

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অবস্থিত ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কয়লার মজুত ফুরিয়ে আসার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুতের বকেয়া বিল না পাওয়ার কারণে কয়লা কেনা যাচ্ছে না। অর্থাভাবে কয়লা কিনতে এলসি খোলা যাচ্ছে না। এমনকি সরবরাহকারী বাকিতে কয়লা দিতে রাজি হচ্ছে না। এ অবস্থায় যে কোনো সময় কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে কেন্দ্রটির পাওনা ৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।
এদিকে, গত ১৫ জানুয়ারি ভারতের আদানি পাওয়ার একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। এখন যদি বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দেশব্যাপী ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। তেলে উৎপাদনের খরচ বেশি। কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের একমাত্র বিকল্প কয়লা। কিন্তু কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ হলে লোডশেডিং ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য পিডিবির চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। তবে পিডিবির সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত ডিসেম্বরে এসএস পাওয়ারকে কিছু বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। প্রতি মাসেই বকেয়ার একটি অংশ পরিশোধ করা হচ্ছে। পিডিবিও আর্থিক সংকটে রয়েছে। তারপরও দ্রুত বকেয়া পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এসএস পাওয়ার ওয়ান লিমিটেডের চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এবাদত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, কয়লার মজুত ফুরিয়ে এসেছে। পিডিবির কাছে অনেক বকেয়া। টাকার অভাবে কয়লার এলসি খুলতে পারছি না। সরবরাহকারীও বাকিতে কয়লা দিতে চাচ্ছে না। এ অবস্থায় কেন্দ্র বন্ধ না করার বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, আমরা পিডিবিকে বকেয়া পরিশোধে একাধিকবার চিঠি দিয়েছি। পিডিবি বকেয়া টাকা না দিয়েই কেন্দ্র চালু রাখার অনুরোধ করেছে।
জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি বকেয়া পরিশোধের অনুরোধ জানিয়ে পিডিবির চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয় এসএস পাওয়ার। চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে বকেয়া বিলের পরিমাণ ৩ হাজার ৮০২ কোটি টাকার বেশি। এই বকেয়া না পাওয়ায় কয়লা আমদানি, কেন্দ্র পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটছে। পিডিবির সঙ্গে থাকা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না হলে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যাবে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বকেয়া বিল না পাওয়ার কারণে কয়লা আমদানির জন্য এলসি খোলা যাচ্ছে না। সরবরাহকারীর মূল্য পরিশোধ না করায় কয়লার একটি শিপমেন্ট ফেরত গেছে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, গত ১৫ জানুয়ারি নতুন কয়লা আসার কথা থাকলেও তা আসেনি। এ অবস্থায় চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী কেন্দ্রটি বন্ধ করা ছাড়া আমাদের হাতে কোনো বিকল্প নেই।
এসএস পাওয়ারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জরুরি ভিত্তিতে বকেয়া পরিশোধের জন্য পিডিবিকে ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর চারটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ গত ১৫ জানুয়ারি দেওয়া জরুরি চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিনই বিকেলে পিডিবি পাল্টা চিঠিতে কেন্দ্রটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় যে কোনোভাবে চালু রাখার অনুরোধ জানায়।
এসএস পাওয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে দেওয়া পিডিবির সেক্রেটারি মো. রাশেদুল হক প্রধান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, মোট বকেয়ার একটি অংশ এরই মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে দেড় হাজার কোটি টাকা এবং চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি আরও পাঁচশ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, পিপিএ অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব বাকি বিল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও নিরাপদ সরবরাহের জন্য এই কেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যে কোনো পরিস্থিতিতে কেন্দ্রটি বন্ধ না করার অনুরোধ জানানো হয়।
পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ জানুয়ারি থেকে ভারতের গেড্ডায় অবস্থিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। গতকাল সেই কেন্দ্র থেকে ৭৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন শীতকালীন হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম। তবে ফেব্রুয়ারির পর থেকে চাহিদা বাড়তে থাকবে। এ অবস্থায় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া দ্রুত পরিশোধ করে, কম দামে উৎপাদনে সক্ষম কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে হবে। তা না হলে সামনে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, গ্যাস সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না। এখন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো যে কোনো মূল্যে চালু রাখতে হবে পিডিবিকে। না হলে সামনে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন