শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২
ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৯:১২ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন

কৃষি শিক্ষা ও গবেষণায় আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সবুজ শ্যামলের গ্রামখ্যাত শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। আজ ১১ সেপ্টেম্বর এ বিশ্ববিদ্যালয়টি ২৪ বছর পেরিয়ে ২৫ বছরে পদার্পণ করেছে। যদিও উপমহাদেশের প্রাচীণতম কৃষি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি এখন ৮৭ বছর অতিক্রান্ত করছে। ১১ ডিসেম্বর ১৯৩৮ সালে ‘দ্য বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট’ নামে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নামের পরিবর্তন হয়ে ২০০১ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ও পরবর্তীতে ১১ সেপ্টেম্বর এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় নামে এটি যাত্রা শুরু করে।

কৃষি শিক্ষা ও গবেষণাকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিতেই রাজধানীর বুকে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো থাকায় এ বছর অনেকটা আড়ম্বরভাবেই পালিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসটি।

কৃষিই আমাদের প্রধান চালিকাশক্তি। পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু, আর গোলা ভরা ধান এখন প্রান্তিক কৃষকের স্বপ্ন মনে হলেও এটিই ছিল এক সময় কৃষকের প্রধান অবলম্বন। কৃষকদের বর্তমান অবস্থা যা-ই হোক না কেন এ কথা সত্যি যে, আজো আমরা সারাবিশ্বে মাথা উঁচু করে টিকে আছি শুধু কৃষির কারণেই। করোনার কঠিন সময়ের মধ্যে যখন অন্য খাতগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক ছিল তখনও কৃষিই আমাদেরকে আশা জাগিয়েছে, এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। নতুন নতুন জাত ও প্রযুক্তির আধুনিকতায় একদিকে যেমন আমরা মাটি ছাড়াই সবজি ও ফসল চাষে সফলতা অর্জন করছি, ঠিক একইভাবে কৃষিবিদদের নিরন্তর গবেষণায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ত জমিতে লবণ সহিষ্ণু জাত আবিষ্কারসহ খরা ও বন্যা সহনশীল জাত আমাদের প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে রাখছে বিশাল ভূমিকা। শুধু তাই নয় ন্যানো প্রযুক্তি, ভাসমান বেডে সবজি চাষ, হাইড্রোপনিক্স, রিমোট সেন্সিং এরকম অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এখন কৃষকের হাতের নাগালে। আর এসবের পেছনে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের রয়েছে অন্যতম ভূমিকা।

কৃষক ও কৃষিবিদদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই আজ আমরা দানা জাতীয় খাদ্যে অনেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমানে কোনো দুর্যোগকালীন অবস্থা ছাড়া সরকারকে উল্লেখযোগ্য কোনো খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয় না। বরং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকের ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য সরকারকে বিদেশে রপ্তানিসহ অনেক কিছু বিকল্প ভাবতে হয়। ভাবনা যা-ই থাকুক সরকারের কৃষি গবেষণা খাতে আরো বেশি উৎসাহ প্রদান এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি-এই খাতটির জন্য আরো বেশি সুফল বয়ে আনতে পারে। আর সেই সাথে আগামী দিনের তুখোর মেধাবী শিক্ষার্থীরা কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে।

বিশ্ববিদ্যালয়টি গত ২৪ বছরে যেভাবে আগানোর কথাছিল সেভাবে এগোয়নি। কৃষিতে সেন্টার অব এক্সিলেন্স হবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় -এটিই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য। একদিকে গবেষণার জন্য জমির অভাব আর অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিশেষায়িত ল্যাব আজও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই বলে কি গবেষণা কার্যক্রম থেমে আছে? না, বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছে জ্যামিতিক গতিতে আমরা তখন এগুচ্ছি গাণিতিক গতিতে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেশের ও দেশের বাইরের ফান্ডে কিছু ল্যাব বানানো ছাড়া আর উল্লেখযোগ্য কোনোকিছুর উন্নয়ন হয়নি। তবে হ্যাঁ সময়ের সাথে সাথে ইনফাস্ট্রাকচারাল কিছু ডেভেলপমেন্ট এ বিশ্ববিদ্যালয়েও হয়েছে। কিন্তু পুরাতন বিল্ডিংগুলোর ক্লাস রুমের জরাজীর্ণ অবস্থা ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এখানকার ছাত্র-শিক্ষকদের প্রায় প্রতিদিনেরই অভিযোগ। শুধু তাই নয় কলেজ আমলের জরাজীর্ণ ক্যাফেটরিয়াই এখনো শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খাওয়ার প্রধান জায়গা।

যেহেতু রাজধানীর বুকে এ প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ৮৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত তাই কৃষকের সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে সমাধানকল্পে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন উন্নতমানের বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন এখন আর দাবি নয় বরং বাস্তবতা। আর এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা বাজেটও। যেটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর বুকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এর প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যও অর্জিত হবে। কৃষিই যেহেতু আমাদের মূল চালিকাশক্তি তাই কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে সরকারের এ বিষয়ের ওপর বিশেষ নজর ও আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাশ রুম ও হলের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন, অতিদ্রুত মাঠ গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশেই খালি থাকা সাবেক বাণিজ্য মেলার মাঠকে ফিরিয়ে দেয়া (যা আসলে একসময়ে এ প্রতিষ্ঠানেরই অধীনে ছিল) এখানকার ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণের দাবি। এতে একদিকে যেমন এখানকার গবেষণার মাঠের কিছুটা ঘাটতি মিটবে অন্যদিকে ঢাকা শহর পাবে একটা নিঃশ্বাস পাবার আলাদা জায়গা-যেখানে কিছুটা হলেও মানুষ সপ্তাহে একদিন তাদের বাচ্চাদের নিয়ে প্রাণভরে অক্সিজেন নেওয়ার সুযোগ পাবে।

কৃষিতে আমাদের অর্জনও সাফল্য অনেক। ধান উৎপাদনে আমরা বৈশ্বিক গড়কে পেছনে ফেলে পৃথিবীতে তৃতীয়, মিঠা পানির মাছে চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে অষ্টম -এরকম আরো কতকি! আমাদের সু-স্বাদু আম এখন দেশ পেরিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রাণীজ আমিষ উৎপাদন অনেক বেড়েছে, ডিম-দুধের যোগান বেড়েছে। এত সব ভাল খবরের পরেও আমরা স্বাধীনতার ৫২ বছর পরেও কৃষকের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য দিতে ব্যর্থ হয়েছি। অন্য যেকোনো পেশা থেকে কৃষকের আয় অনেক কম বাংলাদেশে। কৃষককে আমরা তার দুর্যোগকালীন বা আপদকালীন সময়ে নিরাপত্তা দিতে পারি না। ফসল ফলিয়েও অনেকক্ষেত্রেই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকেও কৃষক বঞ্চিত হয়। আর এভাবেই প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধের সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে আমাদের প্রান্তিক কৃষকরা। এ অবস্থা হতে উত্তোরণ না হলে,কৃষককে তার প্রাপ্য জায়গায় সম্মান দিতে না পারলে কখনই তাদের মুখে হাঁসি ফোটানো সম্ভব হবে না। এছাড়া প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমাদের কৃষকরা এখনও অনেক পিছিয়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের কৃষির আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণায় প্রশিক্ষিত করতে না পারলে কৃষককে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। কৃষি শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও সঠিক বিপণনের বিষয়ে ছাত্রদেরকে আধুনিক কৃষি শিক্ষায় শিক্ষিত করাটাই আমাদের এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সাথে শুধু উৎপাদন করলেই হবে না, উৎপাদিত খাদ্যটি যেন নিরাপদ ও পুষ্টি সম্মত হয় তা নিয়ে সংশ্লিস্ট সকলের আরো বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। কৃষি শিক্ষায় ও গবেষণায় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উত্তরোত্তর এগিয়ে যাবে। দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সুনামের সাথে আরো বেশি ভূমিকা রাখবে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এ প্রত্যাশাই সবার।

লেখক - ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, কৃষি রসায়ন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থীকে ‘রোহিঙ্গা’ বললেন রুমিন ফারহানা

বিএনপি থেকে আ.লীগে যোগ দেওয়া সেই একরামুজ্জামানের স্বতন্ত্র প্রার্থিতা প্রত্যাহার

ঋণখেলাপি হওয়ায় মনোনয়ন বাতিল আরেক বিএনপি প্রার্থীর

নির্বাচনে খরচ করতে রুমিন ফারহানাকে টাকা দিলেন বৃদ্ধা

বিএনপি নেতা আলমগীর হত্যার মূল শুটার গ্রেপ্তার

ইরানজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ

ইসলামী মূল্যবোধেই রাজনীতি করবে বিএনপি : ইশরাক

বাস উল্টে নিহত ২

প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত চেয়ে আইনি নোটিশ

রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে বিএনপি নেতার আবেদন

১০

এশিয়ার সর্বপ্রথম মেডিকেল অ্যানাটমি লার্নিং অ্যাপ ভার্চুকেয়ারের উদ্বোধন করলেন সাকিফ শামীম

১১

ছাত্রদল ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির আঁতুড়ঘর : মান্নান

১২

মনোনয়নপত্র নিয়ে যে বার্তা দিলেন বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল

১৩

গাইবান্ধায় ১৪৪ ধারা জারি

১৪

খালেদা জিয়া কখনো জোর করে ক্ষমতায় থাকেননি : খায়রুল কবির

১৫

জামায়াতের প্রার্থীকে শোকজ

১৬

সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে : সেলিমুজ্জামান

১৭

নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, সন্দেহ রয়ে গেছে : মঞ্জু

১৮

ঢাবির ৪ শিক্ষককে স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য চার্জ গঠন

১৯

নবম পে-স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন নিয়ে যা জানাল কমিশন

২০
X