

দৈনন্দিন জীবনে সর্বস্তরের মানুষের ব্যবহৃত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য হলো ভোজ্যতেল। মানুষের দৈনিক শক্তি গ্রহণের পাশাপাশি জনগোষ্ঠীর পুষ্টিঘাটতি মোকাবিলা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে ভিটামিন-সমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই আইন অনুযায়ী ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ ব্যতীত ভোজ্যতেল বাজারজাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
অথচ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ড্রামে বাজারজাতকৃত ভোজ্যতেলের ৫৯ শতাংশেই ভিটামিন ‘এ’ নেই এবং ৩৪ শতাংশ ভোজ্যতেলে সঠিক মাত্রায় ভিটামিন পাওয়া যায় না—যা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
প্রশ্ন হলো, ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ কেন এত জরুরি? জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ ২০১৯–২০ অনুযায়ী, দেশে ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি নারীদের (গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী নন) মধ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতিতে ভুগছেন। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে রাতকানা রোগ, চোখের শুষ্কতা ও কর্ণিয়ার ক্ষতি, সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি, দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে বাধাসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। পাশাপাশি এই ঘাটতি মানবদেহে সামগ্রিক পুষ্টিহীনতা সৃষ্টি করে, যা সংক্রামক ও অসংক্রামক—উভয় ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশে সর্বসাধারণের মধ্যে ভিটামিন ‘এ’ ঘাটতি মোকাবিলায় ২০১৩ সালে “ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন” এবং ২০১৫ সালে এর বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, দেশে বাজারজাত সকল ভোজ্যতেলে (সয়াবিন তেল, পাম তেল, পাম অলিন এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্যান্য উদ্ভিজ্জ ভোজ্যতেল) নির্ধারিত মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ বাধ্যতামূলক।
এই মাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ১৫ থেকে ৩০ পিপিএম—অর্থাৎ প্রতি গ্রাম ভোজ্যতেলে ন্যূনতম ০.০১৫ মিলিগ্রাম এবং সর্বোচ্চ ০.০৩০ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘এ’ থাকতে হবে। একই সঙ্গে সমৃদ্ধকরণ প্রতীক ব্যতীত এবং স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর উপকরণে প্রস্তুত প্যাকেট বা পাত্রে ভোজ্যতেল বাজারজাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অস্বাস্থ্যকর নন-ফুড গ্রেডেড ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণের চলমান প্রবণতা “ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩”-এর কার্যকর বাস্তবায়নসহ সরকারের সামগ্রিক পুষ্টি ও জনস্বাস্থ্য লক্ষ্য অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিডিডিআর,বি পরিচালিত গবেষণায় বাজারে পাওয়া খোলা ভোজ্যতেলের ৫৯ শতাংশ নমুনায় ভিটামিন ‘এ’ অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নমুনায় ভিটামিন ‘এ’ এর মাত্রা ছিল নির্ধারিত মানের চেয়ে কম এবং মাত্র ৭ শতাংশ নমুনা সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণ করেছে। এই চিত্র জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
উল্লেখযোগ্য যে, ভোজ্যতেল পরিবহণে ব্যবহৃত এসব ড্রাম দেশে উৎপাদিত নয়। কেমিক্যাল, লুব্রিকেন্ট বা অন্যান্য শিল্পপণ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত পুরোনো ড্রাম পুনঃব্যবহার করে ভোজ্যতেল পরিবহণ করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব ড্রামে যথাযথ লেবেল ও উৎস সনাক্তকরণ তথ্য না থাকায় তেলের উৎস চিহ্নিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে, যা আইনের প্রয়োগকে দুর্বল করে। নন-ফুড গ্রেডেড প্লাস্টিক ড্রাম বারবার ব্যবহারের ফলে তেলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশে যেতে পারে এবং খোলা ড্রামে তেল রাখার কারণে ভেজাল মেশানোর ঝুঁকিও থাকে।
অস্বাস্থ্যকর ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ শুধুমাত্র খাদ্য নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির একটি নীরব উৎস। শিল্প মন্ত্রণালয় বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা প্রদান করলেও এর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রথমত, অনিরাপদ ড্রামের পরিবর্তে ফুড গ্রেড বোতল বা পাউচে ভোজ্যতেল বাজারজাত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘এ’ দ্বারা সঠিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে কিনা, তা নিয়মিত যৌথ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, ড্রামে সংরক্ষিত খোলা তেলের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পুষ্টিমান হ্রাসের বিষয়টি নীতিনির্ধারক, উৎপাদক, সরবরাহকারী ও সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। চতুর্থত, ভোক্তাদের অস্বাস্থ্যকর খোলা তেল পরিহার করে নিরাপদ প্যাকেটজাত ভোজ্যতেল গ্রহণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে ভোজ্যতেল সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদান বিবেচনায় নিতে হবে। সর্বোপরি, টেকসই ও নিরাপদ ভোজ্যতেল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন ও কঠোর বাস্তবায়ন অপরিহার্য। জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার খোলা ড্রামে ভোজ্যতেল পরিবহণ ও বাজারজাতকরণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক- পুষ্টিবিদ, আনোয়ার খান মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড হসপিটাল।
মন্তব্য করুন