

শানথুয়াই
উচিংথুয়াই কোচিং খোলেন ব্যস্ত শহর ঢাকা, নেন হাতিয়ে এদেশ থেকে বোস্তা ভরে টাকা! বাংলা ভায়ার বিপরীতে চায়না ভাষা শেখান, ইলেকট্রনিকস মিডিয়াতে যন্ত্রপাতি দেখান।
অটোরিকশার ফটোকপি কম্পুটারের ফাইল, ইন্টারনেটে চালান করেন লক্ষ-হাজার মাইল। তার কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে শম্ভুনাথের কাকু, চায়না ভাষা আওরিয়ে যান "নিহাওমা-বারাকু"?
‘চোনালি পং, উকি-সুকি মা-বুফাংকি উকু’, কাকুর সাথে যায় মিলিয়ে কাকাতো বোন খুকু। ‘হিয়াং-হুয়াং, জিয়াং-জুয়াং’ শব্দ হযবরল, এই ভাষাটা আমার কাছে বড্ড লাগে গড়ল!
কিন্তু আমি গড়লটাকেই সরল মনে করি, ভেবে চিন্তে শম্ভুনাথের কাকুর রাস্তা ধরি। কাকুর সাথে চিন-এ যাবো করছি মহা-পন, তাই কোচিংয়ে ভর্তি হয়েই ব্যস্ত সারাক্ষণ।
উচিংথুয়াই ভিসা দেবেন ভাষা শেখার পরে, নিয়ম মতো টাকা যতো দিলাম তাকে ধরে। উচিংথুয়াই চিন থেকে-এক আনেন কাজের বুয়া, সেই মহিলা নাম দেয় আমার শানথুয়া-মানথুয়া!
একদিন যে ঢাকা থেকে উধাও উচিংথুয়াই, চিন-এর নেশায় হায়রে আমি লক্ষ টাকা খুয়াই...! শান্তু থেকে হলাম শেষে আমি যে শানথুয়াই, সব হারিয়ে আজকে আমি ভাঙা বাঁশি ফুয়াই।
মাথা খারাপ
টিভি ভাঙে ফিরিজ ভাঙে মটকা গাছের ডাল দিয়ে শ্বশুরবাড়ির খাট’টা ভাঙে দাপুর-দুপুর ফাল দিয়ে!
ভাঙে ঘরের দেয়াল-শোকেস কাঁচের বাসন, চায়ের কাপ বিছনাপাটি ছুড়ে ফেলে দেখায় আজব লম্ফ-ঝাঁপ!
ঘটি-বাটি উড়িয়ে মারে সঙ্গে বউয়ের সোনার হার সবার দিকে তাকিয়ে বলে আসবি না কেউ খবরদার!
তীব্র রাগে গোত্তা দিয়ে শরীরটা নেয় ঝাঁকিয়ে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে সবাই হাসে তাকিয়ে।
অবশেষে এক ঘুষিতে ভাঙে বউয়ের মাড়ির দাঁত ঠিক তখনই পুলিশ এসে করলো তাকে কুপোকাৎ।
যাবোই না আর গাইবান্ধা
পথের ধারে চেয়ে দেখি পিঠ মোচড়ে ভাই বান্ধা, বাচ্চা হওয়ার আগেই ফুলির গাছের সাথে দাই বান্ধা!
মাছের ঘেরে রঙ-তামাশা লগ্গির আগায় চাঁই বান্ধা, ঘর পুড়েছে খড় পুড়েছে বোস্তা ভরা ছাই বান্ধা!
জল কবিরাজ সিঁড়ি কোঠায় ধুন গাজীরে পাই বান্ধা, লগ্নিচূঁড়ায় হেড মাষ্টারের শার্ট-প্যান্ট আর টাই বান্ধা!
আমিই কেবল মুক্ত স্বাধীন হাত-পা আমার নাই বান্ধা, শত্রু দেখে দৌড়ে পালাই যাবোই না আর গাইবান্ধা!…
হান্দেন
বান্দি ঘরে, চান্দি গরম স্ত্রী তাই কান্দেন, রাত দুপুরে বান্দিসহ স্বামীর দু'হাত বান্দেন।
হাতে নিয়ে জুতা-ঝাটা ফাটান মেয়ের নরম গাটা গরম স্বরে বান্দিটাকে বটির আগায় টান দেন...
মনের দুঃখে স্ত্রী ফের নিজেই নিজের জান দেন... হেই কারণেই গৃহকর্তা জেলের ভেতর হান্দেন!
নিজেকে ভাবি না তবু
আমি এক ছড়াকার আগা থেকে মূল নই আমি সুকান্ত...কবি-নজরুল। আমার বাগানে ফোটে রকমারি ফুল কামেনি হাসনাহেনা গোলাপ বকুল।
বুকে নেই যন্ত্রণা...আহ্ কিবা উহফ্ নেই বড় দাড়ি আর ইয়া বড় গোফ। স্বতন্ত্র ছাড়া আজ নেই কোন দাম, তাই আমি সংগ্রামী নতুন এক নাম।
আমার ভাষাটা শুধু জোর প্রতিবাদ.... আমার মগজ-খাঁটি ছড়ার আবাদ। আমিই আমার মতো সেরা কবিজাত; নিজেকে ভাবি না তবু রবীন্দ্রনাথ...
হাত বাড়ালেই সুখ
স্নিগ্ধ কোমল ভোরের আকাশ মন মাতানো সব কিচির মিচির পাখির সুরে সতেজ অনুভব... থোকায় থোকায় ফুল কলিরা হয় যেনো উম্মুখ; যেদিক তাকাই সেদিকটাতেই হাত বাড়ালে সুখ!
মধ্য দুপুর পদ্যাকারে দিচ্ছে যখন ডাক তখন আমার ধানের ক্ষেতে প্রজাপতির ঝাঁক মনের ভেতর তাই পুষিনা হরেক রকম দুখ; মন ফেরাতেই তাকিয়ে দেখি হাত বাড়াতেই সুখ।
বিকেলটাতে খেলার মাঠে শিশুর দাপাদাপি বন বাদারে আনন্দ আর বড্ড লাফালাফি শিশুর মেলায় তাই হয়ে যাই নজরুলে নজরুখ.... ঠিক তখনও কেবল আমার হাত বাড়াতেই সুখ।
মা ডেকে যান সন্ধাবেলায় কইরে খোকা কই মুরগী ডাকে কক্ করাকক হাঁস ডাকে তই তই বৃদ্ধা দাদী কাশতে থাকে খুকুর খুকুর খুখ; তারপরেও দেখছি আমি হাত বাড়াতেই সুখ।
এমনি হাজার সুখ পাখিরা দেয় আমাকে নাড়া রাত গভীরে ঘুমের ঘোরে স্বপ্নরা দেয় সাড়া উচ্ছ্বাসিত ভাবনারা সব দেখায় প্রিয় মুখ; তারপরেও দেখছি তাতে হাত বাড়াল…
কালান্তর
(কবি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার ছায়া অবলম্বনে)
বলো মন বলো উন্নত জনগণ... মন প্রবাহে জনসমুদ্রে দেশময় আলোড়ন.... বলো মন...!
বলো গাদ্দার যত গাদ্দারি তত নষ্টের মূলে মাথা অবনত ভ্রষ্টের দলে দেখি কোলোহলে কঠিন শব্দ রণ... বলো মন! বলো উন্নত জনগণ।
বলো, নীতিভ্রষ্ঠ পথের শুমারী পথ যে অনেক দূর শ্যামলীমার ওই প্রান্তরজুড়ে পাখি গায় সুমধুর.... সাদা কাননের শ্রভ্র পরশে কেঁদে ওঠে ফুলবন বলো মন।
বলো, দাম্ভিকতার যুগের সিঁড়িতে চলছে ভাঙন আজ পথের সৈন্য দুধার দুপাশে করছে কুচকাওয়াজ চারদিকে সব নীরব নিথর তুমুল কষ্টক্ষণ ; বলো মন.... বলো উন্নত জনগণ..!
আমি শাহ জালাল ও শাহ পরানের দীপ্ত আলোর সুর আমি আলোচিত আর আলোরিত এক আঁধার করেছি দূর আর বুঝেছি কেবল বুঝের নীতিতে দমি নাই অকারণ... বলো মন... বলো উন্নত জনগণ।
আমি নজরুলে নই, রবীন্দ্র কী? বঙ্কিম ইশ্বর খোদার কসম, অন্তরে নেই কারও প্রতি ভয়-ডর আমি জীবনানন্দ দাশের বলয়ে জসীম উদ্দিন হই.... আমি মধুসূদনের গর্ব ধরেই বুক পেতে কথা কই... তাই বুকে নেই শিহরণ; বলো মন- বলো উন্নত জনগণ।
আমি আল মাহমুদ, কবি সমুদ্র শামসুর রাহমান... আমি আপন মাটির বক্ষ জুড়েই রোজ করি সীনাটান... যত পন্ডিত মহাস্বর্গে তত পুজনীয় পুজো অর্ঘ্যে যেন নিস্তার খুঁজি বিস্তার রোধে আমি এক মহাজন; বলো মন বলো উন্নত জনগণ।
আমি পদ্মা মেঘনা যমুনার হাসি পাহাড় দৃশ্যমান... আমি স্বজাতির বুকে একটা স্বদেশ সত্যের ফরমান আমি টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া আর দেশময় আলোড়ন... আমি ইতিহাস ধরে মহা ইতিহাস ঐতিহাসিক রণ.... বলো মন বলো উন্নত জনগণ।
আমি গোলা বারুদের ক্ষেত্র নিধনে এনেছি বরফ-জল... আমি আগুনের সুরে চাই না আওয়াজ চাই না তো কোলাহল। বুঝি সভ্য শান্ত ভদ্র বিনয়ে ঘটে যাওয়া অনুক্ষণ.... বলো মন বলো উন্নত জনগণ।
আমি পৃথিবীর মহা জঙল করি সাফ আমি মঙল করি অধর্ম আর নীতিহীন অভিশাপ আমি জ্বালাময়ী নই, যাত হই চাই উম্মাদ থেকে দূর আমি পৃথিবী সাজাই নিজের মত, শান্তিতে ভরপুর। হই না বেহুশ হুশহীন জাতি অন্ধকারে জালাই যে বাতি হই না তো কদাচন বলো মন... বলো উন্নত জনগণ।
বলো দূরের পৃথিবী আমার তো নয় সূরের তেপান্তর স্বার্থের মোহে ভোগ আলাপনে দেখিয়াছি মধুকর... আমি শান্ত অবুঝ বোকার পৃথিবী কেবলই দেখতে চাই.... আমি বরাক জমানো বুকের পাজরে শীতলের ছোঁয়া পাই খুঁজে ফিরি নির্জন ; বলো মন বলো উন্নত জনগণ।
আমি বিদায় বেলার সম্মানিত বিপুল শ্রদ্ধাশীল আমি বাংলার বুকে গড়েছি বেহেস্ত স্বর্গীয় মনজিল... এদেশ আমার হাতের কামাই ছপে যাই দেহ-মন; বল উন্নত জনগণ।
কবি পরিচিতি : নজরুল ইসলাম শান্তু এ সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ ছড়াকার। বিভিন্ন বিচিত্র বিষয়ে তাঁর কলম এগিয়ে চলে দুর্নিবার ভঙ্গিতে। সমকালীন যেকোনো প্রসঙ্গকে তিনি তার ছড়ায় মোহনীয় ভঙ্গিতে উপস্হাপন করতে সমর্থ। এই বিচিত্র বিষয়ের অন্যতম শিশুসাহিত্য। মাঝেমধ্যে প্রতিবাদী ছড়ার ঝংকারে মেতে ওঠেন বিভিন্ন ছড়া-কবিতার মঞ্চে। মজার বিষয় হচ্ছে, নজরল ইসলাম শান্তু এ যাবৎকাল যতগুলো ছড়া নির্মাণ করেছেন, তার প্রায় পঞ্চাশভাগ ছড়াই মুখস্থকর । বলা চলে, এশিয়া মহাদেশের মধ্যে তিনিই একমাত্র ছড়াকার যার শত শত ছড়া নিজেই মুখস্হ বলতে পারেন ঝড়ের গতিতে।
দেশের সুপ্রতিষ্টিত এ লেখকের জন্ম ১জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানাধীন গুলমাইজ গ্রামে। পিতা- মীর আব্দুর রশিদ,মাতা-বেগম হালিমা রশিদ, স্ত্রী-ইসমাত আরা ঝিনুক, সন্তান-মীর হাসান মাহমুদ সুপ্ত ও মীর রিদোয়ান আহমেদ নিঝুম । সাতভাই ও তিন বোনের …