চে গুয়েভারা তাকে হাভানায় দেখিয়েছিলেন যে বাতিস্তার কিউবা শুধু চিনি উৎপাদনের দেশ নয়, সেখানে নিকেল ও ম্যাঙ্গানিজের বড় মজুতও আছে। চে মনে করতেন, বিপ্লবের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্ষোভের বড় কারণ ছিল এই খনিজ সম্পদ। পরে যখন কিউবার নিকেল জাতীয়করণ করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের নিকেল মজুত দুই-তৃতীয়াংশ কমে যায়। ওই সময় প্রেসিডেন্ট জনসন হুমকি দিয়েছিলেন, ফ্রান্স যদি কিউবা থেকে নিকেল কেনে তাহলে ফরাসি ধাতু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।
গালেয়ানোর ভাষায়, খনিজ সম্পদই ছিল চেড্ডি জাগানের সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতনের পেছনেও বড় কারণ। ১৯৬৪ সালের শেষ দিকে তখনকার ব্রিটিশ গায়ানায় জাগান আবারও ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন। দেশটি আজ গায়ানা নামে পরিচিত। এটি বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বক্সাইট উৎপাদনকারী দেশ এবং লাতিন আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম ম্যাঙ্গানিজ উৎপাদনকারী দেশ। জাগানকে হারাতে সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। আর্নল্ড জান্ডার নামে এক শ্রমিক নেতা পরে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে, তার ইউনিয়ন সিআইএ ঘনিষ্ঠ ফাউন্ডেশনগুলো থেকে বিপুল ডলার পেয়েছিল। আর সেই অর্থ দিয়েই ধর্মঘটকে উসকানি ও অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে জাগানকে ক্ষমতায় যেতে না দেওয়া যায়।
গত এক মাসে যা ঘটেছে তার কোনোটাই আসলে নতুন নয়। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায় তাহলে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে তেলকূপে হামলা করতে পারে। এতে বিশ্ব তেল বাজার বড় ধরনের অস্থির হয়ে উঠবে। ইরান এরই মধ্যে হুমকি দিয়েছে, তারা ওই অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে আঘাত হানতে পারে। এ ঘাঁটিগুলো ছড়িয়ে আছে আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে এবং জর্ডানেও।
যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে লিবিয়ার তেল নিয়ন্ত্রণে নিতে এগোচ্ছে। ২০১১ সালে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে মিলে তারা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে ছিল। একইভাবে তারা সিরিয়ার তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এখন নজর দিয়েছে ভেনেজুয়েলার দিকে। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড ও নাইজেরিয়াকেও তারা লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
বলা যায়, ইরান যদি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেলকূপগুলোতে হামলা চালিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বিপর্যস্ত করে তোলে, সেক্ষেত্রে রাশিয়ার তেল ছাড়া বাকি বিশ্বের তেল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এটি এক ধরনের বিকল্প পরিকল্পনা। এতে যুক্তরাষ্ট্র চীনের অর্থনীতিকে আরও শক্তভাবে চাপের মধ্যে ফেলতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে সহজেই চীনের জন্য অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে সক্ষম হবে। সম্ভবত এটাই ডনরো ডকট্রিনের মূল লক্ষ্য। এটি শুধু পশ্চিম গোলার্ধকে ঘিরে নয়; বরং পুরো বিশ্বকে লক্ষ্য করে সাজানো একটি প্রকল্প। সামনে কয়েকদিন এবং কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই বোঝা যাবে, এই পরিকল্পনা ঠিক কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে যাচ্ছে।
লেখক: নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বহু বই, একাডেমিক ও সাংবাদিকতাবিষয়ক প্রবন্ধের লেখক। তার বই এবং লেখা এক ডজনের বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন আবিদ আজাদ
মন্তব্য করুন