

শিবনারায়ণ রায় প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক, সমালোচক, মানবতাবাদী দার্শনিক, ইতিহাসবিদ ও সম্পাদক। তিনি ১৯২১ সালের ২০ জানুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃনিবাস বরিশাল জেলার রায়েরকাঠি গ্রাম। বাবা উপেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ শাস্ত্রী নাট্যকার, লেখক, শিক্ষাবিদ।
শিবনারায়ণ রায় প্রধানত ইংরেজি এবং দর্শন অধ্যয়ন করেন; তবে ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব এবং শিল্পকলায়ও তার অবদান রয়েছে। কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৩-৮১ সাল পর্যন্ত মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতবিদ্যা বিভাগের প্রধান ছিলেন। এ ছাড়া অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, শিকাগো ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সমেত ইউরোপ, আমেরিকা এবং জাপানের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। জীবনের প্রথম পর্বে তিনি ছিলেন কট্টর মার্ক্সবাদী। পরবর্তী সময়ে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সান্নিধ্যে এসে তার আদর্শে প্রভাবিত হন। মানবেন্দ্রনাথ রায় সুপরিচিত ছিলেন এমএন রায় নামে। শিবনারায়ণ এমএন রায়ের র্যাডিকেল হিউম্যানিজম দর্শনের প্রধান প্রবক্তা ও অনুসারী। এমএন রায় একসময় লেনিনের উপদেষ্টা এবং দ্বিতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সদস্য ছিলেন। এ ছাড়া রাশিয়ার বাইরে প্রথম কমিউনিস্ট দল করেন (মেক্সিকোতে); ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিও প্রতিষ্ঠা করেন তিনি, কিন্তু মার্ক্সীয় রক্তক্ষয়ী ও মানবতাবিরোধী আদর্শে বিশ্বাস রাখতে পারেননি। তাই তিনি র্যাডিকেল হিউম্যানিজমের দর্শন প্রচার করেন। হিউম্যানিজমের বাংলা প্রতিশব্দ ‘মানববাদ’ করা গেলেও ‘র্যাডিকেল’-এর প্রতিশব্দ বাংলা ভাষায় নেই। তাই ‘র্যাডিকেল হিউম্যানিস্ট’-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তারা হচ্ছেন সাধারণ হিউম্যানিস্টদের থেকে কিছু বেশি লিবারেল, অথচ রেভল্যুশনারি হিউম্যানিস্টদের থেকে কিছু কম রেভল্যুশনারি। তারা বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে পাশ্চাত্যের ডেভিড হিউম, জন স্টুয়ার্ট মিল, বার্ট্রান্ড রাসেল প্রমুখ চিন্তাবিদের এ ধারার চিন্তা প্রকাশ করেন। শিবনারায়ণ রায় এমএন রায়ের মতো সাম্যবাদী সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে সহিংস বিপ্লব সমর্থন করতে পারেননি; বরং গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজ পরিবর্তন এবং মানবতার বিকাশ ঘটানোর পক্ষপাতী ছিলেন। শিবনারায়ণ নানা বিষয়ে ৫০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তার চিন্তাভাবনায় তিনটি প্রধান স্তম্ভ লক্ষ করা যায়। রেনেসাঁস, মানবতন্ত্র ও নাস্তিক্য। সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পসাহিত্য বিষয়ে তার গভীর অধ্যয়ন ও স্বাতন্ত্র্যধর্মী চিন্তা, যা ফুটে উঠেছে তার বিভিন্ন গ্রন্থে, যেমন—‘সাহিত্যচিন্তা’, ‘মৌমাছি তন্ত্র’, ‘কবির নির্বাসন ও অন্যান্য ভাবনা’, ‘গণতন্ত্র সংস্কৃতি ও অবক্ষয়’, ‘রবীন্দ্রনাথ শেকসপিয়র ও নক্ষত্র-সংকেত’, ‘স্রোতের বিরুদ্ধে’, ‘রেনেসাঁস’, ‘স্বদেশ স্বকাল স্বজন’ অন্যতম। সম্পাদক হিসেবেও তিনি খ্যাতিমান। ১৯৫২ সালে উত্তরসূরি এবং পরে জিজ্ঞাসা নামে একটি মননশীল ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এমএন রায়ের র্যাডিকেল হিউম্যানিস্ট পত্রিকাও তিনি কিছুকাল সম্পাদনা করেন। শিবনারায়ণ রায় সমালোচনামূলক এবং বিশ্লেষণাত্মক রচনাশৈলীর জন্য বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন এবং এ মেধা দিয়ে তিনি বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে একটি নতুন মাত্রা সংযোজন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের পক্ষে মতামত গড়ে তুলতে লেখালেখি করেন। শিবনারায়ণ রায় ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মারা যান।
মন্তব্য করুন