

সূর্য অস্ত গেলে ছায়াও থাকে না—এটি বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। এ বাস্তবতাকে ধারণ করে একটি বাক্য আছে, ‘সূর্য অস্ত গেলে ছায়াটুকু মুছে যায়’। এটি মূলত কার বয়ান, তা জানি না। মাস কয়েক আগে মিজানুর রহমান জাকির চৌধুরী নামে স্বল্প পরিচিত এক লেখকের কলামে পড়েছি। নান্দনিক এ বয়ান যারই হোক, বাক্যটি আমার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে। এটি শাব্দিক অর্থে সন্দেহাতীতভাবে বাস্তবতা। কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অন্যরকমও ভাবা যায় হয়তো। চাইলে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বলা চলে, ‘রাজনীতির সূর্য অস্ত গেলেও রয়ে যায় ছায়া’! উদাহরণ—বেগম খালেদা জিয়া। তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রয়ে গেছে তার প্রগাঢ় ছায়া। তাও আবার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের মতো জটিল সময়ে। যার প্রধান বেনিফিশারি দেশ-জাতি, বিএনপি ও তারেক রহমান। ধরে নেওয়া যায়, খালেদা জিয়া দেশবাসীর জন্য এক প্রকার রহমত হিসেবেই এসেছিলেন। তিনি দীর্ঘ সময়ে তিলে তিলে সৃষ্টি হয়েছেন। অন্তিম যাত্রার পরও তিনি তার প্রগাঢ় ছায়া রেখে গেছেন। যে আলামত হাসপাতালে তার সংকটাপন্ন অবস্থার খবরেই প্রকাশ পেয়েছে। আর স্পষ্ট হয়েছে তার জানাজার বিশালত্বে।
জানা কথা, ইসলাম ধর্মের কেউ মৃত্যুবরণ করলে জানাজা হয়। আর এ জানাজা বড় কি ছোট অথবা সুবিশাল—ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তা মোটেই বিবেচ্য বিষয় নয়। কিন্তু আবেগ ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর গুরুত্ব অনেক। যে প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ অবস্থানে আছেন খালেদা জিয়া। ৩১ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার শেষ বিদায় পর্বে জানাজায় কোটি মানুষ সরাসরি অংশ নিয়েছে। তার জানাজার ব্যাপ্তিতে জনসমুদ্র শব্দটিও যেন সে বিশালত্ব ধারণ করার মতো নয়। জানাজায় শোকার্ত মানুষের ঢল আবার প্রমাণ করেছে, খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, এত বিশাল জানাজা এর আগে কেউ দেখেনি। আর এ জানাজা শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্যতম মাইলফলক। ইতিহাসের একটা বিরল সম্মান নিয়ে খালেদা জিয়া অন্তিম পথের যাত্রী হয়েছেন। সূর্যও অস্ত যায়, বেগম জিয়াও অস্ত গেছেন। সূর্য অস্ত গেলে ছায়াও মুছে যায়, কিন্তু রয়ে গেছে খালেদা জিয়ার ছায়া।
জানাজার বিশালত্বে যে কেউ বুঝবেন, ২৫-এর ৩০ ডিসেম্বর অনন্ত যাত্রার পথিক খালেদা জিয়া এখন আর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন অথবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নন, এখন তিনি সমগ্র বাংলাদেশের। আবার তার এ আসন হাওয়া থেকে পাওয়া নয়। এর ভিত্তি হচ্ছে একাগ্রতা ও বিচক্ষণ আপসহীনতা। যে কারণে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে স্বর্গ থেকে পতনের মতো স্বামী হারিয়ে ৪১ বছরের রাজনীতির কঠিন ও পঙ্কিল পথ চলতে পেরেছেন বেগম জিয়া। আর প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর এলোমেলো বিএনপিকে ধরে রেখেছেন, বিকশিত করেছেন। বিএনপিকে তিনবার ক্ষমতাসীন করেছেন। একই সঙ্গে শিশুকালে এতিম হওয়া তারেক রহমানকে বড় করে তুলেছেন। রাজনীতির প্রধান নেতা হওয়ার জন্য যোগ্য করেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর এখন তারেক রহমান শুধু বিএনপি প্রধান হিসেবে বিবেচিত নন, আগামী সরকারপ্রধান হিসেবেও দেশবাসীর মানসপটে আসনটি বেশ পাকাপোক্ত। আন্তর্জাতিক মহলও এ বাস্তবতা ধারণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি খালেদা জিয়ার একটি হিমালয়সম অর্জন। এর চেয়েও বিশাল অর্জন আছে। আর এখানেই খালেদা জিয়া অতুলনীয়। এখানে তিনি কারও সঙ্গে তুল্য নন, তিনি অনন্য। তা হচ্ছে তিনি তার প্রগাঢ় ছায়া রেখে গেছেন। এ ক্ষেত্রেই তিনি অতুলনীয়। নিখাদ দেশপ্রেম ও ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা, যা তাকে আপসহীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রধানত এ দুটি ইনবিল্ড বৈশিষ্ট্যের কারণেই তিনি দেশের দুই স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, স্বৈরাচারের পতন শুধু ব্যক্তির অবসান নয়, এ হচ্ছে দেশ রাহুমুক্ত হওয়া। এ অসাধ্য সাধন খালেদা জিয়া দুবার করেছেন। আর দুবারই তার দেশপ্রেম ও আপসহীন অবস্থানই ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল একক। সেই কঠিন সময়ে অনিশ্চিত যাত্রায় তিনি যেভাবে মাঠে ছিলেন, তা বিরল ঘটনা হিসেবেই ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর অনেকেই মনে করেন, সে সময় তিনি শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস না করলে এরশাদের পতন হয়ে নব্বইয়ের অনেক আগেই দেশ হয়তো রাহুমুক্ত হতে পারত।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন খালেদা জিয়া। কিন্তু তার এ অর্জন মোটেই সহজ ছিল না, দীর্ঘদিনে তিলে তিলে অর্জিত হয়েছে। যার বড় অংশই অর্জিত হয়েছে স্বৈরাচারের পতন ঘটানোর কঠিন সাফল্যের মাধ্যমে। যার সূচনা এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে। আর ফ্যাসিস্টকে বিদায় করার ক্ষেত্রেও প্রধান ভিত্তি ছিলেন খালেদা জিয়া। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃঢ়তা, আপসহীনতা ও গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে অটল থাকার প্রতীক খালেদা জিয়া। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিচল অবস্থান, শালীন কথাবার্তা, মার্জিত আচরণ এবং দেশের জন্য তিনি পরিণত হয়েছেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনবার, নাকি তিনি তেরোবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সেটি মোটেই মুখ্য বিষয় নয়। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, খালেদা জিয়ার দৃঢ় অবস্থানই ছিল নব্বই এবং চব্বিশের সফলতার ভিত্তি। অভিজ্ঞজনরা মনে করেন, তার আপসহীন লড়াই ছাড়া নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সফল হতো না। যদিও এখন অনেকেই জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের দাবিদার। কিন্তু প্রকৃত দাবিদার হচ্ছে জনগণ। আর এ জনগণকে লড়াই করার অফুরান সাহস জুগিয়েছে বেগম জিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। তিনি বিন্দুমাত্র আপস করলে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন চব্বিশে তো দূরের কথা, বিয়াল্লিশেও হতো কি না সন্দেহ! হয়তো জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের জন্য শেখ হাসিনার মৃত্যু পর্যন্ত জাতিকে অপেক্ষা করতে হতো।
এদিকে অনেকেই জানেন, ২০০৮ সাল থেকে নানাভাবে খালেদা জিয়ার ওপর অমানবিক নিপীড়ন ও নির্যাতন চলেছে। পরে যা রূপান্তরিত হয়েছে চরম নিষ্ঠুরতায়, যা তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপরও খালেদা জিয়া অটল দৃঢ়তায় দেশের সাধারণ মানুষকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে। তিনি শুধু রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সংগ্রামই করেননি, দাঁড়িয়ে ছিলেন নিপীড়ন, নির্যাতন, অপমান ও অপদস্থের বিরুদ্ধে। স্বামী হারানোর শোক আর সন্তানের শূন্যতায় বুকে পাথর চেপে লড়াই করে গেছেন। দীর্ঘ ছিল সেই লড়াই, ছিল যন্ত্রণার। তিনি রণে ভঙ্গ দেননি। হাল ছাড়েননি। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন রাজনীতিতে দৃঢ়তা ও ঐক্যের প্রতিশব্দ। এরপরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বেগম জিয়ার ছায়ার কাছে আমাদের বারবার ফিরে যেতে হবে।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নিয়ে আলোচনার দরজা খোলা রাখা প্রয়োজন। আর তা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকেও ধারণ করা প্রয়োজন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বলয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার এক বিশাল গুরুদায়িত্ব এখন বিএনপি, তথা তারেক রহমানের ওপর বর্তায়। বোধগম্য কারণেই তারেক রহমানকেই এ দায়িত্ব নিতে হবে।
এদিকে দায়িত্ব আছে জাতিরও। নতুন বছরের প্রথম দিন খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতের পর সাংবাদিকেদের প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমরা সত্যিকার অর্থে দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চাই।’ কিন্তু পর্যবেক্ষক মহলের সতর্কবার্তা হচ্ছে, এটি যেন দলীয় চশমা দিয়ে দেখা না হয়। বেগম জিয়ার শোককে জাতি বিনির্মাণের শক্তিতে রূপান্তরের জন্য আন্তরিকতা এবং উদারতা প্রয়োজন। এদিকে এখন সময়ের দাবি, দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া। আর এ পর্যন্ত যতটুকু হয়েছে তাকে সূচনাপর্ব হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। তাকে কৃতজ্ঞ জাতির আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে। আপাতত যা দেওয়ার তা অনেকটাই খোলাসা করে বলেছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শফিক রেহমান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার স্মরণে ১৬ জানুয়ারি আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় অনেক বয়ানের মধ্যে মূল কথাটি বলেছেন যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, ‘খালেদা জিয়ার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে যদি দেশের মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে তাদের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারে।’
আমাদের অনুরোধ, এখানে বাধা সৃষ্টি করে খালেদা জিয়ার দেখানো রাজনীতির মহাসড়ক যেন আমরা চোরাগলিতে ফিরিয়ে না নিই। আল্লাহর দোহাই লাগে আর রক্ত দেওয়ার আওয়াজ যেন না ওঠে!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
মন্তব্য করুন