

‘মরার আগে যদি দেখে যাইতে পারতাম পিঠে কী আছে, তাইলে আর কোনো আপত্তি ছিল না। গুলিটা নিয়েই হয়তো কবর পর্যন্ত যাইতে হইবো।’ কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চিরাং ইউনিয়নের গোপালাশ্রম (চক্রকান্দি) গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব যুদ্ধাহত নারী রশিদা আক্তার।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে আহত হয়েছিলেন তিনি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও অর্থাভাবে সেই গুলি এখনো তার শরীরেই রয়ে গেছে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ রশিদা আক্তার এখন প্রায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে পিঠে থাকা গুলির যন্ত্রণা সহ্য করেই দিন কাটছে তার। একাধিক গণমাধ্যমে তার অসহায় জীবনের গল্প উঠে এলেও চিকিৎসার জন্য কার্যকর কোনো সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ তার পরিবারের।
রশিদা আক্তার জানান, ১৯৭১ সালের শ্রাবণ মাসের এক শনিবার পাকিস্তানি সেনারা গোপালাশ্রম গ্রামের ডা. ধীরেন্দ্রনাথ সরকারের বাড়িতে আগুন দেয় এবং নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের মানুষ যখন দিগ্বিদিক ছুটছিল, তখন শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে বাড়ি ছাড়েন তিনি।
বাড়ির পাশ থেকে আরও কয়েকজনের সঙ্গে একটি নৌকায় ওঠেন রশিদা। নৌকাটি মনাং গ্রামের দিকে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে হঠাৎ পাকবাহিনীর ছোড়া একটি গুলি এসে তার ডান কাঁধে বিদ্ধ হয়।
সেদিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, কোলের শিশুটারে নিয়ে চুপ কইরা বইসা ছিলাম। হঠাৎ কাঁধে গুলি লাগে। নৌকায় থাকা রশিদ মিয়া আমার পিঠের রক্ত গামছা দিয়া মুছতেছিল। এমন সময় আরেকটা গুলি আইসা তার মাথার খুলি উড়াইয়া নেয়। নৌকার মধ্যেই সে মারা যায়।
তিনি জানান, পরে মনাং গ্রামের লোকজন এসে তাদের নিরাপদে পার করে দেয়। এরপর আত্মীয়-স্বজন তাকে ময়মনসিংহ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে রাখা হয়নি।
রশিদা বলেন, ‘একজন মহিলা ডাক্তার ক্ষত পরিষ্কার করে ওষুধ লাগাইয়া কইছিলেন, বেশি সময় হাসপাতালে থাকা যাবে না। পাকবাহিনীর গুলিতে আহত মানুষ আছে জানলে সমস্যা হইব। তাই তাড়াতাড়ি বাড়ি চইলা আসছিলাম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও আর অপারেশন করানো সম্ভব হয়নি। অর্থাভাবে চিকিৎসার সুযোগ না পাওয়ায় গুলিটি শরীরেই থেকে যায়।’
তিনি বলেন, ‘গুলির জায়গায় মাঝে মাঝে চিনচিন ব্যথা করে। কোনো সময় অবশ হয়ে যায়, আবার কোনো সময় বেদনায় অস্থির হইয়া যাই। টাকার অভাবে অপারেশন করাইতে পারলাম না। মনে হয় গুলি লইয়াই কবর পর্যন্ত যাইতে হইব।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই হামলায় রশিদা আক্তারসহ আরও কয়েকজন আহত হন এবং তিনজন নিহত হন। মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরও আহত ও নিহত পরিবারের সদস্যদের যথাযথ খোঁজখবর নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
রশিদার ছেলে কাঞ্চন মিয়া বলেন, ‘মা আমাকে কোলে নিয়ে পালানোর সময় গুলিবিদ্ধ হন। আমরা দরিদ্র মানুষ। উন্নত চিকিৎসা করাতে পারিনি। ব্যথা বাড়লে শুধু ওষুধ কিনে দেই। কিছুদিন ভালো থাকে, পরে আবার ব্যথা শুরু হয়।’
জেষ্ঠ সাংবাদিক সমরেন্দ্র বিশ্ব শর্মা জানান, রাশিদার দুঃখ কষ্ট নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় বারংবার প্রচার হলেও কোন সরকার ও উপজেলা প্রশাসন তাকে মূল্যায়ন কিংবা চিকিৎসা সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেনি। যুদ্ধাহত রশিদা আক্তারের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবং তার শরীরে থাকা গুলিটি অপসারণের ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনসহ সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিফাতুল ইসলাম বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয় আগে জানা ছিল না। জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে বেঁচে ফেরা রশিদা আক্তারের এখন একটাই প্রত্যাশা, জীবনের শেষ সময়ে যেন চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘ ৫৫ বছরের যন্ত্রণার অবসান ঘটে। তার ভাষায়, ‘মরার আগে গুলিটা বের হতো দেখতাম, এইডাই আমার শেষ চাওয়া।’