

ইরানে সাম্প্রতিক দেশব্যাপী বিক্ষোভে অংশ নেওয়াদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত ও নেতৃত্ব দেওয়া দেশটির নাগরিকদের সম্পদ জব্দের কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বিচারের কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে গুরুতর ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব বিশ্লেষকের মতে, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বাড়লে ইরানের পারমাণবিক উপকরণ ভুল হাতে পড়তে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রায় চার দশকের শাসনের অবসান চাওয়ার কথা বলেন। এর আগে খামেনি ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সহায়তার জন্য দায়ী করেন এবং বিক্ষোভকারীদের সহিংসতার জন্য হাজারো মৃত্যুর জন্য দোষারোপ করেন।
এ উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মালাক্কা প্রণালি হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের বিচারের আওতায় আনার কথা জানিয়ে ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে বিচার বিভাগের মূল কাজ এখনই শুরু হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যার শাস্তি প্রাপ্য তাকে যদি অযৌক্তিকভাবে ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি হবে।’
এদিকে, রোববার অল্প সময়ের জন্য সীমিত আকারে ইন্টারনেট সংযোগ চালু হলেও ইরানের অধিকাংশ নাগরিক এখনো ইন্টারনেট সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। একই দিনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত যৌথ বিবৃতিতে তারা জানিয়েছেন, খুনি ও সন্ত্রাসী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে যারা বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, তারা চাইলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ‘ইসলামী সহানুভূতি’ পেতে পারেন।
তীব্র মুদ্রাস্ফীতির কারণে বর্তমানে ইরানে যে বিক্ষোভ চলছে, তা শুরু হয়েছে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর। সম্প্রতি ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের রেকর্ড অবমূল্যায়ন ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া দেশটির গ্রান্ড বাজার এলাকার ব্যবসায়ীরা প্রথমে বিক্ষোভ শুরু করেন, যা পরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও ইরানি কর্তৃপক্ষ এখনো নির্দিষ্ট করে কিছু জানায়নি। এরই মধ্যে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ইরানের অভ্যন্তরে আন্দোলনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। বিক্ষোভকে উসকে দিতে এসব দেশের গোয়েন্দা সংস্থা হাজারো মানুষকে হত্যা করেছে।
এ ছাড়া ইরানি কর্তৃপক্ষ বরাবরই দাবি করে আসছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এ বিক্ষোভে অস্ত্র ও অর্থের জোগান দিয়েছে।
ইরান সরকারের ভাষ্যমতে, হাজার হাজার মানুষ হত্যার জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়, বরং সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত ‘সন্ত্রাসীরা’ সরাসরি দায়ী। সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ভিন্ন খাতে পরিচালনা করতে গুলি ও ছুরি চালিয়েছে।
বিদেশভিত্তিক পর্যবেক্ষক এবং ইরানের বাইরে থাকা বিরোধীদের দাবি, অধিকাংশ বিক্ষোভকারী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএর সর্বশেষ তথ্যমতে, তারা ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করতে পেরেছে। পাশাপাশি আরও ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি মৃত্যুর খবর তারা যাচাই করে দেখছে। বিক্ষোভে ২ হাজার ১০৭ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন ২৪ হাজারের বেশি মানুষ। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এসব তথ্য নিরপেক্ষ সূত্রে যাচাই করতে পারেনি।
বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা ইরানকে হুঁশিয়ার করে চলেছেন। এর মধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হস্তক্ষেপ করলে ফল ভুগতে হবে। সোমবার পাল্টা হুমকি দিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইরান যদি একটাও ভুল পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ইসরায়েল সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। এমন আক্রমণ করবে যে ইরান আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।’
এখন গ্রেপ্তারকারীদের বিচার শুরু হওয়ায় নতুন করে উত্তেজনা শুরু হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা পারমাণবিক ঝুঁকির কথা তুলেছেন।
পারমাণবিক উপকরণ হারানোর আশঙ্কা: ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রধান ও সাবেক অস্ত্র পরিদর্শক ডেভিড অলব্রাইট বলেন, ইরানে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে সরকার পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হতে পারে। বিশেষ করে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানায়, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪৪০.৯ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ—অস্ত্রমানের ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে আর খুব বেশি প্রযুক্তিগত ধাপ প্রয়োজন নেই।
আইএইএ আরও জানায়, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে তারা এই ইউরেনিয়ামের অবস্থান ও নিরাপত্তা যাচাই করতে পারছে না। সংস্থাটি ‘জ্ঞানগত ধারাবাহিকতা হারানোর’ কথা স্বীকার করেছে।
ডেভিড অলব্রাইটের মতে, এই ইউরেনিয়াম প্রায় ১৮-২০টি পরিবহনযোগ্য সিলিন্ডারে রাখা সম্ভব, যার প্রতিটি বহনে দুজন মানুষই যথেষ্ট। ফলে চুরি বা গোপনে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বোমা তৈরির সম্ভাবনা: অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ কেলসি ড্যাভেনপোর্ট বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়লে এই ইউরেনিয়াম গোপন পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হতে পারে বা সরকারের কোনো অংশ কিংবা সামরিক গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়েও পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব, যদিও তা সাধারণ পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় বড় ও ভারী হবে এবং ক্ষেপণাস্ত্রে বহন করা কঠিন। তবুও পরীক্ষামূলকভাবে মরুভূমিতে বিস্ফোরণ ঘটানো যেতে পারে।
বুশেহর পারমাণবিক কেন্দ্রও ঝুঁকিতে: অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সুযোগে ইরানের একমাত্র বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহরে নাশকতা বা হামলার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কেন্দ্রটি রাশিয়ার সরবরাহকৃত জ্বালানিতে পরিচালিত হলেও সেখানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হলে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টার মধ্যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ওমান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত ইরান তার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বই একটি নতুন পারমাণবিক সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
মন্তব্য করুন