স্ত্রী সানিয়া ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সন্তানের মুখ দেখার জন্য রিকশাচালক আরিফের যেন তর সইছিল না। টানাটানির সংসার হলেও মাতুয়াইলের একটি ক্লিনিকে স্ত্রীর নিয়মিত চেকআপ করাতে কার্পণ্য ছিল না। গর্ভের সন্তানের সর্বশেষ অবস্থা জানতে আলট্রাসনোগ্রাফি করানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক। আরিফের হাতে তখন টাকা-পয়সা ছিল না। কারণ কোটাবিরোধী আন্দোলন ঘিরে কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত ছিল ওই এলাকা। তবে স্ত্রী আর অনাগত সন্তানের সুস্থতার কথা ভেবে সহিংস পরিস্থিতির মধ্যেই রিকশা নিয়ে বেরিয়েছিলেন। স্ত্রীকে বলে গিয়েছিলেন, মেডিকেল পরীক্ষার টাকা জোগাড় হলেই ফিরে আসবেন। তবে তার আর ফেরা হয়নি। কোটাবিরোধী আন্দোলন ঘিরে সংঘাতের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান এই রিকশাচালক।
স্বজনরা জানান, ২০ জুলাই সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মাতুয়াইল হাজি মসজিদ কবরস্থান এলাকার গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন আরিফ। কোনো যাত্রী না পাওয়ায় রিকশা নিয়ে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত চলে যান। যাত্রীর অপেক্ষায় রিকশা থামিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ করেই পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়ে যায়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি গুলি আরিফের পেটে বিদ্ধ হয়। মনির নামে আরেকজন রিকশাচালক তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পথে আরিফ পানি খাওয়ার জন্য ইশারা করেন। দোকান থেকে পানি কিনে আরিফকে পান করানো হয়। দুপুর ২টার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকরা জানান, সেখানে পৌঁছানোর আগেই নিভে গেছে মাত্র ২৮ বছর বয়সী আরিফের প্রাণপ্রদীপ।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর আরিফের বাসায় মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে দেন রিকশাচালক মনির। এর পরই খালাতো বোনকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছুটে যান নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা সানিয়া।
স্বামীকে হারিয়ে সানিয়া এখন দিশেহারা। ১০ দিন পার হলেও তার কান্না থামছে না। কাঁদতে কাঁদতে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ঘর থেকে যে মানুষটি বের হলো মর্গের মেঝেতে তার নিথর দেহ পড়ে রয়েছে দেখলাম। আমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই তার বাবাকে হারাল। সন্তান নিয়ে ওর কত স্বপ্ন ছিল। সন্তানের মুখ দেখে যেতে পারল না। আমার অসুস্থ শাশুড়ি, ননদ আর যে এখনো দুনিয়াতে আসেনি, তাদের নিয়ে আমি কোথায় যাবো? আমাদের সংসারটা ভাসিয়ে দিয়ে গেল একটি গুলি।’
বছর তিনেক আগে নিজ গ্রামের সানিয়াকে বিয়ে করেছিলেন বরিশালের পটুয়াখালীর দশমিনার মো. আরিফ। গ্রামে বাড়িঘর ও জমিজমা না থাকায় অসুস্থ মা, ছোট বোন আর স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। মাতুয়াইল হাজি মসজিদ কবরস্থানের পাশের বস্তিতে ৪ হাজার টাকায় একটি টিনের ঘর ভাড়া নেন। কোনো কাজ না পাওয়ায় চারজনের সংসারের হাল ধরতে রিকশা চালানো শুরু করেন। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে যা রোজগার করতেন, তা দিয়েই চলত সংসার। কয়েকদিন আগে অসুস্থ মাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন। চিকিৎসার পর একটু সুস্থ হলে বাড়ি নিয়ে আসেন।
আরিফের খালাতো বোন জানালেন, ‘যখন খবর পেলাম আমি তখন অফিসে। দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসি। হাতে টাকা-পয়সাও তেমন নাই। কীভাবে ভাইয়ের লাশ আনব, দাফন করব? উপায় না পেয়ে মানুষের কাছে হাত পাতলাম। চাঁদা তুলে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে লাশ নিয়ে আসি। টাকার অভাবে লাশটা গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী নিতে পারিনি। মাতুয়াইল কবরস্থানে কবর দেওয়া হয়।’
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে আরিফের অসুস্থ মা সুজা বানু এখন পাগল প্রায়। অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূ আর ১৬ বছরের মেয়েকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছেন তিনি। চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে একটু সাহায্যের আশায় দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন।