কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে দাতার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) শনাক্ত না করে একাধিক ভুয়া এনআইডি নম্বরে দলিল রেজিস্ট্রি, প্রতি দলিলে বাড়তি টাকা নেওয়া, খাজনা দাখিলা ছাড়া দলিল রেজিস্ট্রি, সমিতির আইনের তোয়াক্কা না করে একাধিক সমবায় সমিতির দলিল রেজিস্ট্রিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া দাতা সাজিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করায় নুরজাহান বেগম নামে ভুক্তভোগী এক নারী কুমিল্লার আদালতে দলিল লেখক কামরুল ইসলাম ও গ্রহীতা নাছির উদ্দিনসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে সাব-রেজিস্ট্রারের অনিয়ম তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ভুক্তভোগীসহ সাধারণ মানুষ।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, নাঙ্গলকোট উপজেলার মক্রবপুর গ্রামের নুরজাহান বেগমের পিতা চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ছাতিয়ানী গ্রামের রুস্তম আলী ২৩ বছর আগে মারা যান। নুরজাহান বেগম পৈতৃক ওয়ারিশ সূত্রে ছাতিয়ানী মৌজায় আরএস ২৫৪ এবং বিএস ৫৩৯নং খতিয়ানভুক্ত সাবেক ৪৭ হালে বিএস ৫৮নং দাগে ২১ শতক ভুমির মালিক এবং দখলদার হন।
চলতি বছরের ২১ জুলাই ছাতিয়ানী গ্রামের ইদর আলীর ছেলে নাছির উদ্দিন মজুমদারসহ কয়েকজন ওই ভূমিতে দাঁড়িয়ে বলে তারা সেটি খরিদ করেছে। এরপর ২৬ জুলাই নুরজাহান বেগম চৌদ্দগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি চালিয়ে দেখতে পায়, ১৯ জুলাই নাছির উদ্দিন মজুমদারকে গ্রহীতা এবং নুরজাহান বেগমকে দাতা দেখিয়ে জাল দলিল (নং-৬৬৯৬) রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। নুরজাহান বেগম ওই তারিখে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত ছিলেন না, স্বাক্ষর করেননি, টিপসই দেননি, টাকা গ্রহণ করেননি, দলিল হস্তান্তর করেননি এবং সাব কবলা দলিলও সম্পাদন করেননি। ভিন্ন কাউকে দাতা সাজিয়ে ভুয়া এনআইডি, ছবি ও ভুয়া স্বাক্ষর দিয়ে জাল দলিল তৈরি করা হয়েছে। এর আগে ১ জুন নুরজাহান বেগমের বোন জোসনা বেগমকে দাতা সাজিয়ে জাল দলিল (নং-৫১৩২) তৈরি করে নাছির উদ্দিন মজুমদার। ওই দিন জোসনা বেগম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাননি, স্বাক্ষর করেননি, কোনো দখল হস্তান্তর করেননি এবং দলিল সম্পাদন করেননি। এই দুটি ঘটনা উল্লেখ করে নুরজাহান বেগম বাদী হয়ে গত ১০ অক্টোবর দুটি জাল দলিলের গ্রহীতা মুন্সিরহাট ইউনিয়নের ছাতিয়ানী গ্রামের ইদর আলীর ছেলে নাছির উদ্দিন মজুমদার, দলিলের সাক্ষী একই গ্রামের মৃত আলী মিয়ার ছেলে শেখ ফরিদ, দলিলের শনাক্তকারী একই গ্রামের মৃত চৌধুরী মিয়ার ছেলে আবদুল মান্নান, একই গ্রামের নজির আহাম্মদের ছেলে মওদুদ মজুমদার, পার্শ্ববর্তী মরকটা গ্রামের শহিদুর রহমানের ছেলে মো. ইয়াকুব এবং দলিলের লেখক বাতিসা ইউনিয়নের পাটানন্দী গ্রামের মৃত খোরশেদ আলম ভেন্ডারের ছেলে কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালত সিআইডিকে মামলাটির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন সূত্র ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে বিশেষত দাতাগণের এনআইডির মূলকপি অথবা অনলাইন যাচাই কপি দেখে দলিল রেজিস্ট্রি হয়। কিন্তু কালবেলার প্রতিবেদকের হাতে মামলার কপি, দলিল ও ভুক্তভোগী এবং মামলায় অভিযুক্তদের রেকর্ড বক্তব্য প্রমাণসহ থাকা ৩টি দলিলের দাতাগণের এনআইডি রয়েছে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে দেখা যায়, এনআইডিগুলো ভেরিফাই হয়নি। অর্থাৎ দলিলে ব্যবহৃত এনআইডি নম্বর ভুল। ভুক্তভোগী দলিলের দাতারা অভিযোগ করেন, সাব-রেজিস্ট্রার জেনেশুনে এসব দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন।
দলিলের দাতা জোসনা বেগমের বোনের ছেলে বাচ্চু মিয়া বলেন, ১ জুন ২০২৩ তারিখে কোনো দলিলে জোসনা বেগম স্বাক্ষর করেননি। এমনকি ১৯ জুলাই আরেকটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিলে তার খালা মোসা. নুরজাহান বেগমকে দাতা বানানো হয়েছে।
দলিলের দাতা নুরজাহান বেগম বলেন, ১৯ জুলাই ২০২৩ তারিখে কোনো দলিলে আমি স্বাক্ষর করিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চৌদ্দগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মচারী বলেন, ‘সমিতির দলিল, যে কোনো ঝামেলার দলিল রেজিস্ট্রির বিষয়টি সম্পূর্ণ সাব-রেজিস্ট্রারের এখতিয়ার। এখানে অফিসের অন্য কারও কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে সাব-রেজিস্ট্রার ওমর ফারুক এবং সংশ্লিষ্ট দুটি দলিলের লেখক কামরুল ইসলাম এনআইডি যাচাই করে দলিল সম্পাদন করেছেন বলে দাবি করলেও দলিলে প্রদত্ত দুজন দাতার এনআইডি নম্বর এবং জন্ম তারিখ অনলাইনের একাধিক সার্ভারে ব্যবহার করেও এনআইডি এবং জন্ম তারিখ সঠিক হিসেবে পাওয়া যায়নি কিংবা ভেরিফাই করা হয়নি।'
অভিযুক্ত দলিল লেখক এবং মামলার আসামি মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ছাতিয়ানী গ্রামের মওদুদ মজুমদার নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে সব কাগজপত্র ও ফি পেয়ে দলিল সম্পাদন করেছি। সাব-রেজিস্ট্রার কাগজপত্র যাচাই করেই দলিল রেজিস্ট্রি করেছেন।
বুধবার (৮ নভেম্বর) চৌদ্দগ্রাম সাব-রেজিস্ট্রার ওমর ফারুক বলেন, খাজনা দাখিলা ভেরিফাইয়ের নিয়ম থাকলেও অফিসে এনআইডি ভেরিফাইয়ের নিয়ম নেই। আমি কাগজপত্র দেখেই দলিলগুলো করেছি। তিনি আরও বলেন, আমি এ অফিসে আসার পর এখন পর্যন্ত সমবায় সমিতির দলিল রেজিস্ট্রি না করার জন্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক পাঠানো পরিপত্রের বিষয়ে আমাকে কেউ কিছুই জানায়নি। তাই অজানা সত্ত্বেও সমবায় সমিতির কয়েকটি দলিল অত্র অফিসে রেজিস্ট্রি করেছি। তা ছাড়া প্রতি দলিলে বাড়তি ১-২ লাখ টাকা গ্রহণের বিষয়টি সত্য নয়।
গ্রহিতা নাছির উদ্দিন মজুমদার বলেন, আমি প্রতারণার স্বীকার হয়েছি। বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা চলছে।
এ বিষয়ে সিআইডি, কুমিল্লা অফিসের এএসআই হাসান মাহমুদ জানান, নুর জাহান বেগম বাদী হয়ে আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। সিআইডি মামলাটির তদন্ত করছে।
এ বিষয়ে মামলার উকিল, কুমিল্লা জজকোর্টের এপিপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোশারফ হোসেন বলেন, নুরজাহান বেগম বাদী হয়ে জালিয়াতির মামলা দায়ের করেন। সিআইডিকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার পরবর্তী তারিখ ৩১.১২.২০২৩ই ধার্য করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন