

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে ধর্ষণের শিকার ছয় বছরের শিশু ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। ঘটনার ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। উল্টো মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ায় ভুক্তভোগী শিশুটিকে বাড়ি থেকে সরিয়ে অন্যত্র লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
মামলার বিবরণ, চার্জশিট ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে পীরগঞ্জ পৌর শহরের জগথা কলাপাড়া এলাকার ওই শিশুটি বাড়ির পাশের একটি দোকানে চিপস কিনতে যায়। এ সময় তার প্রতিবেশী মৃত দবির উদ্দিনের ছেলে মকবুল হোসেন (৫৭) খাবারের প্রলোভন দেখিয়ে এবং মোবাইল ফোনে ভিডিও দেখানোর কথা বলে শিশুটিকে নিজের বাড়ির শোয়ার ঘরে নিয়ে যায়।
একপর্যায়ে সে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। সে সময় শিশুটির চিৎকার ও কান্না শুনে অন্যান্য প্রতিবেশীরা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে। তবে লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্ত মকবুল হোসেন ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
মকবুল হোসেনের ঘর থেকে রক্তাক্ত ও গুরুতর অবস্থায় শিশুটিকে প্রথমে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার পরদিন ২০ সেপ্টেম্বর শিশুটির বাবা বাদী হয়ে পীরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা শিশুটিকে ধর্ষণের আলামত পান এবং পুলিশকে মেডিকেল রিপোর্ট প্রদান করেন।
মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা পীরগঞ্জ থানার এসআই সজল বসাকও তদন্তে ঘটনার সত্যতা পান। তিন মাসের মধ্যে চার্জশিট দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অজ্ঞাত কারণে ঘটনার পাঁচ মাস পর চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী/২০০৩) এর ৯(১) ধারায় চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে পুলিশ।
তবে চার্জশিট দাখিল হলেও মকবুল হোসেন আত্মগোপনে থাকার অজুহাতে পুলিশ তাকে এতদিন গ্রেপ্তার করেনি বলে দাবি করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সজল বসাক।
এদিকে, বিচারের দাবিতে শিশুটির বাবা বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ করলেও কোনো সুরাহা পাননি। ঘটনার প্রায় ৯ মাস পর আবারও প্রকাশ্যে এলাকায় ফিরেছেন অভিযুক্ত মকবুল হোসেন। গত কয়েকদিন ধরে তিনি নিজ বাড়িতেই অবস্থান করছেন।
অভিযোগ উঠেছে, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছেন। আসামির এমন আগ্রাসী আচরণ ও হুমকির মুখে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গত কয়েকদিন ধরে শিশুটিকে লুকিয়ে রেখেছে তার পরিবার।
ভুক্তভোগী শিশুর বাবা বলেন, প্রশাসন আর রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও আমার মেয়ের ধর্ষককে বিচারের আওতায় আনতে পারলাম না। মকবুল দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না। এখন সে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর মামলা তুলে না নিলে আমার মেয়েকে গুম করাসহ আমাকে ও সাক্ষীদের মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। ওর ভয়ে মেয়েটাকে লুকিয়ে রেখেছি। প্রতিদিন বাড়িতে লোক পাঠাচ্ছে, মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছে এবং ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমি পরিবার নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন পার করছি। তার ভয়ে কাজ করতে যেতে পারছি না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মামলার একাধিক সাক্ষী জানান, তারা মামলার সাক্ষী হওয়ায় অভিযুক্ত মকবুল তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তার ভয়ে ঠিকমতো বাইরে চলাফেরা করতে পারছে না। তারাও পরিবার পরিজন নিয়ে আতংকে আছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মকবুল হোসেন জানান, আমি কোনো অপরাধ করিনি। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। বিষয়টা আপস মীমাংসা করতে রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন মহলে তদবির করার কথা তিনি স্বীকার করে বলেন, আমি কাউকে ভয় দেখাইনি। বিভিন্ন জনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি বিষয়টা সমাধানের জন্য।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন প্রামাণিক বলেন, এ ঘটনায় আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আমাদের আর কিছু করার নেই।