

চাই শুধু ক্ষমা
উৎসর্গ : কবি মির্জা গালিব
দুয়ারে পাওনাদার অভাবের সংসার তবুও তো জন্মদিন আসে- নিভৃতে ঝড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধতার শেকলের ধ্বনি নতুন বোধন উজ্জীবিত করে ভেতর-বাহির। শায়েরের স্রোত এসে খুলে দেয় মগ্নতার দ্বার জন্মদিন ভাবনায় তাই গালিব অনাড়ম্বর। ঘরের গৃহিণী ভাবে-বয়স হয়েছে ঢের কীর্তি রেখে কবি কবে চলে যায়। যাঁর শায়েরে আলোড়িত পৃথিবীর ভাবুক হৃদয়- তাঁর জন্মদিনে আনন্দ হবে না কোনোদিন তাও কি মানায় ! উপায় না দেখে বউ কাবুলীওয়ালার ঋণে কবিকে শেরওয়ানী দেয় উপহার নিরন্নের সংসার-উনুন জ্বলে না তবু, পত্নীর সাধ মেটে ! গালিবের ঠোঁটে পরিহাসের হাসি- দিকচক্রবালে ফুটে ওঠে নন্দনের দারিদ্রচক্র-কাবুলিওয়ালার সুদবন্দি জনম। পত্নীর মুখে আনন্দ ঝর্ণা, চোখে সুখের কারুকাজ তাবত্ পৃথিবীর নওশাহ তার স্বামী ! গালিব চুপি চুপি বলে-ঋণের অনিবার্য পথের পথিক আমি উপহার কেনার জন্য সে পথে নেমেছে প্রিয়তমা সাধের জন্মদিনে সাধ্যের চৌকাঠে চাই শুধু ক্ষমা।
২. গালিবের সমাধির পাশে
দিল্লি অনেক দূর! তবু চলি শায়েরের জোসে। শেষ সম্বল বেচে দিয়ে আকাশ যানে উঠি। মাটির টান কাটিয়ে শন্যে ভাসি, নিচের পৃথিবী ছেড়ে অনন্তের টানে। নিঃসীম নীল পেরিয়ে পশমিনা গিলাপ-আগরের ঘ্রাণে ঢাকা সমাধি। কী এক আলোতে দেখি দর বসন্ত দিন। হাস্যোজ্জ্বল চোখের সংকেত। একই পানশালায় ওঠে অনিবার্য গুঞ্জরণ। নানান রসের পেয়ালায় বিনিদ্র রাত। গালিবের সমাধির পাশে মুসাফির...। মসজিদের মিনার-সেতু-উদ্যান-পাহাড়ের চূড়া-উন্মুক্ত স্কয়ার। নীল পরিসিক টালির গম্বুজ যেন নীল পদ্মের কুঁড়ি। শায়ের সে তো নয় শুধু সুর-বাণীর মর্মভেদী উচাটন। অথচ, আমরা উপোস ভাংতে গিলি কতোসব ছাইপাশ...। হালকা মেঘ ছোঁয়া আকাশের ঘন নীল। পড়ে আছে রুটি মদ-স্বাদের কাবাব।পাখির পালকের মতো ভাসা সুস্বাদু পোলাওর ঘ্রাণ...। ভেসে যায় ইরানী স্থাপত্য- চোখ ধাঁধানো মোগল ঘরানা। কপর্দকহীন ঝুলিতে পুরে নেই কবিতার থীম... বুকের জানালায় বায়েতের যপমালা... আনন্দ রোশনাই।
৩. বসন্তের আরেক নাম ভালোবাসা
কেউ তাকে বলে উড়নচণ্ডী অধরা স্বপ্নমালা তার কারণেই বুকে ফুসে ওঠে ছোপ ছোপ হৃৎজ্বালা। কেউ বলে তাকে মানসিক রোগ ছলাকলা দুর্ভোগ তার কারণেই পাষাণ হয়েছি বুকে পুষে রাখি শোক যার শক্তিতে রামধনু সাথে দোলনায় খাই দোল তার কারণেই কলবের ভাষা রাধা রাধা নাম বোল। কেউ বলে তাকে গন্ধম ফল আস্বাদনের মূল তার কারণেই কত সম্রাট রাজা হলো নির্মূল। কেউ বলে বড় স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর নিয়ামক তার কারণেই বিশ্ব বিধান রচিয়েছে বিধায়ক। যার শক্তিতে নরকের কীট পেয়েছে স্বর্গ জ্যোতি তার কল্যাণে বারবণিতার জুটেছে পরম পতি। যার নিমিত্ত স্নান নদী বয়ে প্রাণে প্রাণে আসে সুখ তার জন্যই মার কোল জুড়ে চাঁদ নামে টুকটুক। যত সুকুমার বিত্ত বেসাত আমাদের অর্জন তার সুষমায় পৃথিবীতে থামে অসুরের গর্জন। তাকে পেতে সব কবিইতো হয় নিখাদ কাব্য চাষা খোদার কসম আমি তাকে চিনি তার নাম ভালোবাসা।
৪. যুগল চলা
দিগন্ত জোড়া মাঠের মধ্যে বিল পেরিয়ে যখন আমরা গাঁয়ের কাছে অমনি বৃষ্টি, দু’জনেই কাক ভেজা লাজুক তুমিতো পরিণাম ভেবে সারা। আমি বললাম- ‘প্রকৃতিই সাজিয়েছে সরিসা ফুলের গায়ে হলুদের দিন। হলুদ শাড়ির মস্ত গালিচা দেখো, হলুদিয়া পাখি ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায়। শত বাঁধা শেষে আমাদের এই হাঁটা দু’জনই পরাগ মাখলাম সারা গায়। আমাদের স্নান করানোর দায় ভার মেঘ বালিকারা সানন্দে কাঁধে নিলো। তুমিই বললে- চৈত্রের শেষভাগে খরতাপ জরা জীর্ণ ঘুচিয়ে দিয়ে এই বৃষ্টিই আনলো নতুন দিন অঙ্কুর উৎগমে নব কিশলয় নতুন জল ও আলোর বীক্ষা নিয়ে সুশোভিত হবে পত্র ও পল্লবে। আমি বললাম-‘তার আগে আমাদের বেছন বোনার পালা, শেষ করা চাই এসো দুইজন মিলি, সৃজনের গানে বিরল পঙক্তি বাঁধি সৃষ্টির জলে। তারপর সব কবিই নীরব থাকে পরস্পরের অবাধ্য পথ চলা ভেতরে বাইরে সৃষ্টি জলের স্রোত বৃষ্টি নেমেই স্বর্গ সুখের ধারা।
৫. তোমাকে দেখেছি যত
তোমাকে দেখেছি যত আনন্দ বেড়েছে তত দেখবার সাধ তাই করিনা দমন সুখঝাঁপি ভরে রাখি সারাদিনক্ষণ মনে মনে ছিল শুধু ব্রত তোমাকেই দেখি যেন রাজহংসীর মত বসন ছাপিয়ে শুধু তুমি বিকিরিত সৌন্দর্যের ভূমি চলেছ মহাঐশ্বর্যের পানে আমি শুধু মগ্ন হই মুখরিত গানে লাবণ্যপ্রভা ছড়ায় মাথার মুকুট বসন্তবাহারে নাচে পুষ্প কালকূট কবরীতে চন্দ্রমল্লিকার মালা পুলকে রাঙাও বনবালা রাঙারাজকন্যা আগুন লাগাও মনোবনে সেই স্মৃতি জেগে ওঠে প্রতি ক্ষণেক্ষণে শতাব্দীর জাগরী এ চঞ্চলচোখ আমি শুধু লিখে চলি অসীম শ্লোক পোড়ামন আনন্দেই উদ্বেলিত হয়ে ওঠে বসন্ত কিশলয় ফোটে সূর্যকে না পাওয়া সূর্যমুখী সমাচার আমি শুধু মানি নাই হার পতঙ্গের আত্মহুতি দেয়ার কোরাস এইভাবে জমে ওঠে বিরহের চাষ মরতে মরতে লিখি বুলি অনিবার্য কাব্যের ঝুলি কুহকের পিছে ছুটি অক্লান্তকর আঁকড়িয়ে ধরি যত কুটো আর খড় দাঁতে দাঁত রেখে করি দীর্ণ কবিতার সংসার হয় শুধু জীর্ণ আশার বসতি গড়ি রিক্ততায় ময়ূর সিংহাসন যদি করি সঞ্চয় বরমাল্য পাইবার সাধ বারে বারে হয় যে শুধু ধূলিস্যাৎ।
৬. লাল রং
জীবনের প্রতিটি সংগ্রাম লালরঙ সাহসিকা সূর্যোদয়ের নতুন বার্তা পায় যে অবন্তিকা। ফিকে জীবনকে বর্ণিল করে প্রাণসঞ্চারী লাল প্রেমমুগ্ধতা উষ্ণতাবহ সিদুররঙার কাল। লাল-পোলাপের শুভেচ্ছাতে উদ্দীপনার ক্ষণ লালের চমক হৃদয়ে সাহস জোগায় অগণন। লাল রং এক গল্পের মতো যার প্রতি অধ্যায় ভালোবাসা আর উষ্ণতা-ছোঁয়া হৃদয়ে রাখিয়ে যায়। রক্ত-বর্ণ অমিত আত্মবিশ্বাসে এক নাম শিমুলরাঙ্গা-পলাশরাঙ্গা-গোলাপরাঙ্গা ধাম। বাতাসে রাঙ্গা ফাল্গুন এসে প্রণয়ের কথা কয় শরমরাঙ্গা মরমরাঙ্গা জীবনকে করে জয়। রাতুল রাঙ্গা ঠোটের মহিমা ভেতরে বাইরে রাঙে জীবনের গীত জমাতে শিল্পী আয়ুর ভিক্ষা মাঙে। বাংলাদেশের পতাকার রঙে শহীদের রক্ত সবুজ শ্যামল ফসলের হাসি প্রাণে আনে প্রেম অক্ত।
৭. দেশে দেশে ভাষার মিনার
মায়ের মুখের বোলকে রাষ্ট্র ভাষা রূপে দিয়ে স্থান বুকের শোণিত ঢেলে ভাষা শহীদেরা মনে জাগে সেই স্মৃতি বুকে ধরে বিশ্ববাসী জাগে অনুরাগে পৃথিবীর সব পথে তারা চির-অক্ষয় অম্লান। রফিক শফিক আর বরকত জব্বার ঐ ভাস্বর ভাষা সংগ্রামীরা স্বাধীনতা এনে রাখে বহমান বিশ্বের মানচিত্রে দেশ জাতি পতাকা মুক্তির গান তাঁদের প্রেরণা নিয়ে বধ করি গ্রাসী অজগর।
বাংলার সূর্যসেনা ধরে আছে বিজয়ের হাল ভাষাজাতি অধিকার ফিরে হবে গ্রহণের কাল বুক ভরে দেশমাতা যুগিয়েছে অমরতা প্রাণ তাই চিরজীবী হলো একুশের রোদ্দুরের ঘ্রাণ। ভাষার মিনার তাই দেশে দেশে জেগেছে আবার জীয়ন কাঠির ছোঁয়া দূর করছে সকল আঁধার।
পৃথিবীর পথের রোদ্দুর
জাতির আত্মার স্বর-বর্ণমালা প্রিয়ংবদা রাধার মুখে মধু সিঞ্চনে কানে সুধা ঢালে। বুকের স্পন্দনে মায়াবি বিতানের রাগ রাগিনী শিশুর আধো আধো বোলে স্বর্গের সাম্পানে যাবে। জাগরণ কথার সংকীর্তন প্রিয়জন দিল আদরের ভাষা প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-উৎফুল-স্তবে। মূর্তমান অনুভূতি রক্তচক্ষু ডিঙালো। মুখ সেলাইয়ের সোনামুখি সুঁই.. বয়নশিল্পে তেজস্বী ডলারের গান। ফ্যাশব্যাকে লৌহশাসন ভাঙার স্মৃতি রক্তবীজ হয়ে পতাকায় জেগে উঠল। গ্লোবের বুকে বাংলাদেশ হীরার দ্যূতিতে জ্বলজ্বল করছে.. একটি উদীয়মান বাঘ পৃথিবীর পথে ক্রমশ রোদ্দুর..
কবি পিরিচিতি : যে বিষয়ে লেখেন : কবিতা ও গদ্য জন্মতারিখ, বছর ও জন্মস্থান : ০৬-০৯-১৯৬৫, নারায়ণপুর, মুকসুদপুর, গোপালগঞ্জ, বাংলাদেশ।
প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা : ১১টি কবিতার বই ও ০১টি গল্পের বই।
মোবাইল : ০১৯২৪ ৯৪০ ২১৭ ইমেইল : [email protected] সম্পাদক: ম্যাজিক লন্ঠন