

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আলোচনার মধ্যমণি হয়ে ওঠেন প্রতি বছর যখন ৭ নভেম্বর আসে। এর প্রধান কারণ হলো, ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষক মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দানকারী অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে অভ্যূদয় দিবস। বিশেষ গুরুত্বের সাথে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে এটি পালিত হয়।
দিবসটির গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির স্মৃতিচারণ যেমন আবশ্যক, তেমনিভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পূর্ব পযর্ন্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিকামী জনতার স্বপ্ন কীভাবে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল সেই স্মৃতিচারণ করাও আবশ্যক। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরেই পেশাদারিত্বের মহান বৈশিষ্ট্যে জ্যোতির্ময় জিয়াউর রহমান নিজ পেশায় ফিরে যান। তার পর চার বছর অতিবাহিত না হতেই বাংলাদেশের রাজনীতি এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এর অনেকগুলি কারণের মধ্যে একটি হলো, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের অনুচরদের নির্যাতন ও গণহত্যার বিরেুদ্ধে সবাই একাট্টা থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিল রাজনৈতিক বিভাজন, ছিল নানা শিবিরে বিভক্তি। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে থিয়েটার রোডের মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বন্দ্ব ছিল প্রায় প্রকাশ্য। এটি আরোও ঘনীভূত হয় তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রতি কর্তৃক ১৯৭২ সালের ৮ র্মাচ জাতীয় রক্ষীবাহিনী আদশে জারি করে । এই বাহিনী প্রথমে পুলিশের একটি সহায়ক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও পরে যে কাউকে গ্রেফতার করার অনুমোদন পায়। অনেকেই মনে করেন তাদের ব্যবহার করা হতো আওয়ামী লীগের সমালোচকদের বিরুদ্ধে (মাসকারেনহাস অ্যান্থনি ২০০২, ভাষান্তর : বাংলাদেশ রক্তের ঋণ, অনুবাদ মোহাম্মদ শাহজাহান হাক্কানী পাবলিশর্স ঢাকা, পৃ. ৩৮-৩৯)।
এতে করে তৎকালীন সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে সেনাবাহিনীর মধ্যে তৈরি হয় নেতিবাচক মনস্তত্ত্ব। সামরিক বাহিনীতে বিরতিহীনভাবে বিশৃংখলা সৃষ্টির পাশাপাশি ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদশেরে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বাকশাল কায়েমের কারণে বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। তখন কোন প্রকার নির্বাচন ছাড়াই পাঁচ বছরের জন্য সংসদের মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হয়। তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা চারটি সংবাদপত্র ব্যাতীত বাকি সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চরমভাবে বিনষ্ট করা হয়। সরকার ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আসে। সংসদীয় সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা চালু করে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপ্রতি ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতার পর স্বল্প সময়ের মধ্যে এমন একটি দুর্বিষহ ও শ্বাসরুদ্বকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের শোষন বঞ্চনা থেকে সদ্যমুক্ত জনগণ কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিলেন না। সামগ্রিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর মাঝারি পর্যায়ের কিছু ক্ষুব্ধ ও হঠকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপ্রতি শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে নিজেই সেনাপ্রধান হন। সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় সেইদিনই বঙ্গভবনের অবস্থানরত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের নিরাপদে দেশ ত্যাগ করার সুযোগ দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা আনয়নের দোহাই দিলেও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি রাখায় সৈনিক ও জনতার মাঝে তীব্র সংশয় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ৩ নভেম্বর অভ্যূত্থানের কারণে সৃষ্ট গণঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিকল্পনা চরিতার্থ করার জন্য জাসদ ও গণবাহিনী তৎপর হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে গণবাহিনী প্রধান কর্নেল তাহেরের ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন বলেন, জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ৩ নভেম্বরে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করতে অগ্রসর হননি, তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন খালেদ মোশাররফের ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ উদ্যোগকে নস্যাৎ করতে (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রকাশনা, ৭ই নভেম্বর ২০১২)। দেশপ্রেমিক জনসাধারণের মাঝে সর্বত্র একই আলোচনা হচ্ছিল, যদি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করা না যায় তহোলে দেশ 'বিপ্লবীদের' নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে অথবা অনাকাঙ্খিত সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃৃষ্টি হবে। অতএব জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতেই হবে। এর ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বর তারিখে রাজপথে নেমে আসে সিপাহী-জনতা। গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্ত হন সর্বস্তরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা জিয়াউর রহমান।
তিনি প্রতিশোধ পরায়ণ ছিলেন না, ছিলেন মানবিক গুণে উদ্ভাসিত এক বিচক্ষণ অভিভাবক। ৩ নভেম্বরের অভ্যূত্থানে খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেছেন,কিন্তু ৭ নভেম্বরে সিপাহী-জনতার বিপ্লব শুরু হওয়ার প্রাককালে জিয়াউর রহমান খালেদ মোশাররফের অবস্থান জানার পর টেলিফোনে উষ্মা প্রকাশ করলেও খালেদ মোশাররফ ও তার সঙ্গীদেও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ১০ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নওয়াজিশকে নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। একথা মরহুম নওয়াজিশ আলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) সাখওয়াত হোসেনকে জানিয়েছিলেন বলে তিনি তার বাংলাদেশ রক্তাক্ত অধ্যায়: ১৯৭৫-১৯৮১ নামক পুস্তকে উল্লেখ করেন। কিন্তু সিপাহীদের বাঁধভাঙ্গা প্রতিবাদের মুখে খালেদ মোশাররফসহ তার সঙ্গীরা প্রাণ হারান। বহুবার বৈষম্য ও অবজ্ঞার শিকার হয়েও বাংলাদেশকে একটি কার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করার নিমিত্তে জিয়াউর রহমান সর্বস্থরের জ্ঞাণী-গুনী মানুষের সম্মেলন ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রচলিত নিয়ম লঙ্ঘন করে. মুক্তিযুদ্ধে অতুলনীয় অবদান রাখার জন্যে খেতাবপ্রাপ্ত বীর উত্তম জিয়াউর রহমানকে একাধিকবার পদবঞ্চিত করে সফিউল্লাহকে পরপর দুই মেয়াদে (৩+৩)=৬ বছরের জন্য সেনাবাহিনীর চিফ অফ স্ট্যাফ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ধৈর্যধারণ করেছিলেন, যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা (ইতিহাস স্বাক্ষ দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কু পাল্টা কু তে বিশেষভাবে খ্যাত একটি বাহিনী)। গৃহবন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান কঠোর হাতে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। অনেকের সংশয় ছিল যে, তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারিবেন না। ঐতিহাসিক গওহর আলি তার সন্দেহের কারণ হিসেবে চার ভাগে বিভক্ত সেনাবাহিনীকে চিহ্নিত করেছিলেন (১৯৭৬ সালে নিউজিল্যন্ডে ইন্টারন্যাশনাল টিভিতে প্রকাশিত প্রবন্ধে)।
৭ নভেম্বরের রাজনৈীতিক তাৎপর্য সূদুর প্রসারী। এই বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রকাশ্য রাজনীতি পূনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে দলের(আওয়ামী লীগের) হাল ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন। পাশাপাশি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় বহুদলীয় গণতন্ত্র ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ধারা। জাতীগত পরিচয় নির্ধারণেও ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য অতুলনীয় । জিয়াউর রহমানের হাত ধরে জন্ম ও বিকাশ লাভ করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দার্শনিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) । অনেকের মধ্যে সংশয় ছিলো এটি কি রাজনৈতিক দল নাকি একটা ‘প্রবনতা’। সংশয়ের কারণ হল, সাধারনত ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থেকে, রাজপথে কিংবা আলোচনার টেবিলে এদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল গঠিত হয়েছে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ব্যতীক্রম ধর্মী। এটি ক্ষমতার কেন্দ্রবৃন্দুতে থাকা জিয়াউর রহমানের মস্তিস্কজাত রাজনৈতিক মতাদর্শ। সংগতকারণে অনেকের ধারণা ছিল, সরকারের মেয়াদ শেষ হলেই বিএনপি দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। সব সন্দেহ ও সমালোচনাকে ভুল প্রমাণ করে জিয়াউর রহমান সফল হয়েছিলেন; বিএনপি পর্যায়ক্রমে ধমর্, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ মানুষের মিলন মেলায় পরিনত হয়েছে। এই সাফল্যের পিছনে ভুমিকা রেখেছে রাষ্ট্র ক্ষমতাকে গণমুখী এবং গণনির্ভর করার তাঁর সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ। জাতির জীবনে এ ধরনের সাফল্য বয়ে নিয়ে আসার কারণে অনেক গবেষক জিয়াউর রহমানকে তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক,মেক্সিকোর প্লুতার্ক এলিয়স কামেল ও লজারো কার্দেনাস এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং হি এর সাথে তুলনা করেন (Hossain, G., General Ziaur Rahman and the BNP: Political Transformation of a Military Regime, UPL, Dhaka, P.17)। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোন্দল ও স্থবিরতার বিপরীতে দেশের জন্য সময় উপযোগী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বিষয়ক ইশতেহার প্রণয়ন ও ঘোষনা করেন। এভাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ( বিএনপি)একক বিকল্প হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। জাসদের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব প্রয়াসেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা বিপ্লবের প্রথম প্রহরেই ’সৈনিক সৈনিক, ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই শ্লোগান তোলেন এবং ১২ জন অফিসারকে হত্যা করেন। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় যেসব রাজনৈতিক নেতা বিপ্লব বাসনা বাক্ষেমতা দখলের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা(হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, আনোয়ার হোসেন) এখন ১৪ দলের নামে আওয়ামী লীগ শিবিরে আছেন। ১৯৭৫সালের সাত নভেম্বর যারা সিপাহী বিপ্লব করেছিলেন পরবর্তীকালে তাঁদের অনেকে এখন আওয়ামী লীগের কিংবা বিএনপির সঙ্গে নিজেদের ভাগ্য বেঁধে ফেলেছেন।বিপ্লব ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র পেছনে ফেলে তারা ক্ষমতার হিস্যা নিতেই তারা এদলে ওদলে ভাগ হয়ে আছেন। কিন্তু তাঁদের তাত্ত্বিক গুরু সিরাজুল আলম খান পাঁচশ আসনের সংসদ নিয়ে বেশ কিছুকাল হইচই করে এখন রাজনীতি থেকে পুরোপুরি ‘অবসর’ নিয়েছেন (সোহরাব হোসেন, প্রথম আলো,৭ নভেম্বর ২০১৮)। এবং কিছুদিন পূর্বে মারা যান পরের ইতিহাস কারো অজানা নয়। বিপ্লবী ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত তথা আর্ন্তজাতিক সমাজতন্তের বাণী জাতীয়তাবাদী দর্শনের নিকট নিষ্প্রভ হয়ে যায়।
জিয়াউর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠনের মাধ্যমে কেবল শাসক পরিবর্তন ও নতুন একটি দল পাওয়া গিয়েছে তা নয় বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্র কেমন হবে, এর দার্শনিক ভিত্তি কি হবে, সেই বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রায়োগিক রূপরেখা পাওয়া গিয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধানে আমাদের পরিচয় ‘বাঙালি’ হিসেবে ধার্য করা হলেও রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান এই ধারনায় পরিবর্তন আনা জরুরী বলে মনে করেন। নাগরিক হিসেবে সকলের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় কি তা স্পষ্ট হতে হবে।তিনি বলেন, যদি আমরা জাতীয় পরিচয় নির্ধারনের ক্ষেত্রে ‘বাঙালি’ পরিভাষাটি ব্যবহার করি তাহলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসাবাসরত অবাঙালি বাংলাদেশি নাগরিকগণ (যেমন-আদিবাসীগণ) জাতীয় পরিচয়ের বলয় থেকে ছিটকে পড়বে। এটি আমাদের জাতিসত্বার একটি খণ্ডিত পরিচয় তুলে ধরে। জিয়াউর রহমান তাই বাংলাদেশের বাঙালি ও অবাঙালিসহ সকল নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্যে জাতীয় পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে ‘বাঙালির’ স্থলে ‘বাংলাদেশী’ পরিভাষা ব্যবহার করার প্রস্তাব করেন। আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের একটি তাত্ত্বিক বিচ্যুতি দূর করার লক্ষ্যে কালোক্ষেপণ না করে তিনি আদেশ জারি করে একে আইনি কাঠামোর মধ্যে স্থিত করেন।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সার্বজনীন ও অবৈষম্যমূলক। এটি কেবলমাত্র ধারনাগত বিষয় নয় বরং এটি দেশপ্রেমের চেতনাস্নাত একটি প্রণোদনা যা সকল নাগরিককে সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় সমান গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৮১ সালে মার্কাস ফ্রান্ডাকে দেওয়া এক স্বাক্ষাতকারে জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে তাই ফুটে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের দেশ, আমাদের ভ‚মি, ... এখন সুযোগ এসেছে ... চাষাবাদ করি এবং এর উৎপাদনশৗলতা বাড়াই, শিল্প গড়ে তুলি এবং মর্যদার সাথে মাথা উচু করে দাড়াই। ... আমাদের আস্থা রাখতে হবে নিজেদের শক্তিতে ... কোনো বিদেশীবাদ নয়’ (Franda, Marcus (1981) Ziaur Rahman and Bangladeshi Nationalism, Economic and Political Weakly, Vol. XVI, No- 10-11-12, 1981; quoted in Hossain, p.63)। জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন দেশব্যপী বুদ্ধিজীবি সমাজে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। অধ্যাপক আহমদ শরীফ এই রাষ্ট্র দর্শনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ”রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদে প্রান্তিক আদিবাসিরাও গোত্র, ভাষা, সংস্কৃতি নির্বিশেষে সবাই সমমর্যাদা ও সমোঅধিকারের স্বীকৃতি পায়, জিন্মি থাকে না (আহমদ শরীফের ডায়েরী, ভাব-বুব্দুদ, পৃ.৬৪)।তবে তিনি জিয়াউর রহমান কর্তৃক সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ যুক্ত করাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে মুল্যায়ন করেননি। তার মতে এর ফলে পূর্ণ নাগরিক হিসেবে মানসিক অধিকার ও স্বাধীনতা চর্চার ক্ষেত্রে অমুসলীম নাগরিকগণ বৈষম্যের শিকার হবেন (প্রাগুপ্ত)। আমার বিবেচনায়, দুটি কারণে আহমদ শরীফের শেষের মন্তব্যটি পূনঃবিবেচনার দাবী রাখে। প্রথমত, জিয়া প্রবর্তিত জাতীয়তাবাদী দলের নীতিমালা অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের প্রতি আস্থা রেখে দলের সমর্থক, কর্মী, কিংবা নেতৃত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে অমুসলিমদের জন্যে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। বরং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত এই দলটি অমুসলিম বাংলাদেশী নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় নির্ধারনের আইনগত ভিত্তি রচনা করেছে। যার রূপকার জিয়াউর রহমান নিজেই। দ্বিতীয়ত,’বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ একদিকে যেমন ধর্মভিত্তিক নয় তেমনি আবার ধর্ম বিমুখও নয়। এই জাতীয়তাবাদ আবার প্রত্যেকের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় অধিকারকে নিশ্চিত করে। জিয়াউর রহমান সাংবিধানিকভাবে দেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেননি। যা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করেছি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র দর্শন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এর উদারনৈতিক চেতনা দ্বারা সুরক্ষিত। জিয়াউর রহমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ সংযুক্ত করার মাধ্যমে মূলত রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন অমুসলিম নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় সমুন্নত রেখেছেন, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের বিশ্বাস ও স্বাধীনতা চর্চার প্রতি আন্তরিক সমর্থনের নিদর্শন স্বরূপ সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ যুক্ত করেছেন। তার এই সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা ও নির্মহ অকপট ভাবনার অতুলনীয় পণ্ডিত আহম্মদ ছফার একটি উক্তিতে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছফা বলেন, ‘ইসলামের সম্ভবনা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগহীন রাজনীতির কোনো ভবিষ্যত এদেশে নেই (আহমদ ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন, ১৯৮১)’। নিরোধ বরণ চৌধুরী ১৯৬৬ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় পাঁচ পর্বে মুদ্রিত ‘পূর্ব বঙ্গের সমস্যা’ নামক প্রবন্ধে এ ধরনের একটি সমন্বয় ধর্মী অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র দর্শনের উন্মেষের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। সঙ্গতকারণে বলা যায়, এই জাতির জাতিগত পরিচয় নির্ধারণে আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ভাবনার তুলনায় জিয়ার রাষ্ট্র দর্শন 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ' অর্ন্তভূক্তিমূলক ও প্রায়োগিক। এ প্রসংগে প্রাঞ্জ সাংবাদিক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মন্তব্যটি প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন: ‘আওয়ামী লীগের বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতির নিষ্পত্তি হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্জনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ওই ধরনের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আবেদন একাত্তর-পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে। বায়ান্ন, ছেষট্টি, উনসত্তরের স্মৃতি নিয়ে বসে থেকে তো আর জাতিরাষ্ট্র তৈরি করা যায় না। এ জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের প্রয়োজনে সমঝোতা ও ঐক্যের রাজনীতি এবং জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। বলা চলে, আওয়ামী লীগ সরকার দেশের বৃহত্তর নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্তের আকাঙ্খার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ঐক্যের বদলে গোষ্ঠীতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। জাতীয় ঐক্য তো দূরের কথা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান শক্তিটিও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। এর ফলে জাসদের মতো একটি রাজনৈতিক প্রবণতার জন্ম হয়। বাহাত্তরে প্রয়োজন ছিল নতুন রাজনীতি, নতুন কৌশল। একটি জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান তার কার্যকরিতা সম্পন্ন করেছিল। আওয়ামী লীগ এরপর পুরোনো মনস্তত্ত্বের ঘেরাটোপ থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি। ১৯৪৭ সালের পর ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মনে করতে শুরু করে, মুসলিম লীগের বিরোধিতা মানেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র দেশদ্রোহ। একাত্তরের পর আওয়ামী লীগও বিরোধীদের সমালোচনার মধ্যে সব সময় ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেতে থাকে। সরকার বিরোধিতা আর রাষ্ট্রদ্রোহ একাকার করে ফেলে। এখান থেকেই শুরু রাজনৈতিক সংকটের। এর ধারাবাহিকতা চলছে আজও (মহিউদ্দিন আহমদ, বিএনপি: সময়-অসময়, ২০১৭, পৃ-১৩৪-১৩৫)’। বর্তমানে যা ঘটে যাচ্ছে, তাও সবার জানা। গুম-খুন, নারী-শিশু নির্যাতন, অপহরণ, গুপ্তহত্যা ইত্যাদি অনাচার ও আতঙ্ক মানুষের নিত্যসঙ্গী। গণতন্ত্রের চর্চা নেই, আইনের শাসন নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই।
বিশেষ করে গত দেড় দশকের পরিস্থিতি যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ। ‘রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো ভেঙে পড়েছে। বিচারালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ইত্যাদির নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার কথা। কিন্তু এই সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বলপ্রয়োগ, নজরদারি, ত্রাস, জুলুম, খুন, গুম, বিজ্ঞাপনী প্রচার সরকারের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অবলম্বন। সরকারের থাবার নিচে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান, অবিরাম সরকারি মিথ্যাচারে সহযোগী সংবাদ মাধ্যম ও বিদ্বৎ-সমাজের বড় অংশ (মুহাম্মদ, আনু. ২০২৩, নভম্বের ৫. সুষ্ঠু নর্বিাচন নাগরকি অধকিাররে সূচনাবন্দিু. প্রথম আলো, পৃ-৮)’।
বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকারের অধীনে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ইতিহাসের সব চাইতে বিতর্কিত, ভোটারবিহীন ও একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গণতন্ত্র সমূলে বিদায় নিয়েছে। পরিকল্পনা চলছে আরেকটি ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনের। জিজ্ঞাসা হল, এ অবস্থায় বিএনপি’র করণীয় কি? মূলত: রাজনৈতিক সংকট রাজনীতিকভাবে মোকাবেলা করতে হয়। আমরা লক্ষ্য করেছি, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপির আপোষহীন সংগ্রাম ও নেতৃতের ধারাবাহিক একটি ঐতিহ্য রয়েছে। জিয়াউর রহমান একদলীয় বাকশালী শাসন ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করেছে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরশাসক এরশাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে নিরলস সংগ্রাম করে আপোষহীন নেত্রীর উপাধি লাভ করেছেন। আজ সময় আসছে বিএনপির নিজ দলে রচিত সংগ্রামের অতীত ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের বিরতিহীন সংগ্রামে লিপ্ত থাকা। স্বস্থরি বিষয় হল, শত বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্র পুনরুদ্ধারে বিএনপি অবিরাম অহিংস আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে এক অহিংস-সংস্কৃতির রূপকার বিএনপি। কিন্ত বর্তমান কর্তৃত্ববাদী সরকার বিএনপি আহুত গত ২৮ অক্টোবর ২০২৩ এর মহাসমাবেশে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে অহিংস মহাসমাবশেকে পণ্ড করা এবং বিএনপির শীর্ষস্থানীয় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গনগ্রেপ্তার চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে গণদাবি আদায়ের এই অহিংস আন্দোলনকে দমিয়ে দেওয়ার মহাষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গণদাবি আদায়ের সংগ্রামে বিএনপি অবিচল রয়েছে এবং জনগণকে সাথে নিয়ে চরম দমন-পীড়নরে মুখে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধাররে চূড়ান্ত ধাপরে পদক্ষপে হসিবেে হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই আন্দোলন ক্ষমতায় যাবার জন্য নয় বরং জনগণের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে ভোটের অধিকার ও ভাতের অধিকার আদায়ের জন্য জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য এই আন্দোলন। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শন উপলব্ধি, চর্চা ও বাস্তবায়নের সংগে যেসব নেতা-কর্মী ও সমর্থক জড়িত, তাদের জন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব কিছু নয়, কারণ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান স্বয়ং দশেরে ক্রান্তকিালে দায়ত্বি নযে়ার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। তাই ঐতিহাসিক প্রয়োজনে গঠিত হওয়া দায়িত্বশীল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলিয়া যাওয়াই হওয়া উচিত বিএনপি’র জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের অঙ্গিকার।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান : দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়