

ঢাকায় মশার উপদ্রব এখন আর কেবল বিরক্তির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার সংখ্যা কিছুটা কমলেও কিউলেক্স মশার সংখ্যা বাড়ছে। এই বৃদ্ধি আগামী মার্চ মাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। ফলে রাজধানীবাসীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে।
এমন তথ্যই উঠে এসেছে ঢাকা ইউটিলিটি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডুরা) আয়োজিত ‘মশার উপদ্রব ও নাগরিক ভোগান্তি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায়। রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান বাস্তবতা, দায়বদ্ধতা ও করণীয় নিয়ে শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
আলোচনা সভায় আলোচক ও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন— ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. কবিরুল বাশার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মো. আরিফুল ইসলাম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. সাদমান সাকিব। এতে সভাপতিত্ব করেন ডুরার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মোল্লা। সঞ্চালনা করেন ডুরার সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, কিউলেক্সের উত্থান এবং এডিসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন— দুটিই প্রমাণ করে যে ঢাকার মশা সমস্যা আর মৌসুমি নয়; এটি একটি কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক সংকট। বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য উপেক্ষা করলে তার মূল্য দিতে হবে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য দিয়ে। তবে একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতেই হয়— নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া ঢাকাকে মশামুক্ত করা অসম্ভব। প্রশাসন তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না, আবার নাগরিক উদাসীনতাও সমানভাবে দায়ী। বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, অব্যবহৃত পাত্র, খোলা পানির ট্যাংক— এসব ছোট অবহেলাই বড় বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। বর্তমানে এডিস মশা কমলেও কিউলেক্স বাড়ছে এবং আগামী মার্চ মাসে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, এই ভোগান্তি নগরবাসীকে পোহাতে হবে। তাই এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের সচেতন হওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, ঢাকায় মশা মানেই শুধু বিরক্তি নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভিল্যান্স তথ্য একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে— রাজধানীতে কিউলেক্স মশা কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে। অন্যদিকে এডিস মশা আপাতত কমে থাকলেও এটি কোনো স্থায়ী নিরাপত্তার বার্তা নয়। ইতিহাস আমাদের শেখায়, এডিস কখনো ঘোষণা দিয়ে ফিরে আসে না; আসে আমাদের অসতর্কতার সুযোগে।
সার্ভিল্যান্স তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় সংগৃহীত প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকা মিলিয়ে ঢাকা শহর কিউলেক্স মশার আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিউলেক্স মশা সাধারণত ‘রোগ ছড়ায় না’—এই ভুল ধারণার কারণে দীর্ঘদিন অবহেলিত। অথচ এই মশাই ফাইলেরিয়া রোগের বাহক এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে অসহনীয় করে তোলে। রাতে ঘুমানো থেকে শুরু করে হাসপাতালে রোগীর কষ্ট— সবখানেই কিউলেক্সের আধিপত্য। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু ডেঙ্গু মৌসুম এলেই মশা নিয়ে ভাবব? বছরের বাকি সময় কি কিউলেক্সের বাড়বাড়ন্ত আমাদের চোখে পড়বে না?
কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। বেসমেন্ট ও পার্কিং এলাকায় পানি জমতে না দেওয়ার বাধ্যতামূলক বিধান কার্যকর করতে হবে। লেক, খাল ও জলাশয় নিয়মিত পরিষ্কার ও পরিবেশবান্ধব লার্ভা নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। বস্তি ও জলাবদ্ধ এলাকাকে ‘হাই-রিস্ক জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। পাশাপাশি এডিস নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি বাড়ি ও নির্মাণস্থলে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্থায়ী প্রজননস্থলে ইনসেক্ট গ্রোথ রেগুলেটর ব্যবহার এবং সারা বছর নজরদারি চালু রাখতে হবে—শুধু ডেঙ্গু মৌসুমে নয়। প্রশ্ন একটাই—২০২৬ সালে আমরা কি আবারও আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়ায় ফিরব, নাকি এবার আগেভাগেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেব? সময় এখনই। প্রস্তুতি আজ না নিলে কাল অনেক দেরি হয়ে যাবে। মশা নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু কীটনাশক ছিটানো নয়; এটি একটি সমন্বিত নগর স্বাস্থ্য কৌশল।
ডা. নিশাত পারভীন বলেন, ডেঙ্গু বা মশার উপদ্রব কমাতে সিটি করপোরেশনের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ বাসস্থান ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি, তবে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া সফলতা সম্ভব নয়। সবাই মিলে চেষ্টা করলে মশামুক্ত ঢাকার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
পরিকল্পনাবিদ ড. মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মশার সমস্যা থেকে সাময়িক নয়, স্থায়ী মুক্তি প্রয়োজন। অপরিকল্পিত নগরায়ন, বাসস্থান, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এই সমস্যার মূল অন্তরায়। পরিকল্পনাহীনভাবে কাজ শুরু করলে পরবর্তী কোনো উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাধ্যতামূলক; এটি ছাড়া কোনো উদ্যোগই কার্যকর হবে না।
ডিআরইউ সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, মশা কী ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ আমি নিজেই। কয়েক বছর আগে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর আগের মতো শারীরিক সক্ষমতা আর ফিরে পাইনি। এখন দুই মিনিট হাটলেই থেমে যেতে হয়। তাই ডেঙ্গু হোক বা কিউলেক্স— সব ধরনের মশা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের গুরুত্ব সহকারে কাজ করতে হবে, নইলে জনভোগান্তি কমবে না।
ডিএনসিসির সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. সাদমান সাকিব বলেন, আমরা ওয়ার্ডভিত্তিক ওষুধ ছিটানো ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত কাজ করছি। মৌসুম অনুযায়ী কার্যক্রমের গতি নির্ধারণ করা হয়। সামনে কিউলেক্স মশা বাড়তে পারে— এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এক মাসব্যাপী বিশেষ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে ডুরার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যরা নতুন সাতজন সদস্যকে বরণ করে নেন। এছাড়া আরও ৩টি টেলিভিশন ও পত্রিকার সেবাখাতের তিনজন সাংবাদিককে সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়। নতুন সদস্যদের মধ্যে বাংলা ট্রিবিউনের আতিক হাসান শুভ, একুশে টেলিভিশনের ইমন চৌধুরী, বাসসের মাহামুদুর রহমান নাযীদ, কালবেলার শাহনেওয়াজ খান সুমন, এটিএন নিউজের শেখর আজাদ, বাংলানিউজ২৪-এর মিরাজ মাহবুব (ইফতি) ও দৈনিক নয়াদিগন্তের জিলানী মিল্টনকে বরণ করে নেওয়া হয়।
মন্তব্য করুন