

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস। শীতের এক বিষণ্ন বিকেলে যেন হঠাৎ সুরের আকাশে মেঘ জমল। খবরটা দাবানলের মতো ছড়াল না; বরং এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের মতো নামল কোটি ভক্তের বুকে। যে কণ্ঠস্বর গত এক যুগ ধরে আমাদের প্রেম, বিরহ, আনন্দ আর একাকিত্বের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী ছিল—সেই কণ্ঠ হঠাৎই নীরবতার ঘোষণা দিল। অরিজিৎ সিং, বলিউডের ‘প্লেব্যাক সম্রাট’, সরে দাঁড়ালেন ঠিক যখন তিনি খ্যাতির সর্বোচ্চ শিখরে। এ কি কেবলই অবসর? নাকি এ এক মহিরুহের শেকড়ে ফেরার অনন্ত যাত্রা?
জিয়াগঞ্জের ধুলো থেকে সুরের সাধনা মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ। গঙ্গার হাওয়া আর মফস্বলের ধুলোমাখা এক জনপদ। সেখানেই ১৯৮৭ সালে এক পাঞ্জাবি বাবা আর বাঙালি মায়ের ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন অরিজিৎ। রক্তে ছিল সুরের ধারা। মা আর দিদিমার কাছে শেখা প্রথম সারেগামা, আর হাজারী ভ্রাতৃত্রয়ের কাছে ধ্রুপদী সংগীতের কঠোর অনুশাসন—এই ছিল তার শৈশব।
তখনকার অরিজিৎ জানতেন না গ্ল্যামার কী। তিনি শুধু জানতেন, সংগীত কোনো বিনোদন নয়, এ এক ধ্যানের নাম। গুরু রাজেন্দ্র প্রসাদ হাজারী তাকে শিখিয়েছিলেন—চটুল জনপ্রিয়তা নয়, সুরের শুদ্ধতাই আসল। সেই শিক্ষা বুকে নিয়েই মাত্র ১৮ বছর বয়সে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন মায়ানগরী মুম্বাইয়ে।
২০০৫ সাল। ‘ফেম গুরুকুল’-এর মঞ্চ। সেদিন ট্রফি হাতে তুলতে পারেননি অরিজিৎ, ষষ্ঠ হয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরাজয় তাকে ভেঙে দেয়নি; বরং ইস্পাতকঠিন জেদ তৈরি করেছিল। সহকর্মীরা যখন আয়ের টাকায় গাড়ি কিনছেন, অরিজিৎ তখন নিজের ছোট্ট ভাড়াবাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন মিউজিক স্টুডিও। দিনের পর দিন প্রীতম, বিশাল-শেখরদের স্টুডিওতে সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। চিনেছেন সুরের প্রতিটি কারিগরি দিক। আট বছরের সেই দীর্ঘ ‘ছায়া জীবন’ তাকে শিখিয়েছিল—নক্ষত্র হতে হলে আগে মাটির গভীরে শেকড় ছড়াতে হয়।
২০১৩ সাল। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল, আর সেই বৃষ্টির সঙ্গে এলো এক জাদুকরী কণ্ঠ—‘কিউ কি তুম হি হো...’। ‘আশিকি ২’-এর সেই রেইনকোট পরা দৃশ্য আর অরিজিতের আর্তনাদ—মুহূর্তেই বদলে গেল ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস। এরপর আর তাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। ‘চান্না মেরেয়া’র কান্না হোক বা ‘কেশরিয়া’র প্রেম—অরিজিৎ হয়ে উঠলেন বাঙালির আবেগের সমার্থক শব্দ। তার কণ্ঠে বিরহ যেন এক ঐশ্বরিক রূপ পেল।
তারকা নন, তিনি মাটির মানুষ অরিজিতের সবচেয়ে বড় জাদুকরী শক্তি তার গান নয়, তার জীবনযাপন। শো প্রতি ১৪ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নেওয়া মানুষটি যখন জিয়াগঞ্জের রাস্তায় হাওয়াই চপ্পল আর স্কুটার নিয়ে বাজার করতে বের হন, তখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়—ইনিই সেই গ্লোবাল সুপারস্টার! যিনি সালমান খানের মতো মহাতারকার কাছে ক্ষমা চাইতে দ্বিধা করেন না, আবার নিজের উপার্জিত অর্থে গ্রামের মানুষের জন্য হাসপাতাল গড়েন নিঃশব্দে। মুম্বাইয়ের চাকচিক্য তাকে কোনোদিন গ্রাস করতে পারেনি। তিনি যেন সেই আধুনিক লালন, যিনি খ্যাতির ভিড়ে থেকেও একলা থাকতে ভালোবাসেন।
সময়ের আগেই বিদায়? কেন এই প্রস্থান? কেন এই সরে দাঁড়ানো? অরিজিৎ জানিয়েছেন, তিনি ক্লান্ত। একই ছকে বাঁধা গানের মেশিনে তিনি আর নিজেকে আটকে রাখতে চান না। তিনি চান সৃজনশীল মুক্তি। চান নতুন প্রজন্ম উঠে আসুক। তিনি ফিরতে চান তার নিজের তৈরি করা সুরের ভুবনে, যেখানে বাণিজ্যের চেয়ে আবেগের দাম বেশি।
একজন শিল্পী তো তিনিই, যিনি জানেন কখন থামতে হয়। অরিজিৎ সিং প্রমাণ করলেন, তিনি কেবল গায়ক নন, তিনি এক দার্শনিক। তার এই বিদায় হয়তো বলিউডের প্লেব্যাক জগৎকে শূন্য করে দিল, কিন্তু তার সৃষ্টি বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।
গঙ্গার পাড়ে বসে হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় তিনি আবার তানপুরাটি হাতে তুলে নেবেন। সেখানে কোনো ক্যামেরা থাকবে না, হাততালি থাকবে না—থাকবে শুধু নদী, হাওয়া আর তার শুদ্ধ সুর। মুসাফির তার গন্তব্য খুঁজে পেয়েছেন। অরিজিৎ সিং, আপনাকে বিদায় বলা আমাদের সাধ্য নেই। আপনি আমাদের হৃদয়ের প্লেলিস্টে বেজে চলবেন আজীবন।
মন্তব্য করুন