

২৮ জানুয়ারি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ডাটা প্রাইভেসি ডে বা তথ্য সুরক্ষা দিবস। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং সুরক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক এ দিবসটি পালন করা হয়। ১৯৮১ সালে ইউরোপে প্রথম ডাটা সুরক্ষা-সংক্রান্ত কনভেনশন ১০৮ স্বাক্ষরের স্মরণে পালিত হয় এবং ডিজিটাল যুগে তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে।
বিশ্বব্যাপী তথ্য সুরক্ষা দিবসের মূল লক্ষ্য ও তাৎপর্য হলো ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তার গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। ইন্টারনেটে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা জানার অধিকার সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের শিক্ষিত করা। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন এবং ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনে উৎসাহিত করা।
বিশ্ব তথ্য সুরক্ষা দিবস প্রতি বছর ২৮ জানুয়ারি পালিত হয়। ১৯৮১ সালের ২৮ জানুয়ারি ইউরোপের কাউন্সিল কনভেনশন ১০৮ স্বাক্ষর করেছিল, যা তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই ২০০৭ সাল থেকে এ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্থা এই দিনে প্রচারাভিযান, সম্মেলন ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করে থাকে। এর মূল লক্ষ্য ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং অনলাইনে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা। ডিজিটাল বিশ্বে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং উন্নত গোপনীয়তা অনুশীলন গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৩ (খ) নম্বর অনুচ্ছেদে প্রাইভেসি রাইটস বা ব্যক্তির তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তা মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃত। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অনুমতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণা (অনুচ্ছেদ ১২) নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সনদ (অনুচ্ছেদ ১৭), জাতিসংঘের কনভেনশন অন মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স (অনুচ্ছেদ ১৪) এবং শিশু অধিকার সনদে (অনুচ্ছেদ ১৬) প্রাইভেসিকে অধিকার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের কোনো আইনে নাগরিকের তথ্য সুরক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট এবং পূর্ণাঙ্গ কোনো দিকনির্দেশনাই নেই। গোপনীয়তার অধিকার মৌলিক অধিকার। কিন্তু তা পদে পদে হরণ করা হচ্ছে।
কোনো ব্যক্তি তথ্য দেওয়ার কারণে হয়রানির শিকার হতে পারেন, সেগুলোই প্রাইভেসি হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। সিকিউরিটি বলতে যেসব উপায়ে আমরা আমাদের নিজেদের ও ব্যক্তিগত তথ্যকে সুরক্ষা করি তা বোঝায়। আর প্রাইভেসি বলতে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ বোঝায়। ডিজিটাল যুগে বিভিন্ন জায়গায় ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হয়। কিন্তু সেটি সুরক্ষিত থাকবে কি না, তা নিশ্চিত করে জানানো হয় না। যে কোনো জায়গায় দেওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, ফোন নম্বর, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভাড়াটিয়া তথ্য ফরমের নামে যাবতীয় তথ্য কিংবা স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্যগুলো ব্যক্তির একান্তই গোপন তথ্য হিসেবে বিবেচিত। সেটির রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে নাগরিকের কাছে কোনো তথ্য না থাকায় ব্যক্তি হুমকির মুখে পড়তে পারে। প্রাইভেসি নিয়ে আমাদের তেমন কোনো আইন নেই। প্রাইভেসির অধিকার রক্ষার দায়িত্ব ও আইনি কাঠামোর সহায়তা দেওয়ার কথা রাষ্ট্রের। আমাদের এখানে প্রায়ই জনস্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয়। অন্যদিকে ফেসবুকের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে সক্রিয় হ্যাকাররা জেনে যাচ্ছে পাসওয়ার্ড। এর মধ্যে ব্যক্তির গোপনীয়তা বলে আর কিছু থাকছে কি না। তাই নতুন প্রযুক্তির কারণে ব্যক্তিগত তথ্য গোপনীয়তা জরুরি।
ব্যক্তির অজান্তে তার কোনো গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে গেলে সেটা শুধু বিব্রতকর নয়, তার অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইনে শেয়ার করা ছবির মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অপরাধীরা এই ছবি থেকে ব্যক্তিগত তথ্য যেমন নাম, বাসস্থান বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এ তথ্যগুলো পরবর্তী সময়ে পরিচয় জালিয়াতি বা অন্যান্য অবৈধ উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এআই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে তথ্যের অপব্যবহার, ডিপফেক ভিডিও এবং পরিচয় জালিয়াতি মানুষের গোপনীয়তা ও মানসম্মানকে হুমকির মুখে ফেলছে।
অপরাধ ও সাইবার নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেকে সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া থেকে রক্ষার জন্য তার ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বরং এর জন্য সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে।
প্রকাশ ঘোষ বিধান, পাইকগাছা, খুলনা
মন্তব্য করুন