

সবুজে ঘেরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি) ক্যাম্পাসে ৩০ বছরে ভিন্ন পরিচর্যায় একটু একটু করে বেড়ে উঠেছে বিরল বৃক্ষ নাগলিঙ্গম। পাশাপাশি ফুলের সৌন্দর্য, ফলের নানামুখী গুণে অনন্য এক প্রাকৃতিক প্রতিনিধিত্ব করে। বিশেষ দুটি বৈশিষ্ট্যের এ বৃক্ষে সারা বছরই মনোমুগ্ধর ঘ্রাণ ছড়ানো ফুল থাকে। আর ব্যতিক্রমী এক পরিচর্যার দাবি করে, যা হলো গোড়ায় আগুনের তাপে বাড়ে নাগলিঙ্গমের সবলতা, সতেজতা। বিলুপ্তপ্রায় এই প্রজাতি শুধু সৌন্দর্যই নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও সাক্ষী।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বর্তমানে দুটি নাগলিঙ্গম গাছ রয়েছে। ফুলের গঠন সাপের ফনার মতো হওয়ায় এ গাছের নামকরণ করা হয়েছে নাগলিঙ্গম। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘ক্যানন বল ট্রি’। আর এ নামকরণের পেছনে সম্ভবত ফলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, নাগলিঙ্গমের ফলের আকৃতি কামানের গোলার মতোই গোল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের একজন শিক্ষক ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম থেকে এ গাছের চারা সংগ্রহ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নার্সারিতে বিশেষ যত্নে গাছটি লালনপালন করা হয়।
নার্সারির পরিচর্যাকারীরা জানান, নাগলিঙ্গম গাছের বৃদ্ধিতে এরই মধ্যে ঝরে যাওয়া পাতা গোড়ায় জমিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে গাছটি আরও সবল হয়ে ওঠে।
সাধারণত বেশিরভাগ উদ্ভিদের ফুল ফোটে শাখায়; কিন্তু নাগলিঙ্গমের ফুল ফোটে গাছের মধ্য গুঁড়িতে। গুঁড়ি ফুঁড়ে বের হওয়ায় ফোটে থোকা থোকা ফুল, যা দেখলে গেঁথে রাখা হয়েছে বলেও ভুল করাটা স্বাভাবিক। ফুলের রং গাঢ় গোলাপি, সঙ্গে হালকা হলুদ রঙের মিশ্রণ। পাপড়ি ছয়টি, গোলাকার কুল্লি পাকানো। যেন ফণা তোলা সাপ!
জানা যায়, উচ্চতায় ৩৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে এ গাছ। এর পাতা গুচ্ছাকারে জন্মায় এবং সাধারণত আট থেকে ৩১ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। প্রায় সব ঋতুতেই পাতা ঝরে, আবার কয়েকদিনের মধ্যেই আসে নতুন পাতা। আর ফুল ঝরে যাওয়ার পরই গাছে আসে গোলাকার ফল, অনেকটাই বেলের মতো।
নাগলিঙ্গম গাছের আদি নিবাস মূলত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বনাঞ্চলে। তবে ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি পবিত্র উদ্ভিদ হিসেবে বিবেচিত। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শিব ও সর্প পূজায় নাগলিঙ্গম ফুল ব্যবহার করে থাকেন। ভারতে এ গাছটি ‘শিব কামান’ নামেও পরিচিত।
এ গাছের ছাল-বাকল, ফুল, ফলের রয়ের রয়েছে নানামুখী গুণ। যেমন ফুল ও ফলের নির্যাস থেকে তৈরি হয় দামি সুগন্ধি। আর গাছের রয়েছে অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল ঔষধি গুণ। গাছের ছাল ও পাতার নির্যাস কাজ করে চর্মরোগ এবং ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে।
ঢাকায় জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ছাড়াও রমনা উদ্যান, কার্জন হল, বলধা গার্ডেন, নটর ডেম কলেজ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিলেট ও হবিগঞ্জে এ গাছ রয়েছে বলে জানা গেছে।
মন্তব্য করুন