

বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে বিদেশি প্রভাব পুরোনো চর্চিত বিষয়। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে সন্দেহ-সংশয় রয়েছে। তবে, সমাজের একটি শ্রেণি সবসময় আন্তর্জাতিক শক্তির ওপর ভরসা রাখতে ভালোবাসে। রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনের সময় এর মাত্রা বাড়ে। অতীতে দাতা গোষ্ঠী, উন্নয়ন সহযোগী, পর্যবেক্ষক নানা নামে বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সংকটে-সম্ভাবনায় দৌড়ঝাঁপ করেছে এ দেশে। ভোটাধিকার শুধু দেশের জনগণের। কিন্তু, নির্বাচনে নাক গলানোর অধিকার যেন সবার। শুধু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর বেলায় এমন হচ্ছে, তা নয়। উন্নত দেশগুলোর নির্বাচনেও একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে, বাংলাদেশ তো গরিবের ভাবি। সঙ্গসুখে সবারই কম-বেশি স্বার্থ আছে। ভূ-রাজনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মোড়কে লোভ ঢেকে অনেকেই আসে উপকার করতে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। বহুল আলোচিত ও কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে পরামর্শের পসরা সাজিয়ে বসেছে দেশি-বিদেশি নানান সংস্থা। গবেষণা ও জরিপ সংস্থার পাশাপাশি পিছিয়ে নেই গণমাধ্যমও।
গত ২২ জানুয়ারি মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উঠে এসেছে নতুন সম্পর্কের ইঙ্গিত। একাধিকবার নিষিদ্ধ হওয়া দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নতুন করে সখ্য গড়ে তুলতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ছাত্ররাজনীতিতে দলটির প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন এখন জামায়াতকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে। মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, আগামী নির্বাচনে জামায়াত বড় ধরনের সাফল্য পেতে পারে। এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে যুক্তরাষ্ট্র দলটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা ‘বন্ধুত্ব’ স্থাপনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কোনো কট্টর অবস্থান নিলে, ওয়াশিংটন পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তৈরি পোশাক খাতে উচ্চ শুল্ক আরোপসহ কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছে।
গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ ‘ইসলামিক ধারায়’ মোড় নিয়েছে। অডিও রেকর্ড অনুযায়ী ওই কূটনীতিক ধারণা প্রকাশ করেন যে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে যাচ্ছে। ওই মার্কিন কূটনীতিক জামায়াত কর্তৃক শরিয়াহ আইন চাপিয়ে দেওয়ার শঙ্কাকে নাকচ করে দেন। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই ওয়াশিংটন পোস্টকে এক বিবৃতিতে বলেন, ডিসেম্বরের সে বৈঠকটি ছিল মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে স্থানীয় সাংবাদিকদের একটি নিয়মিত ও ঘরোয়া আলোচনা। তিনি জানান, সেখানে অনেক রাজনৈতিক দল নিয়েই আলোচনা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিশেষ দলের পক্ষ নেয় না। বাংলাদেশের জনগণ যাদের নির্বাচিত করবে, তাদের সঙ্গেই কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। জামায়াতের মার্কিন মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমান এক বিবৃতিতে জানান, একটি ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকে দেওয়া মন্তব্যের বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে চান না।
আসলে নিজেদের পক্ষে বিষয়টি ইতিবাচক ভাবছে বলে কোনো মন্তব্য করেনি জামায়াত। অন্যদিকে, নেতিবাচক হওয়ায় একই ধরনের পরিবেশে দেওয়া ভারতীয় কূটনীতিকের মন্তব্যের জন্য খেপেছে তারা। দেশটির সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। গত শুক্রবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শ্রিংলা বলেন, ‘বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে জামায়াত ক্ষমতায় আসতে পারবে না। কারচুপি হলে তারা (জামায়াত) ক্ষমতায় আসতে পারে। দলটির ভোটের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ, তাও আবার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সহায়তায়।’ গত রোববার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একটি সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং একটি বৈধ ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তার মন্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তথ্যবিকৃত ও রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। একটি দেশের জনগণ কাকে ভোট দেবে বা দেবে না—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার শুধু সে দেশের জনগণেরই রয়েছে। কোনো বিদেশি রাজনীতিবিদের এ বিষয়ে মন্তব্য করার অধিকার নেই।’
এদিকে, মার্কিন দূতাবাসে দেওয়া জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহেরের একটি বক্তব্য কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। গত রোববার ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ডা. আব্দুল্লাহ তাহের সম্প্রতি আমেরিকান দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপচারিতায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ভেতরে ‘এক্সট্রিমিজম’ আছে বলে উল্লেখ করেন, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইসলাম-বহির্ভূত ও ভ্রান্ত ধারণাপ্রসূত তথাকথিত উগ্রপন্থাকে দলটি কখনোই সমর্থন করেনি। তিনি বাংলাদেশে ‘এক্সট্রিমিজম’-এর অস্তিত্ব স্বীকার করে পশ্চিমা ‘ওয়ার অন টেরর’ পরিভাষা ব্যবহার করেছেন, যা দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল’। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও ব্যাখ্যা দাবি করা হয় বিবৃতিতে। এ ধরনের বক্তব্য-বিবৃতি রাজনীতিতে হরহামেশাই দেখা যায়। নির্বাচনের সময় বেশি দেখা গেলেও স্বাস্থ্যকর মনে করা হয়। যতক্ষণ না সংশয়-সন্দেহ সংঘাত-সংঘর্ষে রূপ নেয়। পাল্টাপাল্টি বাদানুবাদের মধ্য দিয়ে জনগণ যা বোঝার বুঝে নেয়।
আদর্শ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে কম-বেশি সুসম্পর্ক সব রাজনৈতিক সরকারই বজায় রাখে। গত ফ্যাসিস্ট আমলে তা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। গণঅভ্যুত্থানে দেশ থেকে পালিয়ে শেখ হাসিনা আত্মীয়স্বজন নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এটি কেন্দ্র করে দুদেশের সম্পর্কে সৃষ্টি হয় টানাপড়েন। ফলে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগটি ঠিক সম্পর্কে গড়ায়নি। দুদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি অস্থির সময় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক সরকার ছাড়া হয়তো এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে না।
আগামী নির্বাচনে বিএনপি জোট সরকার গঠন করবে বলে বেশিরভাগ মানুষ মনে করে। তবে, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলও ক্ষমতার আশা করে। দুটি জোটের নেতাকর্মীদের মুখেই ভারতবিরোধিতার স্লোগান শোভা পায়। একে অপরের বিরুদ্ধে ভারতীয় দালাল ট্যাগ দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। তবে, দুদলের শীর্ষ নেতারাই গোপনে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেন। গত রোববার জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান দুর্নীতি প্রতিরোধে চৌকিদারের ভূমিকায় থাকবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ বক্তব্যের সঙ্গে অনেকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্তব্যের মিল খুঁজে পাবেন। কেননা, নির্বাচনী প্রচারণায় মোদিও এ কথা বলেছিলেন। অনেক বছর আগে, ‘আদভানি আর নিজামী/দুই গেলাসে এক পানি’ স্লোগান শোনা যেত। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভারতের কাছে লিখিত দিয়ে দেশে ফিরেছেন। এ ধরনের প্রচারণা চালানো হয় জামায়াত সমর্থকদের অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে। রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও বিএনপি সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভালো থাকে। অতীতে চারদলীয় জোট সরকারের সময়ও তাই দেখা গেছে। এরপরও ভারতকে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের লুকোচুরি খেলা চলতে থাকবে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে মার্কিন যোগাযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে নতুন করে দূরত্ব তৈরি করতে পারে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত, রাশিয়ার তেল ক্রয় ও বাণিজ্য শুল্ক নিয়ে এমনিতেই দুই দেশে র সম্পর্ক এখন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে’। কুগেলম্যান বলেন, ‘বহু বছর ধরে বাংলাদেশে ভারতের সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো জামায়াত।’ তার মতে, ভারত এই দলটিকে পাকিস্তানের মিত্র এবং তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। তবে মনিকা শাই তার বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রভাব ভারত-মার্কিন সম্পর্কে পড়বে না। ঢাকা ও নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নিজস্ব গুরুত্বের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।
অনেক সময় দুর্বল ও দরিদ্র রাষ্ট্রের রাজনীতির ভূত-বিষ্যৎ নির্ণয়ে ভূমিকা রাখে প্রভাবশালী দেশগুলো। তবে, নিজ দেশের আপামর জনসাধারণ পক্ষে না থাকলে কোনো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রই কাজে লাগে না। নিকট অতীতেও তা প্রমাণিত। ২০২৪-এর অভ্যুত্থান চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে গেছে। কাজেই বিদেশি ঠাকুর ছেড়ে নিজ দেশের কুকুর ধরতে হবে। নির্বাচন সামনে রেখে অনেক কথাই বলবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের বণিকরা। তবে, জনগণের ভালোবাসা এবং স্থানীয় দায়িত্বশীলদের আস্থা ধরে রাখাই দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক: হেড অব নিউজ, আরটিভি
মন্তব্য করুন