মো. ওমর ফারুক, ভোলা
প্রকাশ : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪৬ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
আজ সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর

‘বাংলার মানুষ কাঁদো, ভোলার গাছে গাছে ঝুলছে মানুষের লাশ’

পৃথিবীর প্রাণঘাতী ঝড় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশের উপকূলে সংঘটিত ঝড় ‘সাইক্লোন ভোলা’। ছবি : সংগৃহীত
পৃথিবীর প্রাণঘাতী ঝড় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশের উপকূলে সংঘটিত ঝড় ‘সাইক্লোন ভোলা’। ছবি : সংগৃহীত

প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ভোলা সাইক্লোনের আজ ৫৫ বছর। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাংলাদেশের দক্ষিণা পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলীয় এলাকার ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। উপকূলীয় দ্বীপ ভোলা ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন চরসমূহের বহু এলাকার ঘরবাড়ি, গবাদিপশু নিশ্চিহ্ন হয়ে বিরান জনপদে পরিণত হয়।

ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতার কথা মনে করে আজও শিউরে ওঠেন অনেকে। ওই ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ভোলা এবং তৎকালীন নোয়াখালী উপকূলে। তৎকালীন নোয়াখালী উপকূলের রামগতি, হাতিয়া, সন্দ্বীপ এবং ভোলার মনপুরা ও পটুয়াখালী পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। সেই স্মৃতি বয়ে আজও যারা বেঁচে রয়েছেন কিংবা স্বজনদের হারিয়েছেন, কেবল তারাই অনুভব করেন সেদিনের ভয়াবহতা।

ধারণা করা হয়, সেই দুর্যোগে শুধু ভোলা জেলাতেই লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেদিন উত্তাল মেঘনা তেঁতুলিয়া নদী আর তার শাখা-প্রশাখাগুলো রূপান্তরিত হয় লাশের নদীতে। এজন্য একে ‌‘ভোলা সাইক্লোন’ও বলা হয়ে থাকে।

৭০-এর সেই ভয়াবহ সাইক্লোনের কালো রাতের কথা মনে হলে ধূসর স্মৃতিতে চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে বলে স্মৃতি রোমন্থন করেন কালের সাক্ষী ভোলার প্রবীণ সাংবাদিক এম এ তাহের। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন ভোলা সদর থেকে কলাগাছ দিয়ে ভেউর্কা বানিয়ে দৌলতখানে যাওয়ার পথে সারি সারি মৃত লাশ আর লাশ। লাশ বাঁশ দিয়ে সরিয়ে যাওয়ার পথে দেখেছি সাপ আর মানুষ দৌলতখানের চৌকিঘাটে জড়িয়ে পড়ে আছে। স্নেহময়ী মা তার শিশুকে কোলে জড়িয়ে পড়ে আছে মেঘনার পাড়ে। সোনাপুরের একটি বাগানে গাছের ডালে এক মহিলার লাশ ঝুলছে। এমনিভাবে মনপুরা, চরফ্যাশন, লালমোহন, তজুমুদ্দিন ও দৌলতখানসহ সমগ্র জেলায় মানুষ আর গবাদিপশু বঙ্গোপসাগরের উত্তাল পানিতে ভেসে গেছে। জনশূন্য হয়ে পড়েছিল দ্বীপ ভোলা।

সেই সময়কার প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভোলার সমস্ত জনপদ বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল আর নদীতে গবাদি পশুসহ বনি আদম সন্তান সারিবদ্ধভাবে পড়ে ছিল। তৎকালীন পূর্বদেশ পত্রিকার ভোলা প্রতিনিধি ও বর্তমান দৈনিক বাংলার কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক এম হাবিবুর রহমান প্রেরিত সচিত্র প্রতিবেদন ছিল ‘বাংলার মানুষ কাঁদো, ভোলার গাছে গাছে ঝুলছে মানুষের লাশ’। আর এ সংবাদ বিশ্ব জানতে পেরেছিল চার দিন পর। সেই চিত্রটি আজও ঢাকা প্রেস ইনস্টিটিউট-এ কালের সাক্ষী হিসেবে বাঁধানো রয়েছে।

৭০-এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের পর মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ধ্বংসযজ্ঞ ও বেদনাহতদের দেখতে আসেন ভোলা, এসব দৃশ্য দেখে শোকবিহ্বল হয়ে পড়েন তিনি।

প্রখ্যাত সাংবাদিক মরহুম এম সানাউল্লাহ্ নূরীর এক লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, (সত্তরের জলোচ্ছ্বাসের পর) ‘আমরা রামগতি বাজারের নিকটবর্তী চর এলাকায় পৌঁছালাম। সেখানে স্তূপীকৃত লাশ এবং মৃত গবাদিপশুর যে হাল দেখলাম, তা ভাষায় অবর্ণনীয়। রামগতি বাজারের একজন শৌখিন ফটোগ্রাফার আমাকে ফুলের মতো ফুটফুটে চারটি শিশুর ছবি দিয়েছিলেন। সেটি আমি ছেপেছি দৈনিক বাংলায়।’

তিনি আরও লেখেন, ‘আমি আমার পত্রিকার বিশেষ সংবাদদাতার দায়িত্ব নিয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে থেকে একটানা কয়েক দিন ঢাকায় দৈনিক বাংলার জন্য রিপোর্ট পাঠাচ্ছিলাম। এতে কাগজের প্রচার সংখ্যা ৩০ হাজার থেকে এক লাখে উঠেছিল। চট্টগ্রামে সে সময় এক টাকা দামের কাগজ পাঁচ-ছয় টাকা বিক্রি হচ্ছিল। আমরা চরবাদাম, চরসীতা এবং চরজব্বরে ধানক্ষেতগুলোতে নাকেমুখে লোনা পানি লেপ্টানো হাজার হাজার লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখেছি। সাগরে ভাসতে দেখেছি অসংখ্য লাশ। রামগতি, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা ও পটুয়াখালী পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। একটি গাছের ৩০ ফুট উঁচু মাথায় অসহায় দুর্গত কুকুরকে দেখেছি হাহাকার করতে। কোথাও পানি উঠেছে ৪০ ফুট ওপরে। গোটা উপকূল অঞ্চলে প্রায় অর্ধকোটি লোক মৃত্যুবরণ করেছে। ১২৮৩ সালের গোর্কির চেয়ে বহুগুণে করুণ এবং ভয়াবহ ছিল ’৭০ সালের গোর্কি। এর ধ্বংসলীলা তো আমরা নিজের চোখেই দেখেছি। সারা দুনিয়ায় সংবাদপত্রের প্রধান সংবাদ হয়েছিল এই প্রলয় ভয়াল দুর্যোগের খবর।’

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এ ঘূর্ণিঝড়কে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করেছে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে ১৩ নভেম্বর ভোর পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় প্রথমে ১৮৫ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানলেও পরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে তা ২০৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। এ বছর সেই প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের ৫৫ বছর পূর্ণ হলেও ভয়াল সেই ঝড়ের অর্ধশতাব্দী পর উপকূলের মানুষ এখনো অরক্ষিত, অবহেলিত।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ফুটবল খেলতে গিয়ে প্রাণ গেল স্কুলছাত্রের

কোস্টারিকা-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন

ভারতে অনুপ্রবেশের সময় নারী-শিশুসহ আটক ২১

হার্টবিট শোনা কি চিন্তার কারণ

বিএনপিতে যোগ দিলেন জামায়াত ও জাপার ৩ শতাধিক নেতাকর্মী

শিক্ষা সংস্কারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণদের যুক্ত করার আহ্বান ইউনেস্কো প্রধানের

নতুন জাতিসংঘ বানাচ্ছেন ট্রাম্প : ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট

ব্র্যাক ব্যাংকে চাকরি, থাকছে না বয়সসীমা 

ট্রাকচাপায় ইসলামী আন্দোলনের নেতা নিহত

চুয়েটে ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ

১০

চ্যাম্পিয়ন দল পেল ২ কোটি ৭৫ লাখ, তানজিদ-শরিফুলরা পেলেন কত টাকা?

১১

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এনসিপির অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা : রিজভী

১২

অস্ত্রসহ ছাত্রলীগ নেতা উজ্জ্বল আটক

১৩

প্রতীক পাওয়ার ২ দিন পর মাঠ ছাড়লেন প্রার্থী, হতাশ কর্মী-সমর্থক 

১৪

সুযোগ পেলে যুবকদের প্রত্যাশার বাংলাদেশ গড়ব : জামায়াত আমির

১৫

চট্টগ্রাম বন্দরে আয়ের ইতিহাস, সেবায় জট

১৬

দুর্বৃত্তদের গুলিতে ‘লেদা পুতু’ নিহত

১৭

রাজধানীতে ভবন থেকে পড়ে ব্যাংক কর্মকর্তার মৃত্যু

১৮

জলবায়ু সংকট / আসছে মাথা ঘুরানো গরম, ভয়ংকর কিছু বাস্তবতা

১৯

স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে পদ হারালেন মাসুদ

২০
X