কালবেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:২৮ এএম
অনলাইন সংস্করণ

সৌন্দর্যে ঘেরা বাংলাদেশ কেন পর্যটক টানতে পারছে না

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ বন, সবুজ চা-বাগানে ঘেরা পাহাড় আর রেকর্ড দৈর্ঘ্যের সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের বেশিরভাগ পর্যটকের কাছে বাংলাদেশ এখনো প্রায় অচেনা একটি দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও আন্তর্জাতিক পর্যটনের মানচিত্রে তেমন জায়গা করে নিতে পারেনি।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে বিদেশি পর্যটক এসেছেন মাত্র ছয় লাখ ৫০ হাজারের মতো, যা প্রতিবেশী ভারত বা শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক কম। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশ, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর শহুরে জীবনের আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো মূলধারার পর্যটন গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি।

বিদেশি ট্যুর অপারেটরদের মতে, বাংলাদেশের প্রতি মানুষের একটি নেতিবাচক ধারণা কাজ করে। অনেকের মনে দেশটি মানেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা বা রাজনৈতিক অস্থিরতার খবর। ফলে দেশের সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্য আড়ালে থেকে যায়।

দেশের ভেতরের পর্যটন উদ্যোক্তারা বলছেন, এই ধারণা বাস্তব চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তাদের মতে, বাংলাদেশে এমন অনেক অভিজ্ঞতা আছে যা আধুনিক পর্যটকেরা খুঁজছেন। ঢাকার মতো ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরের জীবন, চা-বাগানে ঘেরা শ্রীমঙ্গল, আর কক্সবাজারের দীর্ঘ সাদা বালুর সৈকত পর্যটকদের জন্য ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা দিতে পারে।

অনেক বিদেশি পর্যটকই বলছেন, বাংলাদেশে এসে তারা বাস্তব ও প্রাণবন্ত স্থানীয় জীবন দেখার সুযোগ পেয়েছেন। নদীপথে যাতায়াত, গ্রামীণ বাজার, নৌকাভর্তি ফলমূল আর মানুষের আন্তরিক ব্যবহার তাদের মুগ্ধ করেছে। ঢাকার পুরান শহরের কোলাহল, নদীবন্দর, ভাসমান বাজার এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আলাদা এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

তবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। পশ্চিমা দেশগুলোতে বাংলাদেশকে মূলত পোশাকশিল্প বা দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হিসেবেই দেখা হয়। গণমাধ্যমে প্রায়ই বন্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা বা সামাজিক সমস্যার খবর উঠে আসে। এর ফলে দেশটি পর্যটন গন্তব্য হিসেবে নজরে আসে না।

অনলাইনে অনেক ভিডিও ও ব্লগে ঢাকার অতিরিক্ত ভিড়, ট্রেনের ছাদে যাত্রা বা বর্জ্য ব্যবস্থার সমস্যা তুলে ধরা হয়। এতে কৌতূহল তৈরি হলেও অনেক সময় দেশের নেতিবাচক দিকটাই বেশি সামনে আসে। স্থানীয় গাইডরা বলছেন, পর্যটকদের উচিত আইন মেনে চলা এবং দেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে সম্মান করা। তারা পরিবেশবান্ধব পর্যটন, গ্রামীণ হোমস্টে আর প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণকে গুরুত্ব দিতে চান।

অন্যদিকে, কিছু উদ্যোক্তার মতে, বাস্তবতা লুকানোও ঠিক নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙার শিল্প কিংবা শ্রমজীবী মানুষের জীবন দেখলে দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে ভালোভাবে বোঝা যায়। পর্যটন বাড়লে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে এবং স্থানীয় মানুষের আয় বাড়তে পারে বলেও তারা মনে করেন।

ঢাকার বাইরে সুন্দরবন বাংলাদেশের অন্যতম বড় আকর্ষণ। ইউনেসকো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ নানা বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ রয়েছে। নদীঘেরা এলাকায় কমিউনিটি পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ গাইড বা ইকো রিসোর্টে কাজ করে বাড়তি আয় করতে পারছেন।

শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান এলাকায়ও স্থানীয় উদ্যোগে হোমস্টে ও ট্রেকিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। এসব প্রকল্প স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা ইস্যু অনেক পর্যটকের জন্য উদ্বেগের কারণ। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বা অতীতের অস্থিরতার কারণে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে ভ্রমণ বিষয়ে সতর্কতা জারি করে। এতে অনেক পর্যটক দ্বিধায় পড়েন, যদিও অনেক অভিজ্ঞ ভ্রমণকারী এসব ঝুঁকি বিবেচনা করেই বাংলাদেশে আসছেন।

বিদেশি ট্যুর অপারেটরদের মতে, যারা বাংলাদেশে আসেন তারা সাধারণত অভিজ্ঞ ও ভিন্নধর্মী জায়গা দেখতে আগ্রহী। তারা বিলাসবহুল সুবিধার চেয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে হলেও সাহসী ও অনুসন্ধানী পর্যটকদের তালিকায় জায়গা করে নিচ্ছে।

বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বিশাল হলেও ভাবমূর্তি, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বড় বাধা হয়ে আছে। তবে প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের আন্তরিকতায় বাংলাদেশ আলাদা এক অভিজ্ঞতা দিতে পারে। হয়তো দেশটি কখনোই ব্যাপক গণপর্যটনের গন্তব্য হবে না, কিন্তু যারা সত্যিকারের বাংলাদেশকে জানতে চান, তাদের জন্য এই দেশটি হতে পারে এক অনন্য ও স্মরণীয় ভ্রমণস্থান। সঠিক পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল পর্যটন এবং ইতিবাচক উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে।

সূত্র : CNN

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জরুরি নির্দেশনা

মহাকবি কায়কোবাদের ৭৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

বিদ্যুৎস্পর্শে মা-মেয়েসহ তিনজন নিহত

কুয়েত-বাহরাইনে মার্কিন স্থাপনায় আঘাতের দাবি ইরানের

রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ

দুপুরের মধ্যে যেসব অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের পূর্বাভাস

বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন, ৪৯ হাজার ম্যাচের ডfটা বিশ্লেষণ করে আগেই জানিয়েছিলেন অনুপ

অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছিল, দাবি ইমরান খানের বোনের

১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল মজুত

মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৮ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না

১০

ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর তেহরান সফরকে স্বাগত জানাল ইরান  

১১

প্রেমিকের বাড়িতে স্ত্রীর দাবিতে ২ নারীর অনশন

১২

ঢাকা ব্যাংকে নিয়োগ, আবেদন ৩১ জুলাই পর্যন্ত

১৩

২১ জুলাই / আজকের নামাজের সময়সূচি

১৪

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব এলাকায় মার্কেট বন্ধ

১৫

ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরও কঠোর করল যুক্তরাষ্ট্র

১৬

গাজীপুরে ৫৪ হারানো মোবাইল ফোন উদ্ধার

১৭

আবেগঘন পোস্টে ভক্তদের যে বার্তা দিলেন মেসি

১৮

সড়কে হাঁটুপানি, কচুগাছ লাগিয়ে প্রতিবাদ স্থানীয়দের

১৯

অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতি, নগদ টাকা-স্বর্ণালংকার লুট

২০
X