আজ বাইশে শ্রাবণ। বাঙালির প্রাণের মানুষ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮২তম প্রয়াণ দিবস। বর্ষা ছিল রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু। অজস্র গানে-কবিতায় বাংলার বর্ষাকে তিনি অতুলনীয় রূপে ফুটিয়ে তুলেছেন, করেছেন সুষমামণ্ডিত। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের সেই প্রিয় বর্ষাতেই নিভেছিল কবির জীবনপ্রদীপ। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট, বাংলা বাইশে শ্রাবণ জোড়াসাঁকোর বাসভবনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাঙালির শ্রেষ্ঠতম এই প্রতিভা। মৃত্যুর সাত দিন আগ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিশীল ছিলেন।
সারা জীবনে তার আপন প্রতিভার দীপ্তিতে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সব চরাচরকে উদ্ভাসিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রায় একক ক্ষমতায় তিনি বাংলা সাহিত্যকে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদাপূর্ণ আসনে। কাব্য, সংগীত, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শিশুতোষ রচনাসহ সাহিত্যের প্রতিটি শাখা তার প্রতিভার স্পর্শে দীপ্তিমান হয়ে উঠেছিল। প্রতিভার আলো পড়েছিল চিত্রকলাতেও। তার বৈচিত্র্যময় রচনাসম্ভার মহৎ মানবিক আবেদনের মহিমায় হয়ে উঠেছে কালজয়ী।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দে এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে প্রথাগত -শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেননি; গৃহশিক্ষক রেখে বাড়িতেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আট বয়সে তিনি লেখা শুরু করেন। ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গভীর আগ্রহে চিত্রকলার চর্চা শুরু করেন, যা ভারতীয় শিল্পকলায় এক নতুন মাত্রা সংযোজন করে। সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি সমাজসংস্কার, শিক্ষাবিস্তার, কৃষি উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মে নিজেকে জীবনব্যাপী সক্রিয় রেখে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তিনি। বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথের লেখার প্রধান উপজীব্য ছিল জীবনানুভূতি, যেখানে বাঙালির জাতিসত্তা, আশা-আকাঙ্ক্ষা-নিরাশার আবেদনগুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এটি এমন প্রবলভাবে এসেছে যে, তিনিই হয়ে উঠেছেন বাঙালির জাতিসত্তা ও বোধের এক অপার আধার।
তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৫২টি, উপন্যাস ১৩টি, ছোটগল্পের বই ৯৫টি, প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ ৩৬টি এবং নাটকের বই ৩৮টি। কবির মৃত্যুর পর ৩৬ খণ্ডে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া ১৯ খণ্ডে রয়েছে ‘রবীন্দ্র চিঠিপত্র’।
এ সব মৌলিক সৃজনশীলতার বাইরেও কবির প্রতিভার স্ফুরণ রয়েছে। জমিদার পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি জমিদারিও করেছেন। তিনি ১৮৯১ সাল থেকে বাবার আদেশে কুষ্টিয়া, পাবনা, নাটোর ও ওডিশায় জমিদারি দেখাশোনা করেন। সেখানকার পৈতৃক ‘কুঠিবাড়িতে’ তিনি অসংখ্য কবিতা ও গান রচনা করেন। পাশাপাশি তিনি ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০১ সালে কবি কুষ্টিয়ার শিলাইদহ থেকে সপরিবারে বোলপুরে শান্তিনিকেতনে চলে যান। ১৯০৫ সালে তিনি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯২১ সালে গ্রামোন্নয়নের জন্য ‘শ্রীনিকেতন’ নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন কবি। ১৯২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিশ্বভারতী’র মতো শিক্ষা-সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র। বিশ্বভ্রমণেও কবি ছিলেন অনন্য। তিনি ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত পাঁচটি মহাদেশের ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন।
কবির লেখা ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ভারতের জাতীয় সংগীতটিও কবির লেখা। কবি তার গানের বাণী ও সুরের মধ্য দিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন শতকোটি মানুষের হৃদয়ে।
রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়সহ দেশের নানা প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আজ সকাল ১১টায় একক বক্তৃতা ও প্রবন্ধপাঠের আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার ও বেসরকারি টেলিভিশনগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান ও নাটক প্রচার করছে। দিবসটি উপলক্ষে রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়া ও শিয়ালদহ কুঠিবাড়িতে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন