দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিল গাজীপুরের মো. মোজাম্মেল হোসেন, পাবনার মুক্তার হোসেন খন্দকার এবং কুমিল্লার সালেহ আহম্মেদ সাইফুল। সেখানে থাকাকালে তাদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। পরে দেশে ফিরে এই তিনজনই ডিবি পরিচয়ে ডাকাতি করতে একটি দল তৈরি করে। সে দলে আসামি সাইফুল, বাবুল মোল্লা, হুমায়ুন কবির আলীসহ অন্যরা ছিল সহযোগী হিসেবে। তারা বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশ সেজে ডাকাতি করত। এ অপরাধে হ্যান্ডকাফ সরবরাহ করে তাদের সহযোগিতা করত কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কারারক্ষী। ঢাকার নবাবগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া একটি ডাকাতি মামলার চার্জশিটে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সম্প্রতি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নবাবগঞ্জ থানার এসআই (নিরস্ত্র) আশফাক রাগীব হাসান ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কারারক্ষীসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দেন। এ বিষয়ে কালবেলাকে তিনি বলেন, মামলায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। তবে জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া না যাওয়ায় তিনজনের অব্যাহতির আবেদন করা হয়েছে। সাক্ষীরা মামলার ঘটনা প্রমাণ করবেন।
মামলার বাদী কৃষ্ণ সাহা বলেন, আসামিরা আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে স্বর্ণালংকার, রুপা ও অর্থ ডাকাতি করে নিয়ে যায়। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলো মো. মোজাম্মেল হোসেন আপেল ওরফে হাজি আপেল, মো. নুরুজ্জামান হোসেন ওরফে মুক্তার হোসেন খন্দকার, সালেহ আহম্মেদ সাইফুল ওরফে মো. সালাউদ্দিন ওরফে টাকলু সাইফুল, মো. বাবুল মোল্লা, মো. শাহাদাত গাজী, মো. হুমায়ুন কবির, শ্যামল সরকার, রিপন মিয়া ওরফে লেচু মিয়া, আব্দুস সামাদ শিকদার, জাহাঙ্গীর, মো. শাকিল খান স্বপন, মো. হুমায়ুন মিয়া, মো. মান্নান মিয়া, মো. আয়ুব ওরফে আইয়ুব, হুমায়ুন কবির রাসেল ও কারারক্ষী মো. আবু তালেব মুন্সী। এ ছাড়া আসামি নজির হোসেন, সাইদুর ইসলাম রাজু ও লেংড়া জাহাঙ্গীরকে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন করা হয়েছে। গত বছর ৩০ এপ্রিল সকালে ব্যবসায়ী কৃষ্ণ সাহা দোকানে যাওয়ার পথে ডাকাতের কবলে পড়েন। পরদিন ১ মে বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ৫-৬ ডাকাতের বিরুদ্ধে নবাবগঞ্জ থানায় মামলা করেন।
মামলার চার্জশিটে বলা হয়, আসামি শ্যামল তার ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা করতে থাকেন। তবে ব্যবসায় কৃষ্ণ সাহা তার চেয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছে যান। এজন্য শ্যামল ব্যবসায়িকভাবে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে আসামি শাহাদাত গাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা ভুক্তভোগীর স্বর্ণালংকার ডাকাতির পরিকল্পনা করে। কিন্তু প্রথমবার ব্যর্থ হয়। পরে আসামি হাজি আপেল পলাতক আসামি কারারক্ষী আবু তালেব মুন্সির কাছ থেকে হ্যান্ডকাফ নিয়ে আসে। ঘটনার দিন ভোর ৫টার দিকে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার থানা থেকে রাজধানীর কেরানীগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেয় মান্নান ও হুমায়ুন। মির্জাপুর থেকে ওঠে সামাদ ও জাহাঙ্গীর মল্লিক। কাশিমপুরের বাসা থেকে হুমায়ুন কবিরকে ওঠানোর পর নেমে যায় সামাদ ও জাহাঙ্গীর। ভোর ৬টায় খিলক্ষেত থেকে আসামি হাজি আপেল, মোক্তার, সাইফুল ও বাবুল মোল্লা গাড়িতে ওঠে। সে সময় গাড়িতে বসে দায়িত্ব ভাগ করে দেয় আপেল।
বেশি স্বর্ণালংকার দেখে অবাক হয় ডাকাতরা:
ব্যবসায়ী কৃষ্ণ সাহা বাড়ি থেকে বের হলে আসামি রিপন মোবাইল ফোনে শাহাদাত গাজীকে বিষয়টি জানায়। অটোরিকশায় আগলা পোস্ট অফিসের সামনে পৌঁছলে হাজি আপেল, বাবুল মোল্লা ও মুক্তার ডিবি পুলিশ পরিচয়ে বাদীকে গাড়িতে তোলে। এরপর গামছা দিয়ে চোখ, মুখ ও পা বেঁধে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয়। চিৎকার করলে কিল-ঘুসি মারতে থাকে ডাকাতরা। ২০-২৫ মিনিট পর মানিকগঞ্জের সিংগাইর থানার সাহরাইল গ্রামের রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায়। পরে আপেল, মুক্তার ও সাইফুল মিলে সাইফুলের খিলক্ষেতের অফিসে যায়। একটু পর যায় শাহাদাত। অফিসের ভিতরে বসে ব্যাগ দুটো খোলে মুক্তার। তখন তিন লাখ টাকা এবং অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণ স্বর্ণালংকার দেখে অবাক হয়ে যায়। পরে সাইফুল পাশের মাছবাজার থেকে ডিজিটাল ওজন মাপার মেশিন আনে। মেপে দেখে স্বর্ণ প্রায় তিন কেজি।
ডাকাতির টাকায় অটোরিকশা ক্রয়: আসামি সাইফুলকে ৪০০ গ্রাম স্বর্ণ ও ৩৫ হাজার টাকা, বাবুলকে দেড়শ গ্রাম স্বর্ণ ও পাঁচ হাজার টাকা, শাহাদাতকে পাঁচ কেজি রুপা ও ১৫০ গ্রাম স্বর্ণ এবং ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। আসামি মুক্তারকে দেওয়া হয় ৭০০ গ্রাম স্বর্ণ ও ৩০ হাজার টাকা এবং শ্যামলকে ৩০০ গ্রাম স্বর্ণ দেওয়া হয়। হুমায়ুন কবিরকে গাড়ির ড্রাইভারসহ অন্য আসামিদের দেওয়ার জন্য ৩৬০ গ্রাম স্বর্ণ ও এক লাখ টাকা দেওয়া হয়। অন্যদিকে, শাহাদাত তার স্বর্ণালংকার বিক্রির জন্য শ্যামলকে দেয়। স্বর্ণ বিক্রি করে সাড়ে ছয় লাখ টাকা শাহাদাতকে দেয় শ্যামল। সে টাকা দিয়ে সে দুটি অটোরিকশা কেনে।