কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:০৭ পিএম
আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:১১ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

সাড়া ফেলেছে মনিরুল ইসলামের ‘পথভোলা পথিকেরা’

পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের লেখা ‘পথভোলা পথিকেরা’। ছবি : সংগৃহীত
পুলিশ কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের লেখা ‘পথভোলা পথিকেরা’। ছবি : সংগৃহীত

একেবারে কল্পলোকে না থেকে বাস্তবের আলীঙ্গনে তথ্যকে মূল উপজীব্য করে থ্রিল বা থিলার নিয়ে প্রিন্ট-ভিজুয়াল চর্চা এখন দেশে দেশে। পাঠক-দর্শক চাহিদাও বেশ। থ্রিলারের রকমফের আছে। অ্যাডভেঞ্চার-থ্রিলার, হরর থ্রিলার, মিস্ট্রি-থ্রিলার, ফ্যান্টাসি-থ্রিলারসহ আরও কত কী?

মনিরুল ইসলামের ‘পথভোলা পথিকেরা’ এ অভিযাত্রায় নতুন মাত্রা দিয়েছে। মনিরুল ইসলাম পেশাদার লেখক নন। তিনি একজন ঊর্ধ্বতন চৌকস পুলিশ কর্মকর্তা। তবে পেশাগত কাজের ফাঁকে লেখার চর্চা রয়েছে নিয়মিত। লেখালেখি এবং চর্চায় জাত লেখকের ছাপ তার মধ্যে। টানা প্রায় ৩০ বছরের চাকরিতে তার বেশিরভাগ কাজই হয়েছে সাদা পোশাকে। পুলিশের পাশাপাশি সমাজের ভেতর-বাইরেও বেশি করে দেখার সুযোগ হয়েছে তার। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান পদটির অভিষেক শুরু মনিরুলকে দিয়েই। পাঁচ বছরের কর্মকালে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান সাফল্য পায় তার সরাসরি নেতৃত্বে। দীর্ঘদিন গোয়েন্দা শাখা ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের দায়িত্ব পালনকালে বহু সন্ত্রাসীকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদের কাজটি করেছেন তিনি। এ অভিজ্ঞতা তাকে ঋদ্ধ করেছে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ সম্পর্কে। দিয়েছে বাড়তি অন্তর্দৃষ্টি। তা আরও ঝালাই করেছেন সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখিতে। তার পথভোলা বইটি একটু বেশি সময় নিয়ে পড়ে রবীন্দ্রনাথের পথভোলা পথিকের কথা মনে পড়ছে। ১৩২২ বঙ্গাব্দের ২১ চৈত্র, খ্রিষ্টাব্দ ১৯১৬-এর ৩ এপ্রিল, শান্তিনিকেতনে বসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টি ’আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি... । পরে এতে স্বরলিপিকায় আনেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ...আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি/ সন্ধ্যাবেলার চামেলি গো, সকালবেলার মল্লিকা/ আমায় চেন কি/ চিনি তোমায় চিনি, নবীন পান্থ/ বনে বনে ওড়ে তোমার রঙিন বসনপ্রান্ত/ ফাগুন প্রাতের উতলা গো, চৈত্র রাতের উদাসী/ তোমার পথে আমরা ভেসেছি / ঘরছাড়া এই পাগলটাকে এমন করে কে গো ডাকে করুণ গুঞ্জরি। এমন করে লেখা কাব্যের জনক রবীন্দ্রনাথ পথিক ছিলেন, পথভোলা ছিলেন না। এর মাঝেও পথিক রূপে সন্ধ্যাবেলার চামেলি, সকালবেলার মল্লিকাদের কথা এনেছেন। রবীন্দ্রনাথ শুধু পথিক ছিলেন না, ছিলেন বিশ্বপথিক। আশি বছরের জীবনে, তৎকালীন অনগ্রসর পৃথিবীর পটভূমিতে, দুটি বিশ্বযুদ্ধের অতি-সঙ্কুল পরিস্থিতি পেরিয়েও তিনি অন্তত ডজনবার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। ১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে তিনি পাঁচটি মহাদেশের তেত্রিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেন।

তার ভ্রমণ আওতায় ছিল ফ্রান্স, হংকং, চীন, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, অষ্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইতালি, নরওয়ে, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, গ্রিস, মিশর, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, জামান, বার্মা, হল্যান্ড, সোভিয়েত রাশিয়া, ইরান, ইরাক, শ্রীলঙ্কাসহ তৎকালের প্রায়-পুরোটা পৃথিবী। সেই সুবাদে এই পথিক বিশ্বের পথিকদেরও চিনেছেন। চিনি গো চিনি ওগো বিদেশিনিতে রয়েছে সেই কথা। এখন সময়ের অনেক হেরফের। প্রেক্ষিতও বদলেছে। প্রেক্ষাপটের সঙ্গে পথভোলা পথিকেরা বইটির ক্যানভাসও ভিন্ন। লেখার দারুণ মুন্সিয়ানায় মূল চরিত্রকে তিনি এক জায়গায় রাখেননি। কিন্তু ঘটনা টেনে নিয়ে গেছেন সামনের দিকে। এতে সন্ধ্যাবেলার চামেলি, সকালবেলার মল্লিকাদের কথা নেই। আছে স্বদেশি-প্রবাসীদের কথা। মেয়ের বাপের অসহায়ত্ব ছেলের বাপের উন্নাসিকতা, আমাদের সন্তানদের পথ হারিয়ে বরবাদ হয়ে যাওয়ার কথা আছে মনিরুল ইসলামের লেখনীতে।

রয়েছে থ্রিল-রোমান্টিকতাও। গল্প তৈরির নানাজন নানা কলাকৌশল নেন। কোনোটিই শেষ বা শুরু নয়। তবে, স্টাইলটা নিজস্ব। চাইলেই যে কেউ তা পারে না। একজন আরেকজনকে শেখাতেও পারে না। নিজের ভেতর সেই মোহ-আগ্রহ থাকতে হয়। মনিরুল ইসলাম তা দেখিয়ে দিয়েছেন চমৎকারিত্বের সঙ্গে। কখনো কখনো পেশাদার-প্রতিষ্ঠিত কোনো কোনো লেখকের জীবনেও স্টাইল তৈরির এ সৌভাগ্য হয় না।

কানাডা প্রবাসী আবু মুস্তাকিম ব্যক্তি জীবনের একরাশ হতাশা নিয়ে দেশে ফিরে আসাকে উপলক্ষ করে মনিরুল ইসলাম যেভাবে তার ‘পথভোলা পথিকেরা’ উপন্যাসটির রচনা টেনে নিয়েছেন, যা এক কথায় অসাধারণ। এতে প্রবাস ফেরত মুস্তাকিম হতাশ হলেও স্বপ্ন হারাননি। তার স্বপ্ন ছিল এক অলৌকিক সমাজ গড়ার। সমাজের লৌকিকতার মাঝে শরীয়াভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশে থাকা পুরোনো ইসলামী উগ্রপন্থিদের সঙ্গে কীভাবে তার যোগাযোগ হয়, এর কিঞ্চিত বর্ণনা আছে লেখায়। বর্ণনায় আছে আরও অনেক কথা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লাগাতার অভিযানে দেশে থাকা উগ্রপন্থিরা ছিল চরম বিপর্যস্ত। তারা স্বপ্নবাজ আবু মুস্তাকিমের মধ্যে নতুন ধরনের আশার আলোর খোঁজ পায়। তার নেতৃত্বে তারা এগিয়ে চলে। সংগঠনে অল্পদিনে নতুন নতুন মুখ যোগ হয়। সংগঠনের পুরোনো নেতা আবু দুজানা দেখে সুদূর কানাডা থেকে আসা আবু মুস্তাকিম আশ্চর্যজনকভাবে নিজের ব্যক্তি কারিশমায় ‘জিহাদি’ হিসেবে ধনী লোকের ছেলেদের সংগঠনে যুক্ত করছে। তার একটু ঈর্ষাবোধ হয়। তবে কি সে নিজের সংগঠনের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারবে না?

নিজের ভাবনা সে প্রকাশ করে না। কারণ তার জানা আছে আবু মুস্তাকিমের গোপন দুর্বলতা। তাছাড়া নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে সে বোঝে আবু মুস্তাকিমের সঙ্গে এখনই দ্বন্দ্বে জড়ালে সংগঠন ধ্বংসের ঝুঁকি দেখা দেবে। শুরু হয় এক অপারেশনের প্রস্তুতি যা বদলে দেবে বাংলাদেশের চেহারা। কোথায় কী সেই অপারেশন? গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কি পারবে আবু মুস্তাকিমকে ঠেকাতে? রোমহর্ষক এ আখ্যানের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে টান টান উত্তেজনা। এসবের বিস্তারিত জানতে উপন্যাসের শেষ পাতা অবধি টেনে নেবে পাঠককে। ভালো লেখক হতে গেলে সবার আগে নিজেকে ভালো পাঠক হতে হয়। নতুন-পুরোনো, জীবিত-মৃত লেখকদের লেখা থেকে শুরু করে মুদি দোকানের ঠোঙা পর্যন্ত সবকিছু গোগ্রাসে পড়ে ফেলার নেশা অনেক লেখককে জীবনী দিয়েছে। মার্কিন লেখক জোনাথন লেথেম বলেছেন, একজন লেখককে হতে হবে তার সময়ের সবচেয়ে অগ্রসর পাঠক।

আমাদের সৈয়দ শামসুল হক দাবি করেছেন, ক্ল্যাসিক লেখকদের লেখা পড়ে তিনি টের পেয়ে যান, ওই লেখক কোন অধ্যায়ের পর কোন অধ্যায় লিখেছেন, কোথায় কলম থামিয়ে ওই দিনের মতো বিরতি নিয়েছেন। মনিরুল ইসলাম নিশ্চয়ই এসব পাঠপঠন জানার বাইরে নন। আর স্টাইলটি তার নিজস্ব সৃষ্টি। তার বাড়তি আরও কিছু চর্চা ছিল। তা পড়াশোনার ক্ষেত্রেও।

১৯৭০ সালের ১৫ জুন গোপালগঞ্জে জন্ম নেওয়া মনিরুল ইসলামের লেখাপড়ার চৌহদ্দীও বিস্তর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাড়িয়ে তার দিগন্ত আরও নানা দিকে। ২০০১ সালে সিএমপি এবং ডিবিতে এসি হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই তার সাংবাদিকদের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী সাংবাদিকতা পেশায় যুক্তদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। একপর্যায়ে ২০১০ সাল থেকে ডিএমপির মুখপাত্রের দায়িত্ব বর্তায় তার ওপর। পেশাগত এ দায়িত্বের সুবাদে মিডিয়া জগতের দিকপাল থেকে একেবারে নবীন সংবাদকর্মীর সাথেও যোগাযোগ হয়। যা পেশাগতভাবে তাকে সমৃদ্ধ করেছে। সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণে আত্মোৎসর্গকারী পুলিশ সদস্য ও সন্ত্রাসবাদের শিকার দেশি-বিদেশি নিরীহ মানুষকে উৎসর্গ করা ধ্রুব এষের প্রচ্ছদে বর্ণবিন্যাসের প্রকাশিত বইটি পড়েছি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। শুধু পড়ে-ই শেষ হয়নি। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে, আমাকে দুই দুইবার-(পথভোলা পথিকেরা) বারবারই টেনে নিয়ে গেছে বইয়ের জালে জড়িয়ে আবদ্ধ করে নেয়।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বেড়ে ওঠা, সদস্য সংগ্রহ, পলাতক-ফেরারি জীবন, জীবনবাজি রেখে অভিযানসহ নানা পর্ব নানা নামে তুলে আনা বড় কঠিন কাজ। কেবল তিনশ টাকা উশুল নয়, বইটি অনেক অজানা সম্পর্কে ধারণা দেবে, যা সচেতন যে কারও জন্যই জরুরি। বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা ও পাতা ভাবনার-উপলব্ধির অনেক খোরাক জোগাবে পাঠকদের।

মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিকী তালুকদার, প্রকাশক বাংলাদেশ জ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নতুন বই পেল মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ২৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী

ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আরশাদুর রউফ

বলিউড-দক্ষিণী তারকাদের চোখে নতুন বছর

জানুয়ারি মাসের এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের তারিখ জানাল বিইআরসি

বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে যাবেন জামায়াত আমির

এনসিপির মিডিয়া সেল সম্পাদকের পদত্যাগ

আবেদন করে পদ ফিরে পেলেন বিএনপি নেতা

সুসংবাদ পেলেন বিএনপি নেতা

মুনাফার হার আরও কমলো, কোন সঞ্চয়পত্রে কত

স্থাবর সম্পত্তি নেই হান্নান মাসউদের, বাৎসরিক আয় যত

১০

পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা বিনিময় করল পাকিস্তান ও ভারত

১১

বরিশালে ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয় ভাঙচুর, মালপত্র লুট

১২

এনইআইআর চালুর প্রতিবাদে বিটিআরসি ভবন ভাঙচুর 

১৩

বেলারুশে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক মিসাইল মোতায়েন

১৪

নতুন বছরে বিশ্বনেতাদের বার্তা

১৫

নদীর বুক চিরে উঠে আসছে ড্রাগন, নববর্ষের ব্যতিক্রমী আয়োজন

১৬

নতুন বছরের জন্য কিছু স্বাস্থ্যকর প্রতিজ্ঞা

১৭

জকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা

১৮

মুন্সীগঞ্জে বিএনপির দুই নেতার মনোনয়ন বাতিল

১৯

অভিজাত নববর্ষ পার্টিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত বহু

২০
X