

ফুল প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরা একে অপরের পরিপূরক। প্রকৃতিতে নানা রঙের ফুল ফোটে। এসব ফুল যেমন প্রকৃতিকে অলংকৃত করে, তেমনি এসব ফুলের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় ফুলপ্রেমীসহ নানা বয়সী মানুষ।
বাগানে যত্ন করে ফোটানো ফুলের পাশাপাশি পরিচর্যা ছাড়াই ঋতুভেদে প্রকৃতিতে ফোটে আরও অসংখ্য ফুল। এসব ফুলও সমানভাবে মানুষকে আকৃষ্ট করে ও প্রকৃতিকে রঙে রঙে রাঙিয়ে তোলে এবং ফুলেল স্পর্শে প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার প্রকৃতিতে মুগ্ধতা বিলাচ্ছে তেমনই এক অবহেলায় ফোটা চোখজুড়ানো ফুল পটপটি। এ ফুলের নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে প্রকৃতি নতুনভাবে সেজে উঠেছে। এ ফুলের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে প্রকৃতির সবুজাভ অবয়ব। মোহনীয় ফুলগুলো যেন প্রকৃতির বুকে আঁকা এক নজরকাড়া অনন্য চিত্রপট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে, মেঠোপথের দুপাশে, ঝোপঝাড়-সংলগ্ন স্থানে, জলাশয়ের পাড়, পরিত্যক্ত খোলা জায়গায়, বাসাবাড়ির আশপাশে ফুটে আছে চোখজুড়ানো পটপটি ফুল। আগাছা হিসেবে পরিচিত এ ফুলের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ফুলপ্রেমী, পথচারীসহ সববয়সী মানুষ। ফুলের সৌন্দর্য নিয়ে প্রকৃতিও যেন সম্মোহনী সৌন্দর্যে সেজে উঠেছে।
জানা গেছে, পটপটি উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম রুয়েলিয়া টিউবেরোসা। ইংরেজিতে এর বৈজ্ঞানিক নামই ব্যবহার করা হয়। ফিভার রুট, মিনিরুট, স্ন্যাপড্রাগন রুট এবং শিপ পটেটো নামেও এটি পরিচিত। এটি অ্যাকান্থেসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি বর্ষজীবী গুল্মজাতীয় সপুষ্পক বুনো উদ্ভিদ। পটপটি বা রুয়েলিয়া উদ্ভিদের অনেকগুলো প্রজাতি রয়েছে। এটি দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এ দেশে এসেছে। বাংলাদেশসহ এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উদ্ভিদটিকে কমবেশি দেখা যায়। অঞ্চলভেদে এটির ভিন্ন ভিন্ন আঞ্চলিক নাম রয়েছে।
পটপটি বা রুয়েলিয়া উদ্ভিদের ফুল বেশ সুন্দর ও কোমল। এ ফুলের রং হালকা বেগুনি। এটি দেখতে অনেকটা ঢোলকলমি বা ধুতরা ফুলের মতো। এ ফুলের কোমল পাপড়ি তেমন একটা মসৃণ নয়, তবে দেখতে বেশ সুন্দর ও আকর্ষণীয়। এ ফুল সকালে ফোটে, দুপুর হলেই আবার নিজে থেকেই ঝরে পড়ে।
পটপটি বা রুয়েলিয়া উদ্ভিদটি সাধারণত ১ থেকে ২ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এরা সড়কের পাশে, পরিত্যক্ত জায়গায়, ঝোপঝাড় ও পতিত জমিতে কোনোরকম যত্ন ছাড়াই জন্মায়। এরা দলবেঁধে থাকতে পছন্দ করে। এদের পাতার রং সবুজ। এর ফল পানির স্পর্শ পেলে পটপট শব্দ করে ফেটে বীজগুলো আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে, আর এভাবেই এরা বংশবিস্তার করে থাকে।
পটপটি বা রুয়েলিয়া শুধু ফুলের সৌন্দর্যই প্রদর্শন করে না, এর রয়েছে ভেষজ গুণাগুণ। প্রাচীন কাল থেকেই এই উদ্ভিদটি নানা রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এই উদ্ভিদের ভূমিকা রয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা রেহান উদ্দিন বলেন, আমরা ছোটবেলায় এ গাছের পাকা ফল পেড়ে বোলের পানিতে রাখতাম, আর ফলগুলো পটপট শব্দ করে ফেটে যেত। এ দৃশ্য দেখতে বেশ মজা পেতাম। এ গাছের ফুলও দেখতে খুব সুন্দর। তবে এর ফুল বেশি সময় গাছে থাকে না, দুপুর হলেই ঝরে পড়ে যায়। আগের তুলনায় এখন আর এ গাছ বেশি একটা দেখা যায় না।
স্থানীয় শিক্ষার্থী তাইফা ইসলাম রোজি বলেন, পথের ধারে নাম না জানা নানারকম ফুল আমাদের প্রকৃতিতে ফোটে, যেসব ফুল বাগানের ফুলের মতোই আমাদেরকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। পটপটি তেমনি একটি পথ ফুল। সবুজের মাঝখানে ফোটা এ ফুলের সৌন্দর্যে অনায়াসেই চোখ আটকে যায়। দিনভর না দেখা গেলেও সকালে এ ফুলের সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে।
ফুলপ্রেমী তানিয়া আক্তার বৃষ্টি বলেন, নাম জানা থাক বা না-থাক, ফুল বরাবরই মন ভালো করার একটি উপকরণ। বাগানের ফুলের চেয়ে পথের ধারে ফোটা ফুলের সৌন্দর্যও কোনো অংশে কম নয়। সৌন্দর্যে অনন্য তেমনই একটি পথের ধারে ফোটা ফুল পটপটি। এ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার মতোই সুন্দর। সকল থেকে দুপুরের আগপর্যন্ত এ ফুলের সৌন্দর্য চোখে পড়ে।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ইউনানি ডা. মোহাম্মদ সোহেল রানা কালবেলাকে বলেন, সৌন্দর্যের দিক থেকে পটপটি ফুল মন জয় করার মতো সুন্দর। এটি লাজুক প্রকৃতির ফুল। বিশেষ করে সড়কের পাশে আসা-যাওয়ার পথে এ ফুলের সৌন্দর্য সহসাই চোখে পড়ে। এ উদ্ভিদটি আগের চেয়ে কমে গেলেও উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় এ ফুল দেখতে পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, পটপটি শুধু সুন্দর ফুলের জন্যই পরিচিত নয়, এর রয়েছে ভেষজ গুণ। নানা রোগের চিকিৎসায় এই উদ্ভিদটির বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। বহুকাল আগে থেকেই এটি লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এটিকে সরাসরি ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।