

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গঠন ও উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান বহুমাত্রিক। স্বাধীনতা-উত্তর এক সংকটময় সময়ে তিনি একদিকে যেমন দেশে সফলভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছেন, অন্যদিকে একটি আত্মনির্ভরশীল, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ার ভিত্তি রচনা করেছেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে যখন বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও শিল্প খাত বিপর্যস্ত এবং কারিগরিভাবে সক্ষম জনশক্তির চরম ঘাটতি—তখন তিনি বাস্তববাদী উন্নয়ন দর্শনের মাধ্যমে অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরবর্তীকালে দেশের অগ্রগতির পথকে সুদৃঢ় করেছে। বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে তিনি যে বাস্তবধর্মী উন্নয়ন দর্শন গ্রহণ করেছিলেন, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, প্রকৌশল খাত এবং প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার সম্প্রসারণ।
স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দক্ষ মানবসম্পদের অভাব। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন—দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তিনি আরও বিশ্বাস করতেন, শুধু সাধারণ শিক্ষা নয়, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষাই পারে একটি দরিদ্র দেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে। সে কারণেই তার শাসনামলে কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম জোরদার করা এবং প্রকৌশল শিক্ষার পরিসর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে দেশীয় শিল্প ও অবকাঠামো খাতে দক্ষ জনবল তৈরি হয়। তার গৃহীত নীতিমালার ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি সুসংহত হয়।
প্রযুক্তি শিক্ষার পাশাপাশি প্রকৌশল খাতেও রাষ্ট্রপতি জিয়ার দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নকে তিনি জাতীয় অগ্রাধিকারে স্থান দেন। তার সময়েই গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক বিস্তারের উদ্যোগ জোরদার হয়, যা পরবর্তীকালে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তার নেতৃত্বের ক্যারিশমা ছিল এই যে তিনি প্রকৌশলীদের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে প্রকৌশল সেক্টরের কাজে দেশীয় সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখেছিলেন।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শিল্পায়ন ও অগ্রগতির জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য। তিনি বিদ্যুৎ খাতকে শিল্পায়ন ও জাতীয় উন্নয়নের মেরুদণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার শাসনামলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নীতিগত সংস্কার, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার সময়ে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডকে কার্যকরভাবে পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে। তার আমলে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়নের ধারণা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও সমবায়ভিত্তিক পল্লীবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। এ উদ্যোগ কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করে।
টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রাথমিক বিকাশেও তার অবদান অনস্বীকার্য। যদিও সে সময় প্রযুক্তি আজকের মতো অগ্রসর ছিল না, তবুও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। তার সময়ে বাংলাদেশ টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন বোর্ডের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয় এবং জেলা ও উপজেলায় টেলিফোন নেটওয়ার্ক বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা জোরদার হয় এবং আধুনিক টেলিকম প্রযুক্তি গ্রহণের পথ প্রশস্ত হয়।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন ভাবনা। তিনি সেচ, সার, উন্নত কৃষিযন্ত্র এবং কৃষি প্রকৌশলের ব্যবহারে জোর দেন। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়ে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করে। প্রযুক্তিকে শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত করার এ দর্শন ছিল তার উন্নয়ন ভাবনার মূল শক্তি।
আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রকৌশল ও প্রযুক্তিকে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি বরং জাতীয় আত্মমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। দেশীয় প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ ও শিক্ষাবিদদের তিনি রাষ্ট্র গঠনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ দৃষ্টিভঙ্গি আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক, যখন বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। আজকের বাংলাদেশ যখন তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন দিগন্তে পা রাখছে, তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তার দেখানো পথ—দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠন—এখনো আমাদের উন্নয়নচিন্তার প্রেরণার উৎস।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সামরিক অফিসার থেকে পরিবর্তিত শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রদর্শনের প্রবক্তা। বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, প্রকৌশল খাত এবং প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষায় তার অবদান আজও বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত হিসেবে বিবেচিত হয়। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের যে স্বপ্ন এ দেশের মানুষ দেখেন, তার প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপনে জিয়ার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
লেখক: অধ্যাপক, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ ও ভাইস চ্যান্সেলর, রুয়েট
মন্তব্য করুন