

নীরবতারও যে শব্দ থাকে, তা বুঝিয়ে দিলেন অরিজিৎ সিং। যে কণ্ঠ এক যুগ ধরে প্রেমের স্বীকারোক্তি, বিরহের দীর্ঘশ্বাস আর নিঃসঙ্গ রাতের একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠেছিল—সেই কণ্ঠই হঠাৎ থামার ঘোষণা দিল। কোনো মাইক ফেলে দেওয়া নেই, নেই বিদায়ী মঞ্চ বা অশ্রুসিক্ত বক্তৃতা—শুধু একটি নিঃশব্দ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট, আর তাতেই থমকে গেল কোটি হৃদয়ের স্পন্দন। প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে যেন একসঙ্গে স্তব্ধ হয়ে গেল ভারতসহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গোটা অরিজিৎ-প্রজন্ম। খ্যাতির শিখরে দাঁড়িয়ে, যখন প্রতিটি ছবি তার কণ্ঠ ছাড়া অসম্পূর্ণ বলে মনে হতো—ঠিক তখনই ‘প্লেব্যাক সম্রাট’-এর এই প্রস্থান প্রশ্ন তুলে দিল বহু কিছুর। এ কি ক্লান্তির বিরতি? না কি আলোর রঙিন জ্যোতি ছেড়ে শিকড়ে ফেরার নীরব আহ্বান? জিয়াগঞ্জের সেই সোমু থেকে কোটি ভক্তের হৃদয়ের অরিজিৎ—এই থামা কি সত্যিই শেষ, নাকি আরও গভীর কোনো সুরের শুরু?
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে এক পাঞ্জাবি বাবা আর বাঙালি মায়ের ঘরে ১৯৮৭ সালে জন্ম নেন অরিজিৎ সিং। সংস্কৃতিমনা পরিবার হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তার বেড়ে ওঠা গানের জগতে। মা আর দিদিমার কাছ থেকে শুরু হয় সারগামের হাতেখড়ি। এরপর গুরু রাজেন্দ্র প্রসাদ হাজারী তাকে দেন সংগীতের আসল দীক্ষা এবং অরিজিতকে শিখিয়েছিলেন জনপ্রিয়তা নয় একজন সংগীত শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখে তার কণ্ঠের সুরের শুদ্ধতায়।
এরপর গুরুর দীক্ষা মাথায় নিয়ে ২০০৫ সালে মুম্বাইয়ে অংশগ্রহণ করেন জনপ্রিয় সংগীত রিলেলিটি শো ‘গুরুকুল’-এ। সেখানে বিজয়ী হতে না পারলেও, পরবর্তী সময়ে সময় তাকে তুলে এনেছিল জনপ্রিয়তার কাতারে। তবে কষ্টের দিন কম পার করতে হয়নি তাকে। বহুদিন তাকে কাজ করতে হয়েছে প্রীতম, বিশাল-শেখরদের সহযোগী হয়ে। এরপর ২০১১ সালে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। বলিউডে অরিজিতের প্রথম গান গাওয়ার সুযোগ হয় সংগীত পরিচালক মিথুনের পরিচালনায় মার্ডার ২ সিনেমার ফির মহব্বত গানটির মাধ্যমে। গানটি সে সময় মোটামুটি ভালো জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে, ২০১৩ সালে মুকেশ ভাটের প্রযোজিত ছবি আশিকি ২-তে কয়েকটি গানে কন্ঠ দেওয়ার পর তিনি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশেষত ওই ছবিতে ‘তুম হি হো’ গানটি গাওয়ার পরই তিনি সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক অনন্য আইকনে পরিণত হন। এ গানই তাকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও তারকাখ্যাতি। ‘তুম হি হো’-এর জন্য তিনি ৫৯তম ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডসে সেরা পুরুষ গায়কের সম্মান অর্জন করেন।
এরপর ২০১৪ সালে জিৎ গাঙ্গুলীর সুর ও সংগীতে গাওয়া ‘মুসকুরানে’ গানটি তার ক্যারিয়ারে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে ওঠে। এ গানের জন্য সে বছরই তিনি সর্বাধিক মনোনয়ন লাভ করেন।
সাফল্যের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে পরবর্তী বছরগুলোতেও। ২০১৬ সালে ‘সুরাজ ডুবা হ্যায়’ এবং ২০১৭ সালে ‘এ দিল হ্যায় মুশকিল’ গানের জন্য তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেন। এভাবেই একের পর এক জনপ্রিয় গান ও সম্মাননা অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সংগীত জগতে নিজের একটি স্বতন্ত্র ও শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করে নেন।
অরিজিৎ সিং উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। এর মধ্যে রয়েছে ‘তুম হি হো’, ‘চান্না মেরেয়া’, ‘রাবতা’, ‘আগার তুম সাথ হো’, ‘কেসারিয়া’, ‘শায়াদ’, ‘ফির লে আয়া দিল’, ‘এ দিল হ্যায় মুশকিল’, জালিমাসহ আরও অসংখ্য গান।
কিন্তু নিজের সোশ্যাল হ্যান্ডেল ফেসবুকে অরিজিতের প্লেব্যাক্ল থেকে বিদায় নেওয়ার ঘোষণা মেনে নিতে পারছেন না তার ভক্তকূল। শেয়ারকৃত পোস্টে গায়ক লিখেছেন, ‘হ্যালো, সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। এত বছর ধরে আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, তার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, এখন থেকে আমি আর কোনো নতুন প্লেব্যাক কাজ নেব না। এখানেই ইতি টানছি। এটি ছিল দারুণ এক সফর।’
এই ঘোষণার পর ভক্তদের মধ্যে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দি সিনেমার গানে অরিজিৎ সিং ছিলেন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কণ্ঠ। ২০২৫ সালের শেষ দিক পর্যন্তও তিনি নিয়মিতভাবে হিন্দি ও আঞ্চলিক সিনেমার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। রোমান্টিক ও আবেগী গান থেকে শুরু করে আইটেম সং পর্যন্ত সর্বত্র তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে এটাও সত্য যে যিনি প্রকৃত শিল্পী, তিনি জানেন তাকে কখন থামতে হবে। আর অরিজিৎ সেটাই করেছেন। হয়তো তাকে সিনেমার প্লেব্যাকে আমরা আর শুনতে পাব না; কিন্তু তিনি আবার ফিরে আসবেন আমাদের মাঝে তার নিজস্ব সত্ত্বা ও নিজস্ব সুর নিয়ে।
মন্তব্য করুন