বর্তমানে দেশে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাদি জমির পরিমাণ কমে আসছে। এ অবস্থায় অল্প জমিতে উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এজন্য প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন কৃষিবিদ দরকার। পাশাপাশি কৃষি প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গবেষণা করে উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানোর কাজটি করেন কৃষিবিদরা।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও গত দেড় দশকে দেশের কৃষিবিদরা বিভিন্ন ফসলের শত শত জাত উদ্ভাবন ও প্রবর্তন এবং উন্নত চাষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করেছেন। এ কারণেই আমাদের জমি ক্রমহ্রাসমান হলেও প্রতিবছর উৎপাদন বেড়েই চলছে। দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি ভরে উঠেছে ফসলের বৈচিত্র্যে।
এ মুহূর্তে দেশে কৃষিবিদের সংকট না থাকলেও কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় অনেকেই দেশের বাইরে পাড়ি জমাচ্ছেন। যদিও সরকার কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এই প্রেক্ষাপটে আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে কৃষিবিদ দিবস।
এ কথা অনস্বীকার্য, বর্তমানে কৃষির যে অগ্রগতি হয়েছে, তা সম্ভব হয়েছে দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে। সামনের সারি থেকে নেতৃত্ব দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার বলয় রচনা ও সুরক্ষা এবং সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা আজ সর্বজন স্বীকৃত। স্বীকৃতির এই মর্যাদা অর্জনের পথ মোটেই মসৃণ ছিল না।
১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), ময়মনসিংহের প্রতিষ্ঠা এবং ষাটের দশকের মধ্যভাগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ও তৎকালীন ঢাকায় তেজগাঁও কৃষি কলেজের (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্রদের দুই দফাভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে এ লড়াইয়ের সূচনা হয়। দুই দফার একটি হলো কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশকালে গেজেটেড পদমর্যাদা প্রদান, অন্যটি সমমর্যাদার পেশাজীবীদের সঙ্গে একীভূত বেতন স্কেল ও সংগতিপূর্ণ টেকনিক্যাল পে প্রদান।
এ দুই দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ১৯৬৪ সালের ১৭ জুন থেকে ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয়, যা লাগাতার ১৭২ দিন অব্যাহত থাকে। এ আন্দোলনে মলয় বৈশ্য নামে এক ছাত্র আত্মাহুতি দেন। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতারা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশপদে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা এবং টেকনিক্যাল পে প্রদানের দাবি জানালে তিনি তা মেনে নিয়ে অচিরেই সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করেন। এ অর্জনের দীর্ঘকাল পর ২০১১-১২ মেয়াদে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ১৩ ফেব্রুয়ারিকে কৃষিবিদ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের আলোকে ২০১২ সাল থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ‘কৃষিবিদ দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে দেশে ৪০ হাজার কৃষিবিদ রয়েছেন।
দিবস উপলক্ষে খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন থেকে সকালে বর্ণাঢ্য র্যালি বের হবে। বিকেলে ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সন্ধ্যায় হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া এ প্রসঙ্গে কালবেলাকে বলেন, দেশের খাদ্য উৎপাদনে কৃষিবিদরা কাজ করে যাচ্ছেন। দিন দিন জমির পরিমাণ কমলেও দেশের উৎপাদন তেমন একটা কমেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে।
তিনি বলেন, সামনে আমাদের জনসংখ্যা আরও বাড়বে। জমি কমবে। এখন কৃষি ও কৃষিবিদদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণা আরও বাড়াতে হবে। যাতে অল্প দামে কৃষির বীজসহ সব ধরনের সামগ্রী কৃষকের কাছে পৌঁছানো যায়।
বর্তমানে দেশে কৃষিবিদদের কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ খাতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে বার্ষিক খাদ্যশস্য উৎপাদন হতো দেড় কোটি টন। অথচ বর্তমানে বার্ষিক খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ চার কোটি টনের বেশি। এ উৎপাদন আরও বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন কৃষিবিদরা।
কৃষিবিদদের হাতেই সৃষ্টি হচ্ছে ফসলের নতুন জাত কিংবা ফসল উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি। শুধু ফসল কেন, পাশাপাশি গবাদি পশুর উন্নয়ন, দুধের মান ও পরিমাণ বাড়ানো, মাংসের জন্য উন্নত জাতের পশুপালন প্রযুক্তি, বিভিন্ন ধরনের মাছের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষি খামারের বিভিন্ন ধরনের যান্ত্রিকীকরণ কিংবা কৃষির সব ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ—এসবই কৃষিবিদদের হাতের স্পর্শে প্রাণ পায়। এভাবেই ঘুরে দাঁড়ায় দেশের মেরুদণ্ডখ্যাত কৃষকের অর্থনৈতিক অবকাঠামো। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার সুবাদে কৃষিবিদরা এ দেশে আজ এক মর্যাদাবান পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃত। কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ফলে দেশ আজ খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের জন্য পথিকৃৎ।
ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ অবস্থানে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। শুধু সবজি আর ধানেই নয়; মাছ, ছাগল উৎপাদনেও বিশ্বে আয়তনের দিক থেকে অনেক পেছনে থাকা বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ; আমে সপ্তম; আলুতে অষ্টম এবং ফলে দশম। বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদন হয়, তার ৮৬ শতাংশই হয় আমাদের দেশে। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ বাংলাদেশ। আর ছাগলের মাংস উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম। আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবস্থানে। আর আলু উৎপাদনকারী শীর্ষ ১০ দেশের কাতারে এসেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে আলু, সবজি আর আম রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে।
এসব সম্ভব হয়েছে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ৮৮টি ইনব্রিড ও ছয়টি উচ্চফলনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। পরমাণু শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ ফসলের মোট ১০৮টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে এবং দেশের কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অবদান রেখে চলছে। এ ছাড়া বিনা সাফল্যের সঙ্গে উদ্ভাবন করেছে শিম, ডাল ও তেলজাতীয় আটটি ফসলের জন্য জীবাণু সার, যা মাটির গুণাগুণ রক্ষাসহ ডাল ও তেলজাতীয় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নাইট্রোজেন সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
দেশের জলবায়ু ও কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত বিভিন্ন ফসলের ৫৪৫ উচ্চফলনশীল জাত এবং ৫০৫টি ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তিসহ ১ হাজার ৫০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ডাল, তৈলবীজ, সবজি, ফলের ১০ হাজারের অধিক কৌলি সম্পদ (জার্মপ্লাজম) জিন ব্যাংকের মাধ্যমে সংরক্ষণ করছে। পাটজাতীয় ফসলের ৪৫টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যার মধ্যে দেশি পাট ২৪, তোষা পাট ১৫, কেনাফ চারটি ও মেস্তা দুটি। এ ছাড়া সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ৪৬টি জাত অবমুক্ত করেছে। এর বাইরে বেসরকারি বীজ কোম্পানিগুলো গবেষণা করে বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে।
বর্তমান সরকারের কৃষিনীতি, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং উন্নয়নসহ কৃষির আধুনিকীকরণ, নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে গবেষণা সুবিধা বৃদ্ধিসহ নানামুখী পদক্ষেপের কারণে কৃষিতে ঘটছে নীরব বিপ্লব। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। এর সবই কৃষিবিদদের ঐকান্তিক চেষ্টায় সফলতা পেয়েছে।