

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) দিন দিন বাড়ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রম। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মিছিল, পোস্টার, ব্যানার এবং জাতীয় দিবসে ফুল অর্পণের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। চাকসু নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি কর্মসূচি পালন করেছে এই নিষিদ্ধ সংগঠনটি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর চবির আলাওল হলের সামনে ব্যানার টানিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কার্যক্রম শুরু করে ছাত্রলীগ। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি একটি ছাত্রী হল ও বিজ্ঞান অনুষদে চার নারী নেত্রী কেক কেটে সংগঠনটির ৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন একটি ভিডিও ফুটেজ তখন ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া দেশের জাতীয় দিবসে সক্রিয় সংগঠনটি। চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে ফুল অর্পণ এবং ২৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেইটে ঝটিকা মিছিল করে সংগঠনটি। এর আগে, ২০২৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে ব্যঙ্গ করে পোস্টারও লাগায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
যদিও, এসব কর্মসূচির বিপরীতে চাকসুর ব্যানারে হয়নি কোনো মিছিল বা প্রতিবাদ, দেওয়া হয়নি কোনো বিবৃতি।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যেই চাকসুর শপথ গ্রহণের পর ভিপি ইব্রাহীম রনির বিরুদ্ধে বিভিন্ন জেলায় জামায়াতে ইসলামী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কক্সবাজার, ফেনী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, বগুড়া, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় গিয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণা ও ছাত্রশিবিরের নবীনবরণ এবং অন্যান্য সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে, এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে এখন রয়েছে সংগঠনটির চিহ্ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হল ও ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ সালের সন্ত্রাস দমন আইনের অধীনে সংগঠনটিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে,নিষিদ্ধ ঘোষণার দেড় বছর পরেও ক্যাম্পাসজুড়ে সংগঠনটির উপস্থিতির চিহ্ন রয়ে গেছে। প্রশাসনিক ভবন, হল প্রাঙ্গণ, শহীদ মিনার ও জিরো পয়েন্ট সহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘বাংলার মুখ’ একাকার, বিজয় সহ ছাত্রলীগের উপ-গ্রুপ বা বগির নাম এখনও দেখা যায়।
এতে করে ক্যাম্পাসে চাকসুর নিয়মিত কার্যক্রমে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।
চাকসু ভিপি ইব্রাহিম রনি বলেন, ‘বিভিন্ন জেলা ভ্রমণ করলেও চাকসুর কাজের তেমন ক্ষতি হচ্ছে না। আমার একটি রাজনৈতিক আদর্শ আছে। চাকসু ও সংগঠনের কাজের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হবে। প্রচারণার গেলেও আমি অধিকাংশ সময় ক্যাম্পাসেই থাকি। আর আমি গেলে একসাথে অনেকগুলো প্রোগ্রাম সম্পূর্ণ করি।’
ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কার্যক্রম বন্ধ করাসহ বিভিন্ন দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানান চাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সাঈদ বিন হাবিব।
তিনি বলেন, ‘চাকসু কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা না। আমরা আমাদের দাবিগুলো প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু অথর্ব ও ব্যর্থ প্রশাসন সেগুলো আমলে নেয়নি, কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ইয়াহ্ইয়া স্যার, কামাল স্যার ও শামীম স্যার এই প্রশাসন ব্যর্থ। আমরা হাটহাজারী থানা প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উভয়কেই বিষয়টি জানিয়েছি।’
ছাত্রলীগের কার্যক্রমের প্রতিবাদে কেন চাকসু কোন বিবৃতি দেয়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো জাতীয় কোনো ইস্যু না, প্রশাসনকে জানালেই যথেষ্ট। তাই হয়তো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই, আমরা সরাসরিই প্রশাসনকে অবহিত করেছি। চাকসুর ব্যানারে সরাসরি মিছিল না হলেও চাকসুর সদস্যদের উপস্থিতিতে একদিন একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট ও শহীদ মিনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এখনও ছাত্রলীগের বিভিন্ন বগির নাম থাকলেও চাকসুর দাবি তারা এটি মুছে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বহু বছর ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে ছিল। তারা এত বেশি দেয়াল লিখন করেছে যে আমাদের পক্ষে শতভাগ মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হোসেন শহিদ সরওয়ার্দী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেইটে ছাত্রলীগের যে মিছিলটি হয়েছে, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের ইস্যু। এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসন ভালো বলতে পারবে। আর ব্যানার, পোস্টারগুলো হঠাৎ করে লাগানো হয় এবং কিছুক্ষণ পরই খুলে নেওয়া হয়। পরে দেখা যায়, যারা আমাদেরকে বিষয়টি জানিয়েছে, তারাই পোস্টার লাগিয়ে ছবি তুলে আবার খুলে নিয়ে যায়। আমরা এসব বিষয়ে সচেতন আছি এবং বিষয়গুলো নজরদারিতে রাখার চেষ্টা করছি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (অধ্যাপক) কামাল উদ্দিন বলেন, ‘চাকসুসহ অনেক শিক্ষার্থীরাই আমাদেরকে এ বিষয়ে অবগত করেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যেকটা পয়েন্টে নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে সচেতন রয়েছি এবং এ বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডিকে আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। ফুল দেওয়া ও ব্যানার জড়িত বিষয়গুলোতেও আমরা প্রক্টরিয়াল বডিকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম।’