আজ ভয়াল ২৫ মার্চ, গণহত্যা দিবস। একাত্তরের ২৫ মার্চ বাঙালি জাতি ও তার স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা মুছে ফেলার লক্ষ্যে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এই ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বিষয়টি সামনে এনে ২০১৭ সাল থেকে দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গণহত্যা দিবস পালিত হলেও স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এটিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায় সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ বিভিন্ন সময় এ নিয়ে প্রচেষ্টা চালালেও তা পর্যাপ্ত নয়। ফলে সফলতা আসেনি। হতাশার কথা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধে মহান বিজয়কে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, গণহত্যা ও মানুষের ওপর নির্মমতার বিষয়টিতে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ বিষয় নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয়নি। কারণ সে সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে কোন দেশ কী ভূমিকা পালন করেছিল, সেই বিষয়টা সামনে চলে আসত। ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষের যে আত্মত্যাগ, সেই প্রসঙ্গটিও আড়ালে পড়ে যায়।
ইতিহাসের এ ভারসাম্যহীনতা দূর করার স্বার্থেই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রয়োজন। ওইসব গণহত্যার জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচারের স্বার্থেও এ স্বীকৃতির প্রয়োজন। ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের অভিযানে প্রায় ৫০ হাজার বেসামরিক মানুষ হত্যা করে। এরপর যুদ্ধের ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করা হয়। গবেষকদের মতে, যে দেশে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তারা ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন ওই গণহত্যার ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ বলে স্বীকার করে নেয়, তখনই ওই ঘটনা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার বিবেচনায় আসে। একটা গণহত্যাকে তারা (বিশ্ব সম্প্রদায়) যখন স্বীকার করে, তা সংসদ বা নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই হোক, তখন বলা যায় সেটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। আবার কোনো গণহত্যাকে যদি জাতিসংঘ গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলেও তাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বলা যাবে। গণহত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনা মনে করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপে ইহুদি নিধনের ঘটনাকে। সেই গণহত্যার ঘটনাটি বোঝাতে ‘হলোকস্ট’ নামে নতুন একটি শব্দ তৈরি হয়। এ ছাড়া গত শতাব্দীর প্রথম দিকে আর্মেনিয়ার গণহত্যাসহ রুয়ান্ডা ও যুগোস্লাভিয়ার গণহত্যা জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালত স্বীকৃতি দিয়েছে।
আর্মেনিয়ার গণহত্যার স্বীকৃতির জন্য ১০০ বছর ধরে চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলাদেশের গণহত্যাকে স্বীকৃতির ব্যাপারে পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো কার্যক্রম হয়েছে বলে জানা নেই। অন্যদিকে এই স্বীকৃতির বিষয়ে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিরোধিতা রয়েছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা ছিল পাকিস্তানের পক্ষে।
২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি গত বছরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি তোলেন। হতাশার কথা হচ্ছে, প্রতি বছর এ দিনটি এলে বিভিন্ন মহল থেকে এ দাবির পক্ষে আওয়াজ শোনা যায়। পরবর্তী সময়ে চোখে পড়ে না কোনো কার্যকর উদ্যোগ। দুঃখজনক হলেও সত্য, বিষয়টি পরিণত হয়েছে এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতায়। এক বছরেও বিষয়টিতে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। অবশ্য গত বছর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অস্থিতিশীল। সেই বিবেচনায় ধরেই নিচ্ছি, বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থায় সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগী হবে এবং কার্যকর
পদক্ষেপ নেবে।
যতক্ষণ দেশের মানুষ ও প্রবাসী জনগোষ্ঠী এর সঙ্গে যুক্ত না হচ্ছে, এ বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা, প্রামাণ্য দলিল তৈরি এবং ক্রমাগত প্রচারণা না হচ্ছে, ততক্ষণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকারের আমলে গণহত্যা নিয়ে গবেষণামূলক অনেক কাজ হচ্ছে। সরকার তৎপর হলে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব বলেই আমরা মনে করি।