ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৯ এএম
অনলাইন সংস্করণ

প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে উপকারী জগডুমুর

থোকায় থোকায় ধরে আছে কাঁচা-পাকা জগডুমুর ফল। ছবি : কালবেলা
থোকায় থোকায় ধরে আছে কাঁচা-পাকা জগডুমুর ফল। ছবি : কালবেলা

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার প্রকৃতিতে একসময় অতি পরিচিত ও উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ জগডুমুরের সহজেই দেখা মিলত। গ্রামের মানুষ এ গাছের কচি ফল সবজি হিসেবে রান্না করে আগ্রহভরে খেতেন। খাদ্য হিসেবেই নয়, নানা রোগের প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে জগডুমুরের পাতা, ছাল ও ফলের ব্যবহার ছিল বেশ জনপ্রিয় ও কার্যকর।

তবে সময়ের পরিবর্তনে বনজঙ্গল নিধন, বসতবাড়ি ও কৃষিজমি সম্প্রসারণ এবং উপকারী উদ্ভিদ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদটি। যার ফলে এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না জগডুমুর গাছ।

জানা গেছে, জগডুমুর বা যজ্ঞডুমুরের বৈজ্ঞানিক নাম ফিকাস রেসমোসা। এটি মোরাসেই পরিবারভুক্ত। এর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মালয়েশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া। এ গাছ ২৫ থেকে ৩০ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। এর পাতা আকৃতিতে অনেকটা লম্বাটে ও সুচালো এবং মসৃণ। এর বাকল পুরু। এর ফল গাছের কাণ্ডে থোকায় থোকায় হয়। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও কাঠবিড়ালি, বানর বাদুড় এ গাছের পাকা ফল খায়।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা জানান, একসময় উপজেলার বিভিন্ন খালপাড়, জলাশয়ের পাড়, বাড়ির পাশে, বাঁশঝাড় সংলগ্ন স্থান, পরিত্যক্ত জায়গায় ও বিভিন্ন কাঠ ও ফলদ গাছের সঙ্গে প্রচুর জগডুমুর গাছ ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রকৃতি থেকে জগডুমুর গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো এই উপকারী ভেষজ উদ্ভিদটি। তবে গ্রামীণ জনপদে এখনো বিভিন্ন রোগের প্রাথমিক চিকিৎসায় ডুমুরের ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে।

জগডুমুর একটি উচ্চমানের ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই লোকজ চিকিৎসা ও প্রাকৃতিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জগডুমুরের বিভিন্ন অংশ ও ফল পুষ্টি এবং ঔষধিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় এ গাছের পাতা, ফল, ছাল ও মূলসহ প্রায় প্রতিটি অংশের ব্যবহার রয়েছে। এ গাছের ছাল বেটে পেস্ট তৈরি করে মশা বা পোকামাকড় কামড়ানোর স্থানে লাগালে আরাম পাওয়া যায়।

এ গাছের ছাল সিদ্ধ পানি দিয়ে চর্মরোগ আক্রান্ত স্থান ধৌত করলে উপশম হয়। দুধের সঙ্গে ডুমুর সিদ্ধ করে প্রলেপ দিলে ফোঁড়া দ্রুত পাকে। এ গাছের পাতার গুঁড়া দিয়ে আলসারের ওষুধ তৈরি করা যায়। এ গাছের মূল ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা ইনসুলিনের প্রয়োজনীয়তা কমাতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এছাড়া অর্শ ও কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায়ও আয়ুর্বেদে এর ব্যবহার রয়েছে।

বেদানার তুলনায় ডুমুরে আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকায় এটি লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করে এবং অ্যানিমিয়া দূর করতে ভূমিকা রাখে। ডুমুরে থাকা ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ফসফরাস হাড় ও দাঁত মজবুত করে এবং অস্টিওপরোসিসের ঝুঁকি কমায়। এটি ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ায় হজমে সহায়তা করে, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে। এটি পেটের সমস্যা উপশম করে। পটাশিয়ামসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এতে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। এছাড়াও ক্ষুধামন্দা দূর করতে এর কাঁচা ফলের রস বেশ উপকারী।

উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের কান্দুঘর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মুলফত আলী (৭৩) বলেন, আমরা ছোটোবেলায় দেখেছি আমাদের গ্রামে অনেক জগডুমুর গাছ ছিল। আমাদের মা-চাচিরা ডুমুরের কাঁচা ফল রান্না করে আমাদের খাওয়াত। ফল পাকলেও আমাদের খাওয়াত। অসুখ-বিসুখ হলে কবিরাজরা এই গাছের ফল ও পাতা দিয়ে ওষুধ বানিয়ে দিতেন। ওই ওষুধ খেয়ে সে সময় আমাদের অসুখও সেরে যেত। আগের মতো এই গাছ আর দেখি না, এখন খুঁজে পেলেও খুব কম দেখা যায়।

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জামাল হোসেন বলেন, আগে বাড়ির আশপাশসহ বিভিন্ন স্থানে নিজে থেকেই জগডুমুর গাছ জন্মাতো। মানুষ জায়গা পরিষ্কার করে ফেলায় এবং উপকারী গাছ বিষয়ে সচেতনতার অভাবে এসব গাছ আর প্রকৃতিতে টিকে থাকতে পারছে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো এই গাছ চিনবেই না। জগডুমুরের মতো আরও বহু উপকারী গাছ আমাদের প্রকৃতি থেকে আমাদের অবহেলার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে।

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার (ইউনানি) ডা. মোহাম্মদ সোহেল রানা কালবেলাকে বলেন, জগডুমুর একটি অত্যন্ত উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ। এর ফলসহ বিভিন্ন অংশ নানা রোগের চিকিৎসায় বহুকাল আগে থেকেই প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এ গাছসহ বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের যেকোন অংশ সরাসরি ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

তিনি আরও বলেন, সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন প্রকৃতি থেকে জগডুমুর গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। এ গাছ সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন হতে হবে, তা না হলে উপকারী এই ভেষজ গাছটি আমাদের প্রকৃতি থেকে একসময় পুরোপুরিভাবে হারিয়ে যেতে পারে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মাথার পেছনের অংশে ব্যথা হয় কেন, এটি কীসের ইঙ্গিত?

আদ-দ্বীন হাসপাতাল ছাড়লেন ১৭৩ রোগী, ভর্তি বন্ধ

বাজেটে এত বড় ছাড় অতীতে দেখতে পাইনি : মির্জা ফখরুল

ওসমানীনগরে আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী তৎপরতার অভিযোগ

‘বাংলাদেশের মেধা পাচার হয়ে যাচ্ছে’

ভারতে সম্পত্তির মামলায় হেরে প্রকাশ্যে বাবাকে হত্যা করল ছেলে 

৮৯ দিনে হাম ও উপসর্গে ৬৪৩ জনের মৃত্যু 

সরকারি কর্মকর্তাদের আয় বাড়লে দুর্নীতি কমবে : অর্থমন্ত্রী

২০২৬ সালের সবচেয়ে নিরাপদ ৫ দেশ

চলতি বছরই আসছে ‘সুড়ঙ্গ-২’ সিক্যুয়েল

১০

টাকা দিয়েও খেলা দেখা যাচ্ছে না, টফি-বায়োস্কোপের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ

১১

একই আকাশ-বাতাস, একই জল তরঙ্গ, আমরা মিলেমিশে কাজ করব : দীনেশ ত্রিবেদী

১২

প্রচারে আসছে নতুন ধারাবাহিক 'গ্রামের নাম সুন্দরপুর'

১৩

বিএনপি বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে নিয়ে যাবে : ড. মঈন খান

১৪

যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ আগুন, চিকিৎসা সরঞ্জামের গুদাম পুড়ে ছাই 

১৫

তামিমকে টপকে গেলেন বিজয়, মোহামেডানের ইনিংসে যত রেকর্ড

১৬

বাজেটে অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয় : নাহিদ ইসলাম

১৭

৫০০ হাত পতাকা তৈরি করে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের শোভাযাত্রা

১৮

শিগগিরই ৫ ব্যাংকের আমানতকারীদের আমানত ফেরতের সিদ্ধান্ত হবে: গভর্নর

১৯

বাইরে তপ্ত রোদ, স্কুলের টিনের চালে ঝুম বৃষ্টি!

২০
X