বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় বইগুলোতে আমরা তরুণদের কথা পাই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জন অরণ্য’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘দূরবীন’, হুমায়ূন আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’ উপন্যাসগুলো জনপ্রিয়, কারণ সেখানে তরুণদের কথা আছে। সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ যদিও রাজনৈতিক উপন্যাস; কিন্তু সেখানেও আছে তরুণদের কথা। আর ‘গর্ভধারিণী’ তো তরুণদেরই গল্প। বাংলা সাহিত্যে এরকম বহু গল্পের খোঁজ পাওয়া যাবে; কিন্তু দুঃখের বিষয় হুমায়ূন আহমেদের পর এমন গল্প খুঁজে পাওয়া যায় না। তরুণদের নিয়ে গল্প সবাই লিখছেন, কিন্তু তারুণ্য আর তাদের চিন্তা যেন খুঁজে পাওয়া যায় না। তরুণ লেখক মাহমুদুর রহমানের ‘রঙ মিলান্তি’ সেখানে ব্যতিক্রম। তিনি কেবল তরুণদের নিয়ে লেখেননি, তারুণ্যের কথা লিখেছেন। প্রতিবাদের ভাষা খুঁজেছেন। ‘রঙ মিলান্তি’র গল্প ঢাকা শহরের কিছু তরুণকে নিয়ে। আমাদের স্বাধীনতার সময় বা তারও আগে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সব আন্দোলনের আঁতুড়ঘর; কিন্তু সময়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধরন বদলে গেছে। এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশে আছে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের আছে নিজস্ব গল্প। কিন্তু গত ১০ কিংবা ১২ বছরে এ তরুণদের নিয়ে কেউ লেখেননি। কিছু নাটক তৈরি হয়েছিল, যা ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে প্রাইভেট ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের। তাদের যেভাবে দেখানো হয়, তাতে মনে হয় সবাই আদরের দুলাল। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের ‘রঙ মিলান্তি’ দেখায় যে, এ শিক্ষার্থীদের আছে নিজেদের কিছু আদর্শ। তারাও এ দেশের, শহরের অবস্থা নিয়ে ভাবে। ‘রঙ মিলান্তি’ একদিকে নবায়ন নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলে, অন্যদিকে বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। বইটি ভিন্ন এই কারণে যে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাহিত্যে ছাত্রদের আন্দোলনের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। রঙ মিলান্তি একদিকে নবায়নের নাদিম, শিহাব, সৌম্যর ফ্রাসট্রেশন যেমন দেখায়, বেলা, সজীব, দিনাদের ভালোলাগা ভালোবাসা দেখানোর সঙ্গে দেখায় আন্দোলনে ফুঁসে ওঠা এ শহর। উপন্যাসে লেখক নিয়ে এসেছেন কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। নিজের কোনো রাজনৈতিক মত তিনি স্পষ্ট করে প্রকাশ করেননি; কিন্তু বিগত বছরগুলোতে তরুণদের এই যে ভিন্ন জাগরণ, সেটি তুলে ধরতে চেয়েছেন। প্রজন্ম যে দেশ ও রাজনীতি সচেতন, তাদের মধ্যে আছে সম্ভাবনা, সে বিষয়টি দেখাতে চেয়েছেন উপন্যাসে। বর্তমানে বাংলাদেশের উপন্যাস প্রেমপ্রধান। এর বাইরে আছে থ্রিলার। সামাজিক উপন্যাস নামে একটি জনরা পরিচিত হলেও সেটির পাঠক অনেক কমে গেছে। এর কারণও আছে। সামাজিক উপন্যাসে লেখকরা প্রেম, পরকীয়া ছাড়া কিছুই রাখেন না। ‘রঙ মিলান্তি’ সেটি রেখেছে। এ সময়ে বেশিরভাগ উপন্যাস ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও তাতে ঢাকাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু ‘রঙ মিলান্তি’ পড়ে একজন পাঠক গত দশকের ঢাকাকে চোখের সামনে দেখতে পাবেন। উপন্যাসে লেখক বসুন্ধরার ৩০০ ফিট রাস্তা থেকে উত্তরা, রামপুরা, ধানমন্ডি, পুরান ঢাকা সবই এনেছেন। এসেছে টিএসসি, চারুকলা আর অবধারিতভাবে শাহবাগ। এসেছে এ শহরের আর্ট গ্যালারির কথা, যা কভিড-পরবর্তী সময়ে মৃতপ্রায়। উপন্যাসটি মূলত আবর্তিত হয়েছে এর মূল চরিত্র নাদিমকে ঘিরে। নাদিমকে একজন পথিক বলা যেতে পারে। অনুসন্ধানী কিংবা চিন্তাশীল এক পথিক, যে সবকিছুকে প্রশ্ন করে। তার প্রশ্ন করা এবং উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই তারুণ্যকে দেখতে চেয়েছেন লেখক। অথবা পাঠককে তিনি দেখাতে চেয়েছেন। লেখকের গল্প বলার এ ধরন কারও ভালো লাগতে পারে, আবার অনেকের বিরক্তিও তৈরি করতে পারে। যারা গল্পের মধ্যে নানা তথ্য ও সাব-প্লট পছন্দ করেন না, ‘রঙ মিলান্তি’ তাদের কিছুটা বিরক্ত করবে। এ ছাড়া সম্পাদনায় প্রকাশনীর অবহেলার কারণে আছে বেশ কিছু মুদ্রণ ত্রুটি। কিন্তু উপন্যাসে যারা একটি লিনিয়ার গল্পের বাইরেও চিন্তা করার খোরাক চান, তারা এ বইতে পাবেন অনেক কিছু। তরুণদের চিন্তাভাবনার মধ্যেই লেখক বলে দিয়েছেন এ সময়ের মানুষের চাহিদা, চিন্তা আর করণীয়। এর বাইরে বইটিতে তিনি সন্ধান দিয়েছেন অনেক কবিতা, গল্প, লেখক ও সিনেমার। মূল গল্পের মধ্যেই পাঠকের জন্য রেখেছেন খুঁজে নিয়ে পড়ার অনেক বই, শোনার মতো অনেক গান। আর কথিত ‘হতাশ প্রজন্ম’র জন্য রেখেছেন বেশ কিছু আলোকবর্তিকা।
মন্তব্য করুন