রোমানিয়ার বুখারেস্টে বাংলাদেশি এক ডেলিভারি কর্মীকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ওই বাংলাদেশিকে ভিনদেশি আখ্যা দিয়ে তার ওপর আক্রমণ করে শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে। বিদেশি নাগরিকের ওপর এমন হামলাকে বর্ণবিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে রোমানিয়াজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। যদিও আক্রমণকারীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে সে দেশের পুলিশ। ইতোমধ্যে এই ঘটনায় বিবৃতি দিয়ে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট।
রোমানিয়ার বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। রোমানিয়ার গণমাধ্যম এবং বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ আগস্ট রাতে বাংলাদেশি ফুড ডেলিভারি কর্মী ইসমাইল হোসেনের ওপর আক্রমণ করে সে দেশের ২০ বছর বয়সী এক তরুণ। ওই তরুণের নাম কসমিন তুদোরান।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে রোমানিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘বিষয়টি রোমানিয়া সরকার গুরুত্ব সহকারে দেখছে। তারা এ বিষয়ে আমাদের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের চলাচলে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশি ওই ডেলিভারি কর্মীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
দেশটির গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, হামলার ঘটনাটি ঘটে বুখারেস্টের সেক্টর-২ এর কোলেন্তিনা এলাকায়। ঘটনাস্থলে ছুটিতে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তার সহায়তায় হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে রোমানিয়ার পুলিশ। ঘটনার পর তুদোরানকে ৩০ দিনের জন্য প্রাথমিকভাবে আটক করা হয়েছে। ডেলিভারি কর্মীকে আঘাত করার সময় চিৎকার করে বলছিল- ওই কর্মী ‘একজন আক্রমণকারী’ এবং ‘নিজের দেশে ফিরে যাওয়া উচিত’।
ঘটনার পরের দিন সে দেশের পুলিশ কর্মকর্তা মারিয়ান গদিনা একটি ভিডিও প্রকাশ করে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণ বুখারেস্টে এক এশীয় ডেলিভারি কর্মীকে ‘আক্রমণকারী’ বলে আঘাত করছে। ভিডিওটি আক্রমণকারীর নিজের ফোনেই ধারণ করা হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়— হঠাৎ এক পুলিশ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ করেন এবং অভিযুক্তকে আটক করেন।
এ বিষয়ে রোমানিয়া পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই পুলিশ কর্মকর্তা সেকশন-৭ এ কর্মরত, তবে তিনি ঘটনার সময় ছুটিতে ছিলেন। তবুও তিনি তাৎক্ষণিক ও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নিয়েছেন। আটকের পর বাংলাদেশি ডেলিভারি কর্মীর মুখে ঘুষি মারার কথা স্বীকার করেছেন কসমিন তুদোরান।
অভিযুক্ত যুবক আটক হওয়ার সময় পুলিশকে বলেন, ‘আমার খারাপ লেগেছে, আমি ভাবিনি কেউ আমাকে দেখবে।’
ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা পুলিশ কর্মকর্তা আন্দ্রে জিয়ানু গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে দেখি এক ব্যক্তি আরেকজনকে শারীরিকভাবে আঘাত করছে। আমি এগিয়ে গিয়ে হামলাকারীকে সতর্ক করি। সে পালাতে চেষ্টা করে, কিন্তু আমি তাকে কোলেন্তিনার অপর প্রান্তে গিয়ে আটক করি। ঠিক সে সময় আমার সহকর্মী পুলিশ স্টেশনে পালাবদলের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমার ডাক শোনার পর তারা এগিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করেন এবং আমরা হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করি। পরে সেকশন-৭ পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয় অভিযুক্তকে, যেখানে তাকে ৩০ দিনের জন্য আটকাদেশ দেওয়া হয়।’
এদিকে এই ঘটনা নিয়ে রোমানিয়াজুড়ে প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠেছে। সে দেশের সামাজিকমাধ্যম থেকে শুরু করে গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্ব দিয়ে হামলার ঘটনা প্রচার করা হচ্ছে। রোমানিয়ার বিভিন্ন টেলিভিশন এবং অনলাইনে সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনও হামলার ঘটনায় সংবাদ প্রচার করেছে। সিএনএনের সংবাদে বলা হয়, বুখারেস্টে বাংলাদেশি এক ডেলিভারি কর্মীকে মারধরের ঘটনায় প্রতিক্রিয়ার ঝড়।
রোমানিয়ার ডিজি২৪.আরও নামের এক গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হয়েছে, খাবার সরবরাহকারীকে ঘুষি মেরে ‘নিজের দেশে ফিরে যাও’ বলেছিল যে তরুণ, তাকে ৩০ দিনের জন্য আটক করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বুখারেস্টের সেক্টর-২ আদালতের প্রসিকিউটর অফিস জানায়, রাস্তায় এক এশীয় খাবার সরবরাহকারীকে ঘুষি মারা তরুণকে ৩০ দিনের জন্য আটক করা হয়েছে।
প্রসিকিউটরের তথ্যানুযায়ী, আক্রান্ত ডেলিভারি কর্মী বাংলাদেশের নাগরিক।
প্রসিকিউটরের বিবৃতিতে বলা হয়, ২৬ আগস্ট রাত প্রায় সাড়ে ১০টায় বুখারেস্টের সেক্টর-২ এ বর্ণবাদী ও বিদেশিবিদ্বেষী কারণে ভুক্তভোগীকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি মুখে ঘুষি মারে। এতে ভুক্তভোগীর মুখে আঘাত লেগে ট্রমাটিক চোট সৃষ্টি হয়, যার জন্য ১-২ দিন চিকিৎসা প্রয়োজন। পরবর্তীতে ২৭ আগস্ট আদালত প্রসিকিউটরের প্রস্তাব মেনে অভিযুক্তকে ৩০ দিনের প্রাথমিক আটকাদেশ দেন।
রাষ্ট্রপতির প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পরপরই রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুশোর দান কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘কেবল ভিন্ন দেশে জন্ম নেওয়ার কারণে কাউকে আঘাত করা ও অপমান করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে, আর এই ধরনের বক্তব্য বাস্তবে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। এ ধরনের বিদেশিবিদ্বেষী হামলা যত ক্ষুদ্রই মনে হোক না কেন, তা আমাদের সমাজের মৌলিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত। এই ঘটনাটিকে ঘৃণামূলক অপরাধ হিসেবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’
রোমানিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুখারেস্টে বাংলাদেশি ডেলিভারি কর্মীকে হামলা করা তরুণকে ফ্যাসিবাদী প্রতীকের প্রচারক হিসেবে সমালোচনা করা হচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, কসমিন তুদোরান তার ফেসবুক ও টিকটক অ্যাকাউন্টে বিতর্কিত ভিডিও এবং ফ্যাসিবাদী প্রতীক প্রচার করত। তার প্রোফাইলে দেখা যায়— মুখোশ পরা অবস্থায় ছুরি ইত্যাদি অস্ত্র হাতে ছবি ও ভিডিও। এ ছাড়া সে নিয়মিতভাবে লিজিওনারি মুভমেন্টের ক্রস ও অর্থডক্স আইকনোগ্রাফি দিয়ে আঁকা স্বস্তিকার মতো প্রতীক প্রচার করেছে। এমনকি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সে তার ফেসবুক প্রোফাইল ছবিতে নাজি স্বস্তিকা ব্যবহার করেছিল। এ ছাড়া তার কয়েকটি ছদ্মনামও রয়েছে, ‘অক্সিজেন১৩১২, অক্সিজেন, এনসাইক্লোপিডিয়া, বস১২৩৪ এবং অক্সিনেল’।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
হামলার ঘটনার ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করার পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে। অনেকে পুলিশ সদস্য আন্দ্রে জিয়ানুকে ধন্যবাদ জানান এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ার (AUR) দলের সংসদ সদস্য দান তানাসাকে দায়ী করেন। কারণ বিরোধী দলের ওই নেতা সম্প্রতি বিদেশিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক মন্তব্য করেছেন। তানাসা ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘যদি কোনো রোমান খাবার সরবরাহ না করে, তবে সেই অর্ডার গ্রহণ করবেন না। এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে অদক্ষ শ্রমিক আমদানি উৎসাহিত করবেন না। জেগে উঠুন।’
পিআরও টিভি নিউজের এক সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে পুলিশ কর্মকর্তা মারিয়ান গদিনা তার বিরুদ্ধে ঘৃণা, সহিংসতা ও বৈষম্য উসকানির অভিযোগে মামলা করেন। কারণ দান তানাসা ফেসবুকে লিখেছিলেন, যদি কোনো রোমান খাবার সরবরাহ না করে, তবে সেই অর্ডার গ্রহণ করবেন না। এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে অদক্ষ শ্রমিক আমদানি উৎসাহিত করবেন না। জেগে উঠুন।
তিনি পরে মুসলিম সম্প্রদায় নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন, দাবি করেন যে, ‘পশ্চিম ইসলামপন্থিদের ঢেউয়ে ডুবে যাচ্ছে।’ মারিয়ান গদিনা উল্লেখ করেছেন, আপনি যা লিখেছেন তা একটি অপরাধ। আশা করি, প্রসিকিউটর জেনারেলের অফিস এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। আর্টিকেল ৩৬৯— সহিংসতা, ঘৃণা বা বৈষম্যের উসকানি জাতি, জাতীয়তা, ধর্ম, ভাষা, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মতামত ইত্যাদি যে কোনো কারণে জনগণকে সহিংসতা বা ঘৃণায় উসকানি দিলে তা ৬ মাস থেকে ৩ বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানাযোগ্য অপরাধ।
মন্তব্য করুন